E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

নিশিনাথ: দুর্ধর্ষ ডাকাত থেকে পূজনীয়!

২০২৬ মে ০৮ ১৭:৩৮:২০
নিশিনাথ: দুর্ধর্ষ ডাকাত থেকে পূজনীয়!

রূপক মুখার্জি, নড়াইল : চিত্রা নদীর বাঁধাঘাট থেকে স্নান করে ভেজা কাপড়ে পায়ে হেঁটে পাকুড়গাছে জল ও দুধ ঢালছেন ভক্তরা। কেউ কেউ গাছের মোটা ডালে বাঁধছেন ইটের টুকরো, মনোবাসনা পূর্ণ হওয়ার আশায়! কেউ আবার উপবাস করে গাছের নিচে বসে পূজা দিচ্ছেন রোগমুক্তি কামনায়।

নড়াইল শহরের নিশিনাথতলায় মন্দির প্রাঙ্গণে অবস্থিত পাকুড়গাছের গোড়ায় এভাবে চলছে ভক্তদের জল ও দুধ দিয়ে পূজা-অর্চনার কার্যক্রম।

প্রতি বছর বৈশাখ মাসে নড়াইল অঞ্চলের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নিশিনাথতলায় সমবেত হয়ে পূজা-অর্চনা করে থাকেন। এটি নড়াইলের ঐতিহ্যে পরিণত হয়ে গেছে।

সপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবার নিশিনাথতলা মন্দিরে আবালবৃদ্ধবণিতার উপস্থিতিতে ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সকাল থেকে শুরু করে দুপুর পর্যন্ত চলে পূজা-অর্চনা। বৈশাখ মাসজুড়ে এ উৎসব অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ৫ এপ্রিল খুব সকালে দেখা যায়, চিত্রা নদীর বাঁধাঘাটে স্নান সেরে, ফুল, ফল ও জল নিয়ে পাকুড়গাছের তলায় আসছেন শত শত নারী-পুরুষ। তারা ফুল ও জলসহ গাছের গোড়ায় দুধ ঢালছেন। করছেন প্রার্থনা।

ভক্ত-অনুরাগীরা গাছটিতে দিচ্ছেন তেল ও সিঁদুর। কখনো বাতাসার মতো ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসামগ্রী নিয়ে প্রণাম করছেন। গাছতলা ঘিরে ভক্তদের উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত হয়েছে উঠেছে আশপাশ।

কথা হয় ইলা রানী বিশ্বাস নামে একজন ভক্তের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাঁধাঘাটে গিয়ে স্নান করেছি। সেখান থেকে পবিত্র জল, ফুল, ফল, তেল সিঁদুর নিয়ে এসেছি নিশিনাথতলায় পূজা দিতে। জল ঢালবো। গাছে জল দিলে পূণ্যলাভ হয়। প্রতিবছর এখানে ফুল ও জল দিয়ে পূজা দিতে আসি।’

কলেজছাত্র শিমুল পাঠক বলেন, ‘একসময় বাবা-মায়ের সঙ্গে এখানে জল ঢালতে আসতাম। মাসব্যাপী মেলা বসতো। সার্কাস, পুতুল নাচ, যাত্রা, মহানাম সংকীর্তনের আয়োজন হতো। এখন আর সে রকম মেলা হয় না। তবে, পাকুড়গাছ ঘিরে নিশিনাথ বাবার নামে জল ও দুধ ঢালার উৎসব এখনো রয়েছে।’

স্থানীয় লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, নড়াইলের নিশিনাথতলা এলাকাজুড়ে তখন গভীর বন-জঙ্গল। বহু বছর আগে ওই স্থানে আশ্রয় নিয়েছিলেন দুর্ধর্ষ ডাকাত সরদার নিশিনাথ। সেখানকার পাকুড়তলায় ছিল তার আস্তানা। পাশ দিয়ে ছিল লোক চলাচলের পথ। একদিন এক বৃদ্ধা হেঁটে ওই পথ ধরে তার মেয়ের বাড়ি যাচ্ছিলেন। পথে হঠাৎ মনে পড়ে ডাকাত নিশিনাথের কথা। ভয়ে তিনি মনে মনে মানত করেন, নির্বিঘ্নে মেয়ের বাড়ি পৌঁছাতে পারলে নিশিনাথের নামে পূজা দেবেন। পরে ওই বৃদ্ধা তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন।

এদিকে, বিষয়টি জানতে পারেন নিশিনাথ। ওই ঘটনা তার হৃদয়ে আলোড়ন তোলে। এরপর থেকে পথচারীরা নিশিনাথের উদ্দেশে পূজা দিতে শুরু করেন। তাদের পথ নির্বিঘ্ন হয়। ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা দূর হয়। মানুষের এই ভক্তি ও বিশ্বাসে পরিবর্তন আসে নিশিনাথের মনে। পাপের পথ ছেড়ে তিনি মন দেন সাধনায়। প্রতিদিন ভোরে স্নান সেরে পাকুড়গাছের নিচে ধর্ম সাধনায় ব্রতী হন এবং এক সময় তিনি সিদ্ধিলাভ করেন। পরবর্তীতে ওই গাছতলায় দেহত্যাগ করেন নিশিনাথ।

পরবর্তীতে স্থানীয়রা সেখানে একটি ছোট মন্দির নির্মাণ করেন। সময়ের পরিক্রমায় স্থানটি পরিচিত হয়ে ওঠে ‘শ্রীশ্রীনিশিনাথতলা মন্দির’ নামে।

নিশিনাথতলা মন্দির পরিচালনা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কার্তিক দাস বুড়ো জানান, এ বছর নিশিনাথতলায় মহানাম সংকীর্তনের আয়োজন করা হয়েছে। বৈশাখের শেষ সপ্তাহে এখানকার মেলা আরও জাঁকজমকপূর্ণ হবে বলে তিনি জানান।

নিশিনাথতলা মন্দিরের পূজারী সুনীল চক্রবর্তী বলেন, নিশিনাথতলায় কত বছর ধরে পূজা হচ্ছে, সেটা সঠিক জানি না। তবে, শুনেছি, এটা কম করে হলেও ৩০০ বছরের পুরনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। বৈশাখ এলেই এখানে প্রতি শনি ও মঙ্গলবার ভক্তরা নদী থেকে জল এনে পাকুড় গাছের গোড়ায় ঢালেন। পূজা করেন, প্রার্থনা করেন। ভক্তদের বিশ্বাস, এখান থেকে কেউ খালি হাতে ফেরে না। যিনি মন থেকে কিছু চান, নিশিনাথবাবা তা পূরণ করেন- এ বিশ্বাস এই অঞ্চলের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের।

(আরএম/এসপি/মে ০৮, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

০৮ মে ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test