E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

সুদখোর তাপসের টাকা আদায় 

বিএনপি অফিসে তুলে এনে গোপাল ও রাজুকে পেটালেন বিএনপি ও যুবদল নেতা

২০২৬ মার্চ ০৫ ১৯:২৯:০৭
বিএনপি অফিসে তুলে এনে গোপাল ও রাজুকে পেটালেন বিএনপি ও যুবদল নেতা

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : সুদখোরের টাকা আদায়ের ইজারা নিয়ে দুই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দুই সদস্যকে বিএনপি অফিসে নিয়ে নির্যাতন চালানো হয়েছে। গত পহেলা মার্চ সাতক্ষীরার ঝাউডাঙা বাজারের এ ঘটনা ঘটলেও নির্যাতিতরা বিএনপি ও যুবদলের নেতা কর্মীদের ভয়ে প্রতিকার চাইতে পারেনি।

ঝাউডাঙা গ্রামের নির্মাণ শ্রমিক গোপাল ঘোষ জানান, তিনি খাস জমিতে বসবাস করেন। হাসিমপুর গ্রামের কার্তিক ঘোষের ছেলে তাপস ঘোষের কাছ থেকে দুই বছর আগে তিনি মাসিক ১০০ টাকা সুদ দেওয়ার শর্তে ৩০ হাজার টাকা ধার নেন। নিয়মিত সুদের টাকা পরিশোধ করা ও আসলের কিছু অংশসহ দেড় লক্ষাধিক টাকা পরিশোধ করার পর তাপস তার কাছে ৯০ হাজার টাকা দাবি করে আসছিলো। তিনি দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় গত পহেলা মার্চ রবিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঝাউডাঙা ইউনিয়ন বিএনপি’র সভাপতি রফিকুল ইসলামের ভাইপো যুবদল কর্মী আক্তারুল ইসলাম বাপ্পি, ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহাজাহান আলী বাবলু, যুবদল নেতা আইয়ুব হোসেন, আওয়ামী লীগ কর্মী রবিউলসহ কয়েকজন তাদের বাড়িতে আসে। এ সময় তাপস ঘোষের টাকা দিয়ে দেওয়ার জন্য বলা হয়। তিনি দিতে অপরাগতা প্রকাশ করায় তাকে ডেকে ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট পরবর্তী বাজারের পাশে জাগরনী ক্লাব দখল করে বানানো বিএনপি অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে তাপসের সুদের টাকা দেওয়ার কথা বলে বাপ্পি, বাবলু ও রবিউল। তিনি দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় বাবলু তার নাক ঘুষি মেরে ফাঁটিয়ে দেয়। এরপর বাপ্পি, রবিউল ও বাবলুসহ কয়েকজন তাকে এলোপাতাাড়ি কিল, ঘুষি ও লাথি মেরে রক্তাক্ত জখম করে। পরে ২০০ টাকা দিয়ে একটি লুঙ্গি কিনে এনে পরিয়ে দিয়ে রক্তমাখা জামা কাপড় খুলে রেখে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় বিষয়টি নিয়ে কাউকে না বলার হুমকি দেন বাবলু ও বাপ্পি। এক পর্যায়ে তিনি স্থানীয় এক চিকিৎসকের কাছ থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে বিয়টি ইউনিয়ন বিএনপি’র সাধারন সম্পাদক কামরুজ্জামান রানাকে জানান। কামরুজ্জামান বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করলেও বর্তমানে তিনি (গোপাল) নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

ঝাউডাঙা গ্রামের স্বরজিৎ ঘোষের ছেলে রাজু ঘোষ জানান, তিনি কয়েক বছর আগে হাচিমপুর গ্রামের তাপস ঘোষের কাছ থেকে চড়া সুদে ২০ হাজার টাকা নেন। বেশ কিছু দিন সুদের টাকাসহ আসলের টাকা দিয়ে দেন তিনি। এরপরও তাপস তার কাছে ৫০ হাজার টাকা বাকি আছে বলে দাবি করতে আসছিলো । তিনি দিতে অপরাগতা প্রকাশ করলে পহেলা মার্চ দুপুর দুটোর পর ইউনিয়ন বিএনপি’র সভাপতি রফিকুল ইসলামের ভাইপো যুবদল কর্মী আক্তারুল ইসলাম বাপ্পি, ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান আলী বাবলু, যুবদল নেতা সালাম, রবিউল ইসলামসহ কয়েকজন তার বাড়িতে যেয়ে তাপস ঘোষের সুদাসল বাবদ ৫০ হাজার টাকা চান। দিতে অপরাগতা প্রকাশ করায় তাকে ও তার মা মায়া রানী ঘোষকে জাগরনী ক্লাব দখল বরে বানানো বিএনপি অফিসে নিয়ে আসেন। এ সময় তাকে টাকার দাবিতে মারপিট করা হয়। মা প্রতিবাদ করায় তাকে গালিগালাজ করা হয়। বিষয়টি তিনি ইউনিয়ন বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান রানাকে অবহিত করে প্রতিকার চান।
ঝাউডাঙা বাজারের অজিত ঘোষ, স্বপন ঘোষসহ কয়েকজন জানান, তাপস ঘোষ এক সময় ভ্যান চালাতেন। এখন চড়া সুদে টাকা ধার দিয়ে অলিখিত স্টাম্পে ও চেক এ সই নিয়ে তাদেরকে বিপদে ফেলে থাকেন। টাকা আদায় করতে না পেরে আগে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের ব্যবহার করেছেন। এখন ব্যবহার করছেন বিএনপি কর্মীদের। বানিয়েছেন গাড়ি ও সুরম্য বাড়ি। তাপস ঘোষের মত কয়েকজন সুদখোরের কাছে এলাকার খেটে খাওয়া মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়রা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট পরবর্তী সময়ে ৫০ বছরেরও বেশি আগে বানানো জাগরনী ক্লাব দখল করে নেন ১০ বছর বিদেশে অবস্থানকারি যুবদল কর্মী আক্তারুল ইসলাম বাপ্পি, বিএনপি নেতা শাহজাহান আলী বাবলু, আইয়ুব আলীসহ কয়েকজন। শাহজাহান আলী বাবলু ২০২৪ এর ৫ আগষ্ট পূর্ববর্তী ঝাউডাঙা মাছের সেটের শ্রমিক হিসেব কাজ করলেও রাজণৈতিক পালাবদলের সাথে সাথে ভাই বাপ্পির সাথে যুক্ত হয়ে হিন্দু পাড়ায় জমিজমার বিরোধ মেটানোর নামে ও বাজারের ব্যবসায়িদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি শুরু করেন। বাজারের পেরিফেরি সম্পত্তিতে বহুতল ভবন তৈরির নামে টাকা তোলা শুরু করেন বলে অভিযোগ। এমনকি বিভিন্ন লোকের টাকা আদায় করার নাম করে কমিশন নিয়ে থাকেন তারা। এ নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদকসহ একটি গ্রুপ বের হয়ে যেয়ে সুজিত ডাক্তারের ক্লিনিকের পাশে বিএনপির অফিস বানান। গোপাল ঘোষ ও রাজু ঘোষকে পহেলা মার্চ মারপিটের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিএনপি’র সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করে পক্ষ থেকে ২ মার্চ পৃথক পৃথক সংবাদ সম্মেলন করা হয়। তবে নির্যাতনের শিকার গোপাল ঘোষ ও রাজু ঘোষ কোন প্রতিকার পাননি। তবে জাগরনী ক্লাবকে এখন বিএনপি অফিসের নামে টর্চার সেল বানানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে হাচিমপুর গ্রামের সুদখোর তাপস ঘোষ বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে কিছু সুবিধা নিয়ে লোকজনদের টাকা দিয়ে থাকেন। গোপাল ও রাজু তার টাকা না দেওয়ায় তিনি বিষয়টি স্থানীয় বিএনপি নেতাদের জানিয়েছেন। তারা গোপাল ও রাজুকে মারপিট করেছেন কিনা তার জানা নেই।
এ ব্যাপারে আক্তারুল ইসলাম বাপ্পির সাথে তার মুঠোফোনে যেগোযোগের চেষ্টা করলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

ঝাউডাঙা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান রানা বলেন, তাপস ঘোষের কাছ থেকে গোপাল ঘোষ ও রাজু ঘোষের নেওয়া সুদের টাকা আদায়ের জন্য জবরদখল করা জাগরনী ক্লাবকে বিএনপি অফিস বানিয়ে সেখানে ওই দুইজনকে নির্যাতন করা হয়েছে। এ নিয়ে তিনি আইয়ুবের কাছে জানতে চাইলে কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তাকে ফাঁসাতে জাগরনী ক্লাব কাম বিএনপি অফিসের আসবাবপত্র ও বিএনপি নেতাদের ছবি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে সভাপতির দুই ভাইপোসহ কয়েকজন তাকে জেলা নেতৃবৃন্দের কাছে বদনাম করার চেষ্টা করে। এ ব্যাপারে তিনি সংবাদ সম্মেলন করেছেন।

ঝাউডাঙা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম তার ভাইপো বাপ্পি ও বাবলুর বিরুদ্ধে দিন মজুর গোপাল ঘোষ ও রাজু ঘোষকে মারপিটের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, দীর্ঘ ২০ বছর পরিত্যক্ত থাকায় জাগরনী ক্লাব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে সেখানে ইউনিয়ন বিএনপির অফিস বানানো হয়। ক্লাব কর্তৃপক্ষ চাইলে তারা ছেড়ে দেবেন। ৫ আগষ্টের পর তার ভাইপো বা কোন বিএনপি নেতা কর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, প্রমান দিতে পারলে তিনি ব্যবস্থা নেবেন। সাধারণ সম্পাদক ও আইয়ুব আলীর মধ্যে বিরোধকে কেন্দ্র করে বিএনপি অফিস ভাংচুর করা হয়েছে। বিষয়টি জেলা নেতৃবৃন্দকে অবহিত করে তারা সংবাদ সম্মেলন করেছেন।

(আরকে/এসপি/মার্চ ০৫, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

০৫ মার্চ ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test