E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

ভালুকা উপজেলা ভূমি অফিস

সার্ভেয়ার ও উপ প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে অনিয়ম হয়রানির অভিযোগ

২০২৬ মার্চ ১২ ১৭:৩৮:১৮
সার্ভেয়ার ও উপ প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে অনিয়ম হয়রানির অভিযোগ

নীহার রঞ্জন কুন্ডু, ময়মনসিংহ : ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার ও ভূমি অফিসের উপ প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও সেবা গ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। ভূমি অফিসে এই দুই কর্মকর্তা মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে খতিয়ান সৃজন, মনগড়া বিভিন্ন রিপোর্ট প্রতিবেদন দিয়ে ভুক্তভোগীদের হয়রানি করে আসছেন বলে দাবি করেছেন উপজেলার কয়েকজন সেবা গ্রহীতা। অফিসের সার্ভেয়ার জহিরুল ইসলাম, উপ প্রশাসনিক কর্মকর্তা রুবেল হোসাইন, সার্টিফিকেট পেশকার খাইরুল ইসলাম, মিউটেশন সহকারী সাজ্জাদ হোসেনের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগে জানান, ভালুকা ভূমি অফিসে সার্ভেয়ার জহিরুল ইসলামের যোগদান করার পর থেকে বিভিন্ন সেবা গ্রহীতাদের কাছ থেকে খতিয়ান সৃজন, সার্ভেয়ার রিপোর্ট প্রতিবেদন ও নানা কাজে বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে হয়রানি, ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে আসছে। কাগজপত্র সঠিক থাকলেও টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে তিনি সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বানিয়ে কুটকৌশলে মাধ্যমে সেবা গ্রহীতাদের সুকৌশলে প্রতিনিয়ত হায়রানি করে যাচ্ছেন। এছাড়া সার্ভেয়ারের বিভিন্ন কাজে এসব অনিয়মের সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন অফিসর উপপ্রশাসনিক কর্মকর্তা রুবেল হোসাইন।

উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের এক বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, হবিরবাড়ী ইউনিয়ন এলাকায় হবিরবাড়ী মৌজায় আমার পৈত্রিক ও ক্রয়কৃত নালিশী জমিতে ভুলবশত রেকর্ড হওয়ায় ভূমি অফিসের সার্ভেয়ারের কাছে সংশোধনের জন্য গেলে তিনি মোটা উৎকো দাবী করেন। আরেকজন জানান- আমার পৈত্রিক সম্পত্তি নিয়ে প্রতিবেশীর সাথে দ্বন্দ্ব চলছিলো, বিষয়টি সমাধানে সার্ভেয়ারের উপর দায়িত্ব পড়লে তিনি আমার কাছে ঘূষদাবী করে না পেয়ে জমির কোন ধরনের কাগজপত্র সঠিকভাবে পর্যালোচনা না করে আমার প্রতিপক্ষের পক্ষে মনগড়া নিজের ইচ্ছেমতো একতরফাভাবে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন।

অভিযোগ উঠেছে একই ভাবে উপজেলার ভরাডোবা ইউনিয়নের একটি বিরোধীয় জায়গা নিয়ে সার্ভেয়ারের প্রতিবেদন আলোকে অনুরূপভাবে ভুক্তভোগীর কাগজপত্র পর্যালোচনা না করে অসুস্থতা দেখিয়ে তিনিও প্রতিবেদন দাখিল করেন। তা নিয়ে জমির প্রকৃত মালিক সংক্ষুব্ধ ও মর্মাহত। আর এসব অনিয়মের কাজ সার্ভেয়ার ও উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা মিলেমিশে করেন বলে জানা গেছে। ভূমির সাথে সংশ্লিষ্ট এই দুই কর্মকর্তার এহেন অনিয়ম কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সঠিকভাবে তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সেবাগ্রহীতা জানান, কাচিনা ইউনিয়নে অবস্থিত তার জমির নামজারি খতিয়ান করার জন্য ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে প্রতিবেদনের পর সার্ভেয়ারের কাছে গেলে সার্ভেয়ার তাকে রেকর্ডীয় মালিকের অংশ জমি নাই মর্মে জানায়। তিনি উক্ত রেকর্ডীয় মালিক থেকে সর্বপ্রথম খরিদ মালিক মর্মে চ্যালেঞ্জ করলে সার্ভেয়ার তাকে বালাম খুলে বলেন, এই যে দেখেন, আপনাকে যিনি জমি বিক্রি করেছেন তাহার নামে গোল দেওয়া আছে। পরবর্তীতে সার্ভেয়ারের সহযোগী উপপ্রশাসনিক কর্মকর্তা রুবেল তাকে বলেন এক লাখ চল্লিশ হাজার টাকা দিলে গোল চিহ্ন চলে যাবে।

অভিযোগ উঠেছে সার্ভেয়ার জহিরুল ইসলামকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে একজনের দখলীয় জমি অন্যজনকে পাইয়ে দিতে সহযোগিতা করেন। তার চাহিদা পূরণে কেউ ব্যর্থ হলে তদন্ত প্রতিবেদন বিপক্ষে চলে যায়। এতে জমি নিয়ে এলাকায় বিরোধ সৃষ্টি হচ্ছে।

কাদিনগর, পালাগাও ও তামাট এলাকার একাধিক ভূক্ত ভোগী জানান, সার্ভেয়ার জহিরুল ইসলাম যোগদানের পর থেকে বিভিন্ন এলাকায় সরকারি ভিপি সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টিতে লিপ্ত রয়েছেন। এলাকায় তার সহযোগীদের মাধ্যমে প্রতিপক্ষ সৃষ্টি করে তাদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে একজনের দখলীয় জমি আরেকজনকে পাইয়ে দিচ্ছেন। এতে এলাকায় জমি নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভালুকা উপজেলা ভূমি অফিসে ঘুষ ছাড়া মিলছে না কোনো সেবা—এমন অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় সেবাপ্রত্যাশীরা। অতিরিক্ত অর্থ না দিলে দিনের পর দিন অফিসের বারান্দায় ঘুরতে হচ্ছে অনেককেই। জমির নামজারি, খতিয়ান দেখানো, তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা খাজনা আদায়—প্রতিটি ধাপে টাকা না দিলে কাজ হয় না বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।

ভালুকা উপজেলা ভূমি অফিসে সরেজমিনে গিয়ে পরিচয় গোপন করে তথ্য জানতে চাইলে সেবাগ্রহীতাদের অনেকেই জানান, ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার (এসিল্যান্ড) অফিসকে দুর্ণীতিমুক্ত করতে শ্রম দিলেও অফিসের সার্ভেয়ার, উপ প্রশাসনিক কর্মকর্তা রুবেল হোসাইন,
সার্টিফিকেট পেশকার খাইরুল ইসলাম, মিউটেশন সহকারী সাজ্জাদ হোসেনের মত কিছু অসাধু ঘুষখোর কর্মকর্তাদের জন্য অফিসের বদনাম মুছতে পারছেনা, এদের ঘুস বাণিজ্যে অতিরিক্ত অর্থ ছাড়া কোনো ফাইল এসিল্যান্ডের সামনে যায় না, একটি মিউটেশনের সরকারি চার্জ ১১৭০ টাকা হলেও অভিযোগ উঠেছে ভালুকা ভূমি অফিসে মিউটেশনে প্রতিটি ৫হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকেন মিউটেশন সহকারী সাজ্জাদ হোসেন। কোনো মিউটেশন ৫ থেকে ২০ হাজার টাকার কমে কাজ সম্পন্ন হয়না।

সেবাগ্রহীতাদের দাবি, সার্ভেয়ার জহিরুল হক উপ প্রশাসনিক কর্মকর্তা রুবেল হোসাইন, সার্টিফিকেট পেশকার খাইরুল ইসলাম, মিউটেশন সহকারী সাজ্জাদ হোসেনরা নিজের নিয়ন্ত্রণে কয়েকজন দালাল রেখে সেবা গ্রহীতাদের সঙ্গে কথা বলান। কোন কোন ক্ষেত্রে নিজেরাই অফিসের খরচের কথা বলে অতিরিক্ত অর্থ নেন।

একই রকম কথা বলেন বাবার নামে রেকর্ডিয় সম্পত্তি নামজারি করার জন্য গিয়েছিলাম ভূমি অফিসে। ওই অফিসে ৩-৪ কার্যদিবস যাওয়ার পর উপ প্রশাসনিক কর্মকর্তা রুবেল সাহেব বললেন, অফিস খরচ না দিলে কীভাবে ফরওয়ার্ডিং হবে। বাধ্য হয়ে টাকা দিয়ে আমার কাজটা আমি করেছি। তারপরও খুশি, আমার কাজ তো হলো।

অভিযোগ উঠেছে-রুবেল হোসাইন অফিসের জেনারেল স্টাফ হলেও বার-বার তদবির করিয়ে এসিল্যান্ড অফিসে পোস্টিং নেন তিনি।

ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটালাইজেশন হওয়ার পরেও মানুষের ভোগান্তি বা প্রতারণা মুক্ত কেন হয়নি, এ প্রসঙ্গে একজন সামাজিক বিশ্লেষক বলেন, কেন্দ্র সরকার যেভাবে সংস্কারের মাধ্যমে মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে চান, তৃণমূল পর্যায়ে আসলে সেই মেসেজটি এখনো সেভাবে পৌঁছায়নি। যে কারণেই শত চেষ্টার ফলেও ভূমি ব্যবস্থাপনায় সেবাগ্রহীতার হয়রানি রোধ করা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে উপজেলা প্রশাসনেরও সদয় আন্তরিকতা ও কঠোর তদারকি দরকার বলে মনে করেন তিনি। তবেই হয়তো ভূমি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতিমুক্ত করা যাবে বলে মনে করেন তিনি।

(এনআরকে/এসপি/মার্চ ১২, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

১২ মার্চ ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test