E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

শিক্ষার আলোহীন সিতা পাহাড়

জীর্ণ ঘরে চলে পাঠদান, বিশুদ্ধ পানির তীব্র হাহাকার

২০২৬ মে ০১ ১৮:১৪:৩৫
জীর্ণ ঘরে চলে পাঠদান, বিশুদ্ধ পানির তীব্র হাহাকার

রিপন মারমা, রাঙ্গামাটি : পাহাড়ের বুক চিরে প্রতিদিন সূর্য ওঠে, আবার পাহাড়ের আড়ালেই তা হারিয়ে যায়। কিন্তু রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার রাইখালী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের অতি দুর্গম নারানগিরি সিতা পাহাড় এলাকার চিত্রটি ভিন্ন। এখানে শতাধিক মারমা পরিবারের শিশুদের ভাগ্যে শিক্ষার আলো পৌঁছানোর আগেই যেন সন্ধ্যার আঁধার নেমে আসছে। কাপ্তাই উপজেলা সদর থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরত্ব হলেও, আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়া থেকে আজও অনেকটাই বিচ্ছিন্ন এই জনপদ। নেই কোনো গাড়ি যাতায়াত ব্যবস্থা, নেই সুপেয় পানির নূন্যতম নিশ্চয়তা।

উঁচু-নিচু পাহাড় আর বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে এই এলাকা থেকে উপজেলা সদরে যাওয়ার একমাত্র উপায় হলো ‘পায়ে হাঁটা’। যাতায়াতের কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় কোমলমতি শিশুদের পক্ষে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ হেঁটে শিক্ষা গ্রহণ করা কার্যত অসম্ভব। এলাকার অধিকাংশ মানুষ কৃষিজীবী এবং চরম অসচ্ছল। পেটের দায়ে যুদ্ধ করা এসব মানুষের কাছে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সন্তানদের স্কুলে পাঠানো এখন বিলাসিতা মাত্র।

এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, ১৯৯৫ সালে 'সংগ্রাম' নামক একটি এনজিও সংস্থা এই দুর্গম এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়াতে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিল। দীর্ঘ সময় ধরে স্কুলটি ছিল এই শিশুদের একমাত্র ভরসা। জেলা পরিষদের মাধ্যমে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা প্রদান করা হতো। কিন্তু রহস্যজনক কারণে ৫ বছর আগে স্কুলটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে জীর্ণ ও পরিত্যক্ত বেড়ার ঘরটি অচল ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। শিক্ষকরাও স্কুল বন্ধ হওয়ার পর আর এলাকায় ফেরেননি।

বিদ্যালয়টি বন্ধ হওয়ায় যখন শিশুদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তখন আশার প্রদীপ হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় যুব সমাজ। জীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ সেই ভাঙা স্কুল ঘরটিতেই এলাকার শিক্ষিত তরুণ অংসাচিং মারমা ও তরুণী

সাইনুচিং মারমা নিজেদের উদ্যোগে শিশুদের পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন। কোনো বেতন বা প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই কেবল শিশুদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এই অসাধ্য সাধন করছেন তারা। তাদের স্পষ্ট কথা— "প্রাথমিক শিক্ষা ছাড়া আমাদের জনপদের উন্নতির কোনো বিকল্প নেই। তাই কষ্ট হলেও আমরা হাল ছাড়িনি।"

শিক্ষার অভাবের পাশাপাশি এই এলাকায় বড় সংকট সুপেয় পানি। শুষ্ক মৌসুমে প্রাকৃতিক ছড়া শুকিয়ে গেলে এলাকায় পানির হাহাকার পড়ে যায়। আবার বর্ষাকালে পাহাড় থেকে নেমে আসা ময়লা ও ঘোলা পানি বাধ্য হয়ে পান করতে হয়। এতে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে প্রায়ই আক্রান্ত হচ্ছে এলাকার শিশু ও বৃদ্ধরা।

সিতা পাহাড় এলাকার কার্বারি পাইচিংমং মারমা, স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি ক্যথোয়াই অং মারমা এবং স্থানীয় ব্যক্তিত্ব সের খান আক্ষেপের সুরে বলেন, "আমাদের ছেলেমেয়েরা শিক্ষার অভাবে দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে। ১৯৯৫ সালে শুরু হওয়া আমাদের স্বপ্নটা আজ ধ্বংসস্তূপ। আমরা সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানাই, আমাদের এই দুর্গম এলাকায় একটি স্থায়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন এবং পানীয় জলের সুব্যবস্থা করে এই অবহেলিত মানুষের ভবিষ্যৎ রক্ষা করুন।"

এ বিষয়ে কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, "আমি অনেকবার ওই এলাকা পরিদর্শনের চেষ্টা করেছি। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে দুর্গম পাহাড়ি পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখছি। আমি শিক্ষা কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।"

অন্যদিকে, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, "আমি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছি। ডলুছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সিতা পাহাড় এলাকাটি প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে এবং যাতায়াত অত্যন্ত দুর্গম। আমি ইতিমধ্যে জেলা শিক্ষা অধিদপ্তরে একটি প্রস্তাবনা পাঠিয়ে রেখেছি।"

পাহাড়ের এই দুর্গম জনপদ কি তবে অন্ধকারেই থেকে যাবে? নাকি প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপে সিতা পাহাড়ের শিশুদের কলকাকলিতে মুখরিত হবে কোনো নতুন বিদ্যালয়? এক বুক প্রত্যাশা নিয়ে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে এলাকাবাসী।

(আরএম/এসপি/মে ০১, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

০১ মে ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test