E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

তেলের লাইনে মানুষের ভরসায় চায়ের কাপে স্বপ্ন বোনেন বাঘ বিধবা মাহফুজা

২০২৬ এপ্রিল ২৭ ১৮:২৫:২৫
তেলের লাইনে মানুষের ভরসায় চায়ের কাপে স্বপ্ন বোনেন বাঘ বিধবা মাহফুজা

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরার শ্যামনগরে তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের ক্লান্তি কিছুটা লাঘব করে এক কাপ গরম চা। আর সেই চায়ের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক সংগ্রামী নারীর জীবনযুদ্ধের গল্প। তিনি মাহফুজা খাতুন —স্থানীয়দের কাছে পরিচিত “বাঘ বিধবা” হিসেবে।

শ্যামনগর সহ সারা দেশের জ্বালানি তেলের সংকট মুহূর্তে উপজেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফিলিং স্টেশন থেকে তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। মুন্সিগঞ্জ ডেলমা ফিলিং স্টেশন থেকে সপ্তাহে তিন টি ইউনিয়নের ৩দিন তেল দেওয়া হয়। তেল আগে নেওয়ার জন্য ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালকরা আগের দিন থেকে সিরিয়াল দিয়ে অপেক্ষা করে।

সেই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের জন্য ছোট্ট একটি চায়ের দোকান বসান মাহফুজা। বাঁশ-তাঁবুর ছাউনি আর কয়েকটি বেঞ্চ—এতেই গড়ে উঠেছে তার ক্ষুদ্র ব্যবসা। গভীর রাত থেকে শুরু করে পরের দিন রাত ৯ থকে ১০টা পর্যন্ত কেনাবেচা ভাল হয়। কখনো সিদ্ধ ডিম, পানি, কলা, কেক, চা বিস্কুট বিক্রি করে সংসার চলছে মাফুজার। প্রতিদিন ২ থেকে ৩ হাজার টাকা বেচাকেনা হয়।

২০০২ সালে তার স্বামী সাত্তার গাজী সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে নিহত হয়। সেখান থেকে তার দুটি সন্তানের হাত ধরে বাপের বাড়ি গিয়ে নদীতে জাল টেনে ও দিনমজুরির কাজ করে সংসার চালিয়ে বাচ্চা দুটোর মুখে খাবার তুলে দেয় মাহফুজা। পরবর্তীতে মুন্সিগঞ্জ বাজারের পাশে স্বামীর ভিটায় নিয়ে আসে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা।

বাঘ বিধবা মাহফুজা বলেন, স্বামী চলে যাওয়ার পর প্রথমে খুব ভেঙে পড়েছিলাম। স্বামী বেঁচে থাকা কালীন কোন সময় বাইরে এসে কাজ করতে হয়নি, মানুষের সামনে দাঁড়াতে হয়নি। স্বামী বাঘের আক্রমণে নিহত হওয়ার পর দুটি সন্তান নিয়ে সুন্দরবনের নদীতে জাল টানা থেকে শুরু করে সকল ধরনের কাজ করে আমি সংসার চালিয়েছি। ছেলে বড় হয়েছে, আয় করতে শিখেছে ওদের সাথে আমি এই চা এর দোকানটি করে গত দুই সপ্তাহ যাবত, রাতে ব্যাগে করে মালামাল নিয়ে আসি। আর এই টেবিলটা পাশের বাড়িতে রেখে যাই, এভাবেই চলছে দোকানটি। এখানে ভালো কেনাবেচা হচ্ছে। তেলের লাইন দিতে আসা মানুষ সবচেয়ে বেশি চাহিদা স্যালাইন ও পানি, এখন প্রচন্ড তাপ এটা শুধু পানি লাগে পাশের বাড়িতে গেলেও কেউ পানি দিতে চায় না। এখানে মানুষের সেই চাহিদা অনুযায়ী আমি পানি স্যালাইন অন্যান্য খাবার দিতে পারছি না, উপযোগী সহায়তা থাকলে আরেকটু কেনাবেচা বেশি হতো।

তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অনেকেই জানান, মাহফুজার চা শুধু ক্লান্তি দূর করে না, তার হাসিমুখ আর আন্তরিকতা মানুষের মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।

স্থানীয় এক গ্রাহক পিন্টু বলেন, “ চা খেলে শুধু চা খাওয়া হয় না, একটা সাহসও পাওয়া যায়।” তবে প্রতিদিনের সংগ্রাম সহজ নয়। বৃষ্টি, রোদ, ঝড় সবকিছুর মাঝেই টিকে থাকতে হয় তাকে। তবুও থেমে থাকার সুযোগ নেই। স্বপ্ন একটাই—সন্তানদের ভালো ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। সমাজের সহানুভূতি আর সামান্য সহায়তা পেলে হয়তো আরও একটু স্বস্তি পেতেন মাহফুজা। কিন্তু ততদিন পর্যন্ত, শ্যামনগরের তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ভরসা হয়ে, চায়ের কাপে স্বপ্ন বুনেই এগিয়ে চলবেন এই সংগ্রামী নারী।

একটি ইউনিয়নের তেল দেওয়া শেষ হয়ে গেলে সাথে সাথে আরেকটি ইউনিয়নের মোটর সাইকেলের সিরিয়াল পড়ে যায়। সেই দিনের অপেক্ষা করা মানুষের একটু সেবা দিয়ে যাচ্ছেন বাঘ বিধবা মাহফুজা খাতুন। বাঘ বিধবা মাহফুজা ছেলেকে সাথে নিয়ে প্রতিদিন রাতে ফিলিং স্টেশনের সামনে একটা ছাউনি টানিয়ে চা বিক্রি করে চলেছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থ না থাকায় মানুষের কাছ থেকে ধার নিয়ে কোন প্রকার এখানে মানুষের সেবা দিয়ে সংসার চলিয়ে যাচ্ছে।

বেসরকারি স্বে্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান সিডিও এর নির্বাহী পরিচালক গাজী আল ইমরান বলেন, যাদের স্বামী সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে নিহত হয়েছেন এই বাঘ বিধবা মায়েরা আজ সমাজের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের কাছে চা বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন এটা অত্যন্ত মানবিক। তাদের পরিবারসহ তার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা বেসরকারী উন্নয়ন সংগঠন সহ সরকারের দায়িত্ব। উপকূলের জীবন সংগ্রামে এগিয়ে নিতে মানবিক এবং সরকারি বেসরকারি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া উচিত বলে মনে করি।

মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের (ভারপ্রাপ্ত) চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম পল্টু বলেন, আমাদের ইউনিয়নে অনেক বাঘ বিধবা রয়েছে, তাদের যতটুকু সহযোগিতায় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে করা দরকার আমি সব সময় চেষ্টা করি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও সত্য তাদের পরিচ্ছ্রান্ত ভারাক্রান্ত মন-মানসিকতা নিয়ে তারা কোন কাজের সাথে যুক্ত হতে চায় না। তবে তাৎক্ষণিক সোশাল সেফটিনেট প্রোগ্রামের আওতায় সহযোগিতা করা যায়, আমি সকল বাঘ বিধবাদের চেষ্টা করি। মাহফুজা খাতুন এই ইউনিয়নের আমার ওয়ার্ডের বাড়ী আমি তাকে চিনি তার স্বামী বেঁচে থাকলে হয়তো তার বাইরে আসতে হতো না, কিন্তু এখন তাকে এভাবেই সংগ্রাম করে বাঁচতে হবে। আমি যতটুকু পারি সহযোগিতা করার চেষ্টা করব।

(আরকে/এসপি/এপ্রিল ২৭, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

২৭ এপ্রিল ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test