E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

 

ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত: যাচ্ছে সোনা, আসছে মাদক

২০২৬ এপ্রিল ১৬ ১৮:১০:০৬
ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত: যাচ্ছে সোনা, আসছে মাদক

হাবিবুর রহমান রুবেল, ঝিনাইদহ : দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত জেলা ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা জেলার সীমান্তজুড়ে স্বর্ণ ও মাদকের এক অদ্ভূত বিনিময় বাণিজ্য গড়ে উঠেছে। যেখানে একদিকে পাচার হচ্ছে স্বর্ণ, অন্যদিকে দেশে ঢুকছে ভয়ঙ্কর সব মাদক। 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, এটি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং সঙ্ঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত একটি সুপরিকল্পিত নেটওর্য়াক।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের ভেতর থেকে স্বর্ণ পাচার হয়ে যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশ ভারতে। এর বিনিময়ে সেখানে থেকে আসছে ফেনসিডিল, উইনকেরেক্স, ইয়াবা, হেরোইন, কোকেন, আইসসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য। পাচারকারীরা নগদ লেনদেন এড়িয়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের বিনিময়ে টাকা লেনদেন করছে। ফলে অর্থ লেনদেনের প্রমাণ থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এ নিয়ে কিছু করতে পারছে না।

বিজিবির তথ্যমতে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ১০ এপ্রিল পর্যন্ত ৯ কোটি ৭০ লাখ ৩৬ টাকার মাদক জব্দ করা হয়েছে। একই সময়ে ১৮ কোটি ৯১ লাখ ৬৮ হাজার ৫০৪ টাকার স্বর্ণ উদ্ধার করে বিজিবি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা জেলা জীবননগর গ্রামের মইনুদ্দিন ময়েন, হরিয়ান নগরের টিটু মেম্বার, শাখারিয়া গ্রামের আউয়ুব উদ্দিন, যাদবপুর গ্রামের ছালাম মেম্বার, যাদবপুর গ্রামের গণি মেম্বার, সদরপাড়া গ্রামের রিপন হোসেন, একই গ্রামের বাদল মেম্বার, ঝিনাইদহের মহেশপুৃর উপজেলার বাঘাডাঙ্গা গ্রামের মতিউর রহমান, গুড়দহ গ্রামের রবিউল হোসেন, ভববনগর গ্রামের কামরুজ্জামান টিটু, খোসালপুর গ্রামের ফয়সাল হোসে শিশির, কাঞ্চনপুর গ্রামের আলিমুল হক বর্তমানে মহেশপুর ও জীবননগর উপজেলার চোরাচালান সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে। আগে অন্যরা চোরাচালানে যুক্ত থাকলেও গত দুই বছর ধরে সীমান্তে এরা কঠোর বলয় তৈরি করেছে। সরাসরি ঢাকার এয়ারপোর্ট থেকে সড়ক ও রেলপথে এদের হাতে পৌঁছে যায় স্বর্নের বার। পরে সেগুলো সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে ভারতে পাঠিয়ে দেয়। প্রতি পিস স্বর্ণের বার ভারতে প্রবেশ করাতে পারলে পাচারকারীরা বর্তমানে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা পেয়ে থাকে। একই পন্থায় আবার ওপার থেকে মাদক নিয়ে দেশের বিভন্ন প্রান্তে পেঁছে দিচ্ছে এ সিন্ডিকেট। মাদকের অঅকারভেদে আলাদা কমিশন পেয়ে থোকে পাচারকারীরা।

সূত্র জানায়, আগে যেখানে সীমান্তের নির্দিষ্ট পয়েন্ট ব্যবহার করে চোরাচালান হতো, এখন সেখানে কৌশলে এসেছে বেশ পরিবর্তন। গ্রামীণ মেঠাপথ, মাছ ধরার নৌকা ও কৃষিপণ্যের সঙ্গে স্বর্ণ পাচার চলছে অবাধে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাত নামলেই অচেনা মানুষের আনাগোনা বাড়ে এলাকায়। অনেক সময় প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব লেনদেন সম্পন্ন করা হয়। আমাদের সীমান্ত দিয়ে আগে শুধু গরু বা বিভিন্ন পণ্য পাচার করা হতো। এখন দেখি মাদকই সবচেয়ে বেশি আসছে। স্থানীয় যুবসমাজের মধ্যে এর প্রভাব ভয়ঙ্কর ভাবে পড়েছে।

অপরাধ বিশ্লেষক লিয়াকত হোসেন বলেন, ‘স্বর্ণ পাচারের কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একই সঙ্গে মাদকের বিস্তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী মাদকে আসক্ত হয়ে পড়লে তা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় উৎপাদনশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে। বর্ডার গার্ড, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান চালালেও সীমান্তে স্বর্ন ও মাদক পাচার পুরোপুরি ঠেকানো যাচ্ছে না। চোরাচালানগুলো চক্রগুলো অত্যন্ত সংগঠিত এবং প্রভাবশালী হওয়ায় অনেক সময় অভিযান শুরুর আগেই তারা তথ্য পেয়ে যায়। ফলে অভিযান পরিচালনা করেও দৃশ্যমান কোনো ফল আসে না।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পাচারকারী বলেন, ‘আমরা বেশিরভাগ সময় রাতে এসব কাজ করে থাকি। স্থানীয় বিজিব ক্যাম্পের বেশকিছু সদস্য আমাদের কাজে সহযাগিতা করে থাকেন। তবে তাদের পাচার অনুযায়ী নিয়মিত টাকা দিতে হয়। ঢাকা থেকে মালিকরা সুনির্দিষ্ট জায়গায় স্বর্ণের বার পাঠিয়ে দেয়। আমরা সেখান থেকে সংগ্রহ করে ওপারে নির্বিঘেœ পাঠিয়ে দিই।’

এ বিষয়ে জানতে মহেশপুৃর ৫৮ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্ণেল রফিকুল আলমের ব্যবহৃত মোবাইলে এখাধিক বার করলেও তিনি রিসিভ করেননি। এমনকি তাঁর কার্যালয়ে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।

তবে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শেখ মো. হাশেম আলী বলেন, ‘সীমান্তে বিজিব শুধু নজরদারি বাড়ালেই হবে না। চোরচালান নিরসনে সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সচেতন করা জরুরি। একই সঙ্গে আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা জোরদার না করলে এই সমস্যা দীর্ঘমেয়াদে আরও জটিল আকার ধারণ করবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘স্বর্ণ ও মাদকের এই অদৃশ্য বাণিজ্য কেবল আমাদের আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আমরা নিয়মিত অভিযান চালিয়ে সীমান্ত এলাকা থেকে মাদক কারবারিদের আটক করছি। আশা করছি সকলের প্রচেষ্টায় শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান ঘটবে।’

(এইচআর/এসপি/এপ্রিল ১৬, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

১৬ এপ্রিল ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test