E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

ফরিদপুর চিনি কলের আখ ক্রয়ে অনিয়ম করছে কয়েকটি আখ সেন্টার

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ২৫ ১৮:৪৮:০৫
ফরিদপুর চিনি কলের আখ ক্রয়ে অনিয়ম করছে কয়েকটি আখ সেন্টার

রিয়াজুল রিয়াজ, বিশেষ প্রতিনিধি : ফরিদপুর মধুখালী চিনি কলের আখ সেন্টারগুলোতে মাটি, বিষাক্ত আগাছা, শুকনা পাতাসহ আখ ক্রয় করছে কয়েকটি আখ সেন্টারের ক্রয় প্রতিনিধি বা সেন্টার ইন চার্জ। সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে একাধিক আখ সেন্টার ঘুরে এসব দৃশ্য চোখে পড়েছে।

এ সময় এলাকাবাসীর অভিযোগ, যেহেতু আখ সেন্টার থেকে সরাসরি ক্রয়কৃত আখ চিনির মিলে চলে যায়, সেহেতু এসব মাটি, আগাছা, শুননো পাতাসহ চিনি কলে গিয়ে আখ মাড়াইয়ের মেশিনে ঢোকালে এসব বিষাক্ত আগাছা ও কাঁদা-মাটি ঢুকে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়, যা উৎপাদিত চিনির সাথে মিশে ভোক্তা পর্যায়ে চলে যাওয়ারও আশংকা থাকে।

এমন কাণ্ডে বেড়িয়ে আসছে স্থানীয় আখ সেন্টারগুলোর দায়িত্বশীলদের অবহেলা ও উদাসীনতার তথ্যও। এছাড়া, ফরিদপুরে কয়েকটি আখ সেন্টারে অতিমাত্রায় কৃষক ভোগান্তি, কৃষকদের আখের ওজন ও দামের হিসেবে হেরফেরের অভিযোগও রয়েছে। এসব জটিলতার কারণে ফরিদপুরে আখ চাষীরা দিনদিন আখ চাষে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন চাষীরা। কয়েকজন কৃষক তাদের দীর্ঘদিনের আখ চাষ ছেড়ে অন্য ফসল চাষে মনোযোগী হচ্ছেন। এতে ফরিদপুর কিছুকিছু এলাকায় দিনদিন কমছে আখ চাষ। এমনভাবে আখ কৃষক হারাতে থাকলে মধুখালী চিনি কলে আখ সংকট আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। আর কৃষক ও এলাকাবাসীর মতে, অনেকাংশে দায়ী হচ্ছে এ এলাকার আখ সেন্টারগুলোর উদাসীন মনোভাব ও দায়িত্বহীনতা।

বলা বাহুল্য, সুগার মিল বা চিনি কল-এর আখ সেন্টারে সাধারণত মিল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিযুক্ত সেন্টার ইনচার্জ বা আখ ক্রয় পরিদর্শক (Cane Purchase Inspector/Recorder) দায়িত্বে থাকেন। তিনি কৃষকদের কাছ থেকে আখ কেনা, ওজন তদারকি, আখ পরিবহনের পারমিট যাচাই এবং আখ সরবরাহের রেকর্ড সংরক্ষণের কাজ করেন। একটু খোলাসা করে বলতে গেলে, আখ সেন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্তদের মূল কাজ চাষীদের নিকট থেকে নির্ধারিত মান অনুযায়ী আখ ক্রয় করা, আখ ওজন করার সঠিকতা নিশ্চিত করা। এছাড়া, প্রতিদিনের আখের ক্রয়ের তথ্য এবং নথিপত্র (Cane Token/Pass) প্রস্তুত করা ও মিল পর্যন্ত আখ পরিবহনের ব্যবস্থা করাও আখ সেন্টারের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তবে, ফরিদপুর চিনি কলের আখ সেন্টারগুলো পরিদর্শন করে উপরোক্ত কাজের কোনোটিই যে সঠিকভাবে হচ্ছেনা সেটি অনায়াসেই বলা যায়। এ অনুসন্ধানে সবচেয়ে বেহাল দশা অবস্থায় পাওয়া যায় কানাইপুর বিসিক এলাকার নিকটবর্তী একটি আখ সেন্টারে। সেখানে গিয়ে দেখা যায় কয়েকজন আখ চাষী ওই সেন্টারের দায়িত্বরত ইনচার্জ ও আখ ক্রয় পরিদর্শক, সবুজ কুমার চৌধুরীর জন্য অপেক্ষা করছেন। কৃষকদের সাথে অপেক্ষায় থাকে উত্তরাধিকার ৭১ নিউজ। অপেক্ষার সময়টুকুতে কৃষকদের সাথে কথা বলার সময় সেখানে খোলা আকাশের নীচে রাখা আখের স্তুপ চোখে পড়ে। ওসব আখ স্তুপের মধ্য বড় আকারের কয়েকটি স্তুপে আগাছা, ময়লা আবর্জনা ও কাদাযুক্ত আখ দেখতে পাওয়া চায়। প্রায় ২ ঘন্টা ১০ মিনিট অপেক্ষার পর ওই আখ সেন্টারের ইনচার্জ সবুজ কুমার চৌধুরী আখ সেন্টারে আসলে তার কাছে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি রাগান্বিত হয়ে উঠেন। কথাবার্তা বলে তাকে শান্ত করার পরেও তিনি অন দ্যা রেকর্ড এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। এমনকি নিজের নামটা পর্যন্ত বলতে অস্বীকৃতি জানান কানাইপুর আখ সেন্টারের ইন চার্জ সবুজ কুমার চৌধুরী।

পরে এ বিষয়ে জানতে ফরিদপুর চিনি কল শ্রমজীবী ইউনিয়নের সভাপতি মো. মনিরুজ্জামানকে ফোন করা হলে তিনি জানান, 'আসলে আমরা কৃষকদের এ বিষয়ে কিছু বলি না, মাঝে মাঝে জরিমানা করে ওজন ২০/৩০ কেজি কেটে রাখি, আবার অনেক সময় রাখি না।

তিনি জানান, এবছরের আখ ক্রয় আর মাত্র সপ্তাহ খানেক বাকী আছে'। এক প্রশ্নের জবাবে মনির আরও জানান, ওই আখ সেন্টার এলাকায় আখ চাষী কমে যাচ্ছে, তাই কিছুটা ছাড় দেওয়া হচ্ছে'।কৃষকদের কথিত ছাড় দেওয়ার জন্য মাটি-আগাছা সহ আখ ক্রয় প্রক্রিয়া চিনি কলের কোন নিয়মে করা হচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে শ্রমজীবী ইউনিয়নের সভাপতি মনিরুজ্জামান কোনো সদুত্তর না দিয়ে অপ্রাসঙ্গিক ও অগ্রহণযোগ্য কথাবার্তা বলেন।

কানাইপুর আখ সেন্টারটির ফরিদপুর সদর উপজেলায় হওয়ায় সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেন-এর নিকট তাঁর এলাকার গত দুই অর্থ বছরের আখ চাষের পরিসংখ্যান জানতে চায় উত্তরাধিকার ৭১ নিউজ।

এসময় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এ কর্মকর্তা জানান, গত বছর সদর এলাকায় আখ চাষ হয়েছিল ১৪৩৫ হেক্টর জমিতে, এবছর তা কমে দাড়িয়েছে ১২৪০ হেক্টরে। তবে, এ এলাকার আখ চাষ বাড়াতে কাজ করছে উপজেলা কৃষি অফিস বলেও জানান আনোয়ার হোসেন।

অন্যদিকে, চিনিকলের কৃষি বা আখ বিভাগ (Cane Department) সরাসরি আখ সেন্টারগুলো পরিচালনা করে থাকে। বর্তমানে কিভাবে তারা এ আখ সেন্টারগুলো পরিচালনা করে আসছেন সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। আর, কানাইপুর আখ সেন্টার ইন চার্জ সবুজ কুমার চৌধুরীর মতো আরও কয়েকটি সেন্টার ইনচার্জ থাকলে ওই এলাকায় এমনিতেই আখ চাষ কমে যাবে, তাতে কৃষি কর্মকর্তারা যতো চেষ্টাই করেন না কেনো, এতে কোনো লাভ হবে না বলে মনে করছেন দীর্ঘদিন আখ চাষ করে নিরুৎসাহিত হয়ে আখ চাষ ছেড়ে আসা একাধিক চাষী।

এসব বিষয় অবগত করে মধুখালী চিনি কলের উপ-মহাব্যবস্থাপক মাসুদ রেজার নিকট জানতে চাইলে উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে তিনি জানান, 'কাদামাটি, শেকড় বাকর ও আগাছাযুক্ত কোনো আখ কেনার সুযোগ আখ সেন্টারের নেই। বরং মিলের নিয়ম মেনে পরিস্কার পরিছন্ন আখ ক্রয়ের ব্যাপারে তাদের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এমনটি ঘটে থাকলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবেও জানান তিনি।'

উল্লেখ করা যেতে পারে, ফরিদপুর সুগার মিলস লিমিটেড (মধুখালী চিনি কল) ফরিদপুর জেলার মধুখালী উপজেলায় অবস্থিত একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৪-৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মিলটি প্রতিদিন ১,০১৬ মেট্রিক টন আখ মাড়াই ক্ষমতা সম্পন্ন এটি মূলত চিনির পাশাপাশি চিটাগুড় ও জৈব সার উৎপাদন করে থাকে। বর্তমানে চিনি কলটি দীর্ঘদিনের পুরনো যন্ত্রপাতি ও আখ সংকটের কারণে আর্থিক লোকসানের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

ফরিদপুরে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে বিআইডিসি'র ব্যবস্থাপনায় থাকা এ কলটি উৎপাদন শুরু করে ১৯৭৬-৭৭ মাড়াই মৌসুম। সরাসরি আখ থেকে স্বাস্থ্যসম্মত ও ভেজালমুক্ত চিনি উৎপাদন করার কথা থাকলেও তা এখন কতোটা মাননিয়ন্ত্রণ করার সক্ষম সেটি তদন্তের দাবি রাখে বলে অনেকেই অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া, বর্তমান অবস্থায় মিলটি দীর্ঘদিনের পুরনো ও জরাজীর্ণ হওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় এ ঐতিহ্যবাহী মিল আধুনিকায়নের প্রয়োজন রয়েছে। কেবলমাত্র আধুনিকায়ন, যথাযত তদারকি ও কৃষকদের আখ উৎপাদনে উৎসাহিত করলেই বেঁচে যেতে পারে ফরিদপুরের এ সুগার মিলটি। এক্ষেত্রে উৎপাদন লক্ষ্য মাত্রা অর্জনের পাশাপাশি লাভের মুখ দেখতে মিলটি। এ রিপোর্টের তথ্য অনুসন্ধানের সময় উত্তরাধিকার ৭১ নিউজের মাধ্যমে এলাকাবাসী দেশের নতুন নির্বাচিত সরকারের নিকট দাবি করেছেন, 'চিনি কলটির পুরনো যন্ত্রপাতি বাদ দিয়ে নতুন ও আধুনিক যন্ত্রপাতি বসিয়ে নতুন উদ্যোমে এটি পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ করুক সরকার'। বেঁচে থাকুক এলাকার চিনি কলটিকে ঘিরে জীবীকা নির্বাহ করা এলাকার শ্রমজীবী মানুষগুলো, লোকসান না গুনে লাভের মুখ দেখতে সক্ষম হোক ফরিদপুর সুগার মিলস লিমিটেড, রাজস্ব বাড়ুক বাংলাদেশ সরকারের।

(ওএস/এসপি/ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test