E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

নাসিমার জীবন লড়াই থেমে গেল বাস ডুবির ঘটনায়

২০২৬ মার্চ ২৮ ১৮:১৯:৫৫
নাসিমার জীবন লড়াই থেমে গেল বাস ডুবির ঘটনায়

শাহ্‌ আলম শাহী, দিনাজপুর : ভয়াবহ রানা প্লাজা দূর্ঘটনা থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া দিনাজপুরের নাসিমা বেগম জীবন লড়াই শেষ পর্যন্ত থেমে গেল রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় পদ্মা নদীতে এক মর্মান্তিক বাস দুর্ঘটনায়।

২০১৩ সালের দিনাজপুরের পার্বতীপুরের নাসিমা বেগম (৪০)। রানা প্লাজার দূর্ঘটনায় তিনদিন পর উদ্ধার হয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসে। সেই নাসিমাকে শুক্রবার (২৭ মার্চ) জুমার নামাজের পর দিনাজপুরের পার্বতীপুর স্থানীয় পারিবারিক কবরস্থানে নিহতদের দাফন করা হয়েছে।

নিহত অন্যরা হলেন- নাসিমার নাসিমার অন্তঃসত্ত্বা ভাগনি আজমিরা খাতুন, এবং চার বছর বয়সী শিশু আব্দুর রহমান।

পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নাসিমা বেগমের স্বামীর মৃত্যুর পর দুই সন্তান নিয়ে দিনাজপুরের পার্বতীপুর পজেলার ৪নং পলাশবাড়ী ইউনিয়নের মধ্যআটরাই গ্রামে তার বাবার বাড়ীতে থাকতেন।জীবীকার সন্ধানে কাজ করতেন ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায়। এবার ঈদুল ফিতর তিনি রাজবাড়ী জেলাতে ভাগ্নির বাড়িতে উদযাপন করেছেন।

গত বুধবার বিকেলে নাসিমা তার ভাগনি, ভাগনি জামাই ও শিশুকে নিয়ে ঢাকা যাওয়ার উদ্দেশে বাসে রওনা হন। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরিঘাট এলাকায় পৌঁছালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। ভাগনি জামাই আব্দুল আজিজ বাস ডুবির আগে মাগরিবের নামাজ আদায়ের জন্য ওজু করতে বাস থেকে নেমে যাওয়ায় প্রাণে বেঁচে যায়। বাস ডুবিতে তিনজন নিখোঁজ থাকেন। প্রায় ছয় ঘণ্টা পর রাত সাড়ে ১১টার দিকে নদী থেকে নাসিমাসহ তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

নাসিমার বড় বোন সানোয়ারা জানান, তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে নাসিমা সবার ছোট। এক যুগ আগে পার্বতীপুর উপজেলার রামপুর ইউনিয়নের রঘুনাথপুর ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে নুর ইসলামের সাথে বিয়ে হয় তার। স্বামীর মৃতুর পর মৃত বাবা নুর ইসলামের বাড়ীতে বসবাস করতো নাসিমা। গেল রমজানে চাকুরির খোঁজে ভাগ্নী নাজমিরার বাড়ী কালুখালীর রাজবাড়ীতে চলে যায় সে। সেখানে ঈদ উদযাপন শেষে ভাগ্নী জামাই আব্দুল আজিজ ঢাকায় চাকুরী করার সুবাদে নাসিমা, তাজমিরা ও তাজমিরার ছেলে কিশোর আব্দুর রহমানকে (৬) নিয়ে সৌহাদ্য পরিবহনে স্ব-পরিবারে কর্মস্থলে ফিরছিলো তারা। ঢাকায় ভাড়া বাসায় পৌঁছে কোন একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে নাসিমার যোগ দেয়ার কথা। পথিমধ্যে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট পদ্মায় হটাৎ পরিবহনটি দুর্ঘটনায় পড়ে বাসটি ডুবে প্রান হারান নাসিমাসহ তার ভাগ্নী ৪ মাসের অন্তঃসত্ত্বা তাজমিরা ও ৬ বছরের কিশোর ভাগ্নে আব্দুর রহমান। দুর্ঘটনার কিছু আগে ভাগ্নী জামাই আব্দুল আজিজ নামাজের জন্য বাস থেকে নেমে পড়ায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনি। কিছুক্ষন পর নামাজ শেষে এসে আজিজ দেখতে পায় সব শেষ হয়ে গেছে।

মর্মান্তিক এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নিহতদের মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে কুষ্টিয়া এলাকায় অ্যাম্বুলেন্সটি আবারও দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। তবে নাসিমার চাচাতো ভাই জুলফিকার আলী ভুট্টু জানিয়েছেন, দ্বিতীয় দফায় এই দুর্ঘটনায় বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

নাসিমা বেগমের জীবনের গল্পটি ছিল লড়াই আর সংগ্রামের। ২০১৩ সালে সাভারের রানা প্লাজা ধসের সময় তিনি ওই ভবনে কর্মরত ছিলেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে টানা তিনদিন আটকে থাকার পর তাকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল। সেই ঘটনার পর দীর্ঘদিন গ্রামে থাকলেও স্বামীর মৃত্যুর পর জীবিকার তাগিদে তিনি আবারও ঢাকায় ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। আর সেই যাত্রাই ছিল তার জীবনের শেষ যাত্রা।

পার্বতীপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আ. ওয়াদুদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, নিহতের বাড়িতে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে এবং তাদের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে।

পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাদ্দাম হোসেন জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে নগদ ২৫ হাজার টাকা সহায়তা প্রদান করেছেন।

এদিকে ফেরিঘাট পদ্মায় বাসডুবির ঘটনায় সরকারী সহায়তার ২৫ হাজার টাকা ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নানের পক্ষ থেকে দেয়া সহায়তাস্বরুপ ২৫ হাজার টাকা পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মর্কতা (ইউএনও) মোঃ সাদ্দাম হোসেনের মাধ্যমে নাসিমার পরিবারের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। এসময় সাদ্দাম হোসেন নিহত পরিবারের প্রতি শোক ও সমবেদনা জানান। এই মৃত্যু আর ভাগ্য বিড়ম্বনার, ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া ফেলেছে।

(এসএস/এসপি/মার্চ ২৮, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

২৮ মার্চ ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test