E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

কানাইপুরের কাশিমাবাদ-কানাইডাঙ্গি গ্রামে যা ঘটেছিল

২০২৬ এপ্রিল ২৮ ১৮:১৪:০২
কানাইপুরের কাশিমাবাদ-কানাইডাঙ্গি গ্রামে যা ঘটেছিল

রিয়াজুল রিয়াজ, বিশেষ প্রতিনিধি : ফরিদপুর সদর উপজেলার কানাইপুরে ইউনিয়নের কাশিমাবাদ-কানাইডাঙ্গি গ্রামে গত রবিবার ইউনিয়ন হিন্দু-বৈধ্য-খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রামচরণ মণ্ডলের সাথে কতিপয় স্থানীয় প্রতিপক্ষ দুই যুবক সাঈদ মোল্লা ও শাহিন মোল্লার মধ্যকার মারামারির ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক রঙ লাগিয়ে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ ঘটনাটিকে 'রামচণের ওপর হামলা' হিসেবে আখ্যায়িত করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ একাধিক মাধ্যমে চালানো প্রচারণাও উদ্দেশ্য প্রনোদিতভাবে একটি স্বার্থান্বেষী মহল কতৃক ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা বলে স্থায়ীয়রা ধারণা করছেন। এমনকি এঘটনার পরে গ্রামে থাকা একটি সুরক্ষিত মন্দিরের প্রতিমা ভাঙার অভিযোগেরও গ্রহণযোগ্য কোনো সঠিক তথ্য প্রমাণ মেলেনি।

আজ সোমবার দুপুরব্যাপি সরেজমিনে তদন্ত করে, স্থানীয় জনগণ ও ঘটনার পরপর ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা কানাইপুর ইউনিয়ন পরিষদের একাধিক মেম্বার ও চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ঘটনায় উভয় পক্ষ ফরিদপুর কোতয়ালি থানায় মামলা পাল্টাপাল্টি মামলা করেছেন। ইতিমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এসব বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছেন জেলা পুলিশের একাধিক শাখা।

কি ঘটেছিলো কাশিমাবাদ-কানাইডাঙ্গি গ্রামে

গত ২৬ এপ্রিল (শনিবার) বিকেলে সদর উপজেলার কানাইপুর ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের কাশিমাবাদ কানাইডাঙ্গি গ্রাম সংলগ্ন কৃষি মাঠে কৃষিকাজে ব্যস্ত ছিলেন স্থানীয় জশরথ মন্ডলের ছেলে রামচরণ মণ্ডল (৫০)। ওই একই মাঠে ভিন্ন জমিতে কৃষিকাজ করছিলেন স্থানীয় আওয়াল মোল্লার ছেলে সাঈদ মোল্লা (১৭) ও হান্নান মোল্লার ছেলে শাহিন মোল্লাও (১৮)। এলাকায় পুর্ব পরিচিত থাকায় রামচরণ ও ওই দুই যুবকের মধ্যে গত ঈদুল ফিতরের দিনে ঈমামের বেতন নিয়ে মারামারির ঘটনা ও পরবর্তী হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, মামলা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হয়। (উল্লেখ্য, রামচরণ মণ্ডল ওই মামলার একজন এজাহার নামীয় আসামি এবং ওই দুই যুবক তাঁর প্রতিপক্ষের লোক হিসেবে গণ্য।) তাদের ওই আলোচোনাটি এক পর্যায়ে কথাকাটিতে রূপ নেয়, যা পরে মারামারিতে পর্যায়ে পৌঁছে । এ মারামারির এক পর্যায়ে রামচরণ মণ্ডল তার হাতে থাকা কাস্তে বা ছ্যান জাতীয় বস্তু দিয়ে সাঈদ মোল্লা(১৭) এর মাথায় আঘাত করতে গেলে সাঈদ মোল্লা তা হাত দিয়ে ফেরানোর চেষ্টাকালে কোপটি সাঈদের হাতে লেগে হাত কেটে গিয়ে রক্তাক্ত জখন হয়।

অপরদিকে ওই যুবকদ্বর পাশের খেত থাকা লাঠি জাতীয় বস্তু নিয়ে রামচরণের শরীরে একাধিক আঘাত করে। পরে তাদের চিৎকার-চেচামেচি শুনে স্থানীয়রা দৌড়ে গিয়ে ওই মারামারি থামিয়ে দেন এবং আহতদের উদ্ধার করেন। এরপর সাঈদ মোল্লার হাতের রক্তক্ষরণ থামাতে তাকে ফরিদপুর সদর হাসপাতাতে নিয়ে যায় তার পরিবারের সদস্যরা। সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা সাঈদের হাতে সাতটি শেলাই দিয়ে প্রয়োজনীয় ঔষধ পত্র দিয়ে তাকে বাসায় গিয়ে বিশ্রামে পাঠিয়ে দেয়। পরে, রামচরণ মণ্ডল জানতে পারেন যে আহত সাঈদের হাতে সাতটি শেলাই লেগেছে তখন তিনিও ওই একই হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হন। রামচরণের পরিবার জানিয়েছে আহত রাম রক্তাক্ত জখম না হলেও লাঠি পেটা খেয়ে তার শরীরের কয়েকটি জায়গায় নিলা জখম হয়েছে। এ ঘটনায় ফরিদপুর কোতয়ালি থানায় উভয় পক্ষ থেকে পাল্টাপাল্টি মামলা করা হয়েছে। তবে এ মারামারির নিষয়ে একাধিক মাধ্যমে একমাত্র মোমিন আলী মীর (৬০)কে অভিযুক্ত করে যে বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে তার কোনো সত্যতা মেলেনি। পাওয়া যায়নি এ ঘটনায় মোমিনের সম্পৃক্ততাও।

রামের সাথে মারামারি করা ওই দুই যুবক মোমিন মীরের লোকজন বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত হলেও মারামারির ঘটনায় সময় মোমিন মীর ঘটনাস্থলেই উপস্থিত ছিলেন না। মোমিন মীর ওই সময়ে মধুখালী থানার দিলমুত্রাপুর গ্রামে তার বোনের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। এদিকে, সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় রাম মন্দির ভাঙার ঘটনা ও রামচড়ণ মণ্ডলের বাড়িতে হামলা বা লুটপাটের যে অভিযোগ উঠেছিলো তারও কোনো গ্রহণযোগ্য তথ্য প্রমাণ মেলেনি। এ বিষয়ে অভিযোগকারীদের কথাবার্তায়ও মিলিছে অতিমাত্রায় অসংগতি। তাই বিষয়টি অবশ্যই সঠিক তদন্তের দাবি রাখে বৈকি।

গত ২৬ এপ্রিল ঘটনার পরপর ঘটনাস্থলে ছুটে যান কানাইপুর ইউনিয়ন বিএনপি'র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও ওই ইউনিয়ন পরিষদের একজন নির্বাচিত মেম্বার মো. মোতালেব শেখ এবং কানাইপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ আলতাফ হুসাইন। এ বিষয়ে বিএনপি নেতা মোতালেব শেখ উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে জানান, 'আমি, ইউপি চেয়ারম্যান ও আমার ইউনিয়ন বিএনপি'র সাংগঠনিক সম্পাদক মো. কামরুল ইসলাম ঘটনাস্থলে গিয়ে মন্দির পরিদর্শন করে উভয় পক্ষকে ঢেকে তাদের বক্তব্য শুনেছি। মন্দির পরিদর্শনে গিয়ে দেখি মন্দিরের কয়েকটি প্রতিমা নীচের ফ্লোরে অক্ষত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। যদিও মন্দিরটি আগে থেকেই ছিলো সুরক্ষিত। রাতে প্রত্যেকদিন ওই মন্দিরে তালা লাগানো অবস্থায় থাকতো এবং সেটিই থাকার কথা। কিন্তু মারামারির ওই রাতেই ওরা নাকি মন্দিরে তালা মারেনি। তাছাড়া যেভাবে মুর্তিগুলো মন্দিরের ফ্লোরে রাখা ছিলো সেটি যদি একইভাবে কেউ মন্দিরের পুর্ব অবস্থান থেকে ফেলে দেয়, তবে তা কোনোভাবেই এরকম অক্ষত থাকার কথা নয়; বরং ভেঙে চুর্ণবিচুর্ণ হয়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু তা হয়নি। তারপরও এ বিষয়টির পাশাপাশি উভয় পক্ষের কথাবার্তা, বক্তব্য ও যুক্তিতর্ক আমরা শুনে স্থানীয়ভাবে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে তদন্তের করে দেখে সঠিক ঘটনা বের করার আশ্বাস দেই, এবং বিষয়টি মীমাংসার জন্য শালিসের দিন তারিখ ঠিক করে দেই। কিন্তু এর মধ্যেই শুনি ঘটনাটি কয়েকটি মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তারা উভয় পক্ষ এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি মামলাও করে ফেলেছেন শুনেছি। এখন ব্যাপারটি পুলিশই তদন্ত করে দেখবে।

এ বিষয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ আলতাফ হুসাইন উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে জানান, 'দুই পক্ষের মারামারি ও রাতে মন্দির ভাঙার খবর শুনে আমি ও স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপি দুই নেতা মিলে ঘটনাস্থলে সবার বক্তব্য শুনেছি। রামচরণ মণ্ডল এবং স্থানীয় দুই যুবকের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটলেও আমরা মন্দির ভাঙা ও রামচরণের বাড়িতে হামলার বিষয়ে সঠিক কোনো তথ্য প্রমাণ এসময় পায়নি। আমরা উপর পক্ষের বক্তব্য শুনে আগামী বুধবার (২৯ এপ্রিল) এটি নিয়ে সালিশ বৈঠকের ব্যবস্থা করি। কিন্তু এর মধ্যেই দুই পক্ষ মামলা করেছে বলে শুনেছি। এমন পরিস্থিতিতে বুধবারের সালিশ হবে কিনা সেটাও জানি না'।

আলতাফ চেয়ারম্যান আরও বলেন, স্থানীয় দুই যুবক সাঈদ-শাহিন ও রামচরণ স্থানীয়ভাবে দু-পক্ষে একে ওপরের প্রতিপক্ষ হওয়ায় একটি বিচ্ছিন্ন মারামারির ঘটনাটিকে সাম্প্রদায়িক রঙ লাগিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙা লাগানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলেই আমাদের নিকট মনে হচ্ছে। এ ঘটনা থানা পুলিশ বা মিডিয়া আসার মতো বড় কোনো ঘটনা হয়েছে বলেও মনে হয়নি তাই আমরা স্থানীয়ভাবে সালিশের মাধ্যমে ঘটনাটির মীমাংসা করার চেষ্টা করেছিলাম ও পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। কিন্তু কিছু লোক এ ঘটনাটিকে বাড়াতে ও এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে কনটিনিয়াসলি অপপ্রচার ও অপচেষ্টা করে যাচ্ছে। যা শান্তিপ্রিয় এ এলাকার মানুষের সুখ-শান্তি বিনষ্টের অপতৎপরতা ছাড়া আর কিছুই নয়'।

চেয়ারম্যান আলতাফ আরও জানান, 'সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে, ঘটনাটিকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে ও এলাকার একটি বড় ধরণের হাঙামা লাগানোর অপতৎপরতা চলছে, যা দুঃখজনক ও উদ্দেশ্য প্রনোদিত বলেই মনে হচ্ছে'। এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন কানাইপুর ইউপি চেয়ারম্যান।

এদিকে, এ বিষয়টি নিয়ে উভয়পক্ষ একে অপরকে দোষারোপ করলেও স্থানীয় নিরপেক্ষ জনগণের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে যে প্রশ্নটি সামনে অবতারণা হয় তা হলো- 'গত ঈদুল ফিতরের দিনে ঈমামের বেতন বাড়ানো নিয়ে যে মারামারি, জখম ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে, রামচরণকে ফোকাস করে তারই একটি কাউন্টারের চেষ্টা হচ্ছে নাতো? এটি অবশ্যই তদন্তের দাবি রাখে। তবে, যদি সত্যিই ঈদের দিনের ঘটনার ভুক্তভোগীদের ফাঁসানোর জন্য এমনটি হয়ে থাকে, তাতেও যেনো এলাকায় যেনো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট না হয় সেটি নিশ্চয়তা চেয়েছেন স্থানীয়রা। স্থানীয় প্রশাসনকে এ বিষয়টিতে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তারা।

সোমবার (২৭ এপ্রিল) দুপুরে ফরিদপুর কোতয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে থানা পুলিশের একটি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে উভয়পক্ষের লোকজন, জনপ্রতিনিধিগণ ও স্থানীয় জনগণের সাথে কথা বলে গেছেন। তারা কাজ শেষে বিদায় নেওয়ার প্রাক্কালে কানাইপুর বাসস্ট্যান্ডে এ প্রতিবেদকের সাথে দেখা হলে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তদন্ত চলাকালীন মিডিয়াকে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি তারা। তবে, তদন্ত শেষ হলে আসল ঘটনা জানাতে পারবেন জানিয়ে ওই ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে ওই পুলিশ কর্মকর্তাগণ।

এ বিষয়ে ফরিদপুর কোতয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে জানান, 'কানাইপুরের কাশিমাবাদের ঘটনায় উভয় পক্ষ পৃথক পৃথক অভিযোগ করেছেন। তাদের অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনাটিতে থানা পুলিশের তদন্ত চলমান রয়েছে।

সোমবার রাতে এ বিষয়ে ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম, পিপিএম-এর সাথে কথা হলে তিনি উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে জানান, 'ফরিদপুর জেলা পুলিশের একাধিক শাখাকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে পাঠিয়েছি, তাঁরা তদন্ত করে দেখছেন। এছাড়া, 'এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যেনো কোনোভাবেই ওই এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট না হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলেও জানিয়েছেন এসপি নজরুল ইসলাম।

(আরআর/এসপি/এপ্রিল ২৮, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

২৮ এপ্রিল ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test