E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

মরদেহ ফিরিয়ে আনার দাবি

লেবাননে নিহত সাতক্ষীরার শফিকুল ও নাহিদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম

২০২৬ মে ১২ ১৮:০১:৩৮
লেবাননে নিহত সাতক্ষীরার শফিকুল ও নাহিদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : লেবাননে ইজরাইলি ড্রোন হামলায় নিহত সাতক্ষীরার রেমিটেন্স যোদ্ধা শফিকুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলাম নাহিদের বাড়িতে আজ মঙ্গলবার সকালে চলছে শোকের মাতম। কর্মক্ষম দুই পরিবারের সদস্যকে হারিয়ে পরিবার দুটো দিশেহারা। মরদেহ দু’টি ফেরত আনার বিষয়ে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন পরিবারের সদস্যরা।

দক্ষিণ লেবাননের জেবদিন এলাকায় ইজরাইলি ড্রোন হামলায় নিহত শফিকুল ইসলাম (৪৮) সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের আফসার আলীর ছেলে। আর নাহিদুল ইসলাম নাহিদ (২০) আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের আব্দুল কাদেরের ছেলে ও আশাশুনির দরগাহপুর ডিগ্রী কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র।

শফিকুল ইসলামের মা আজেয়া খাতুন জানান, প্রায় ৫০ বছর আগে আশাশুনির বুধহাটা ইউনিয়নের নোয়াপাড়া গ্রামের আফছার আলীর সাথে তার বিয়ে হয়। স্বামীর জমি জায়গা না থাকায় বিয়ের কয়েক বছর পর বাবা জহিরউদ্দিন সরদারের বাড়ি সাতক্ষীরা সদরের ভালুকা চাঁদপুর গ্রামে চলে আসেন।

২০০৮ সালে বেসরকারি সংস্থা সুশীলন তাদের একটি ঘর দেয়। পরবর্তীতে দুই মেয়ে, স্ত্রী ও বাবা-মাকে নিয়ে বসবাসের জন্য পাকা ঘর বানাতে যেয়ে জাগরনী চক্র, আরআরার, ব্রাক ও টিএম সমিতি ছাড়াও স্থানীয়ভাবে কয়েকজনের কাছ থেকে চড়া সুদে আট লক্ষাধিক টাকা ঋণ নেয় শফিকুল। একপর্যায়ে পরিবারের ভাগ্যের পরিবর্তণ, সন্তানদের পড়াশুনা ও বাবা মায়ের চিকিৎসা খরচ যোগাতে চাচাত মামা আসাদুল এর সহযোগিতায় গত ২১ ফেব্রুয়ারি আশাশুনির কাদাকাটি গ্রামের নাহিদুল ইসলাম নাহিদের সাথে লেবাননে যায়।

শফিকুল পরিবারের বড় ও একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলে। তাঁর তিনটি বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। সে জেবদিন এলাকায় ফল বাগানে ও দুম্বা চরাতো। রবিবার রাতে শফিকুল তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের সাথে মুঠোফোনে কথা বলে। গতকাল সোমবার বিকেলে শফিকুল জেবদিন এলাকায় ইজরাইলি হামলা হতে পারেএমন আশঙ্কায় ভ্যানে করে নাহিদকে নিয়ে নিরাপদ স্থানে যা্িচছলেন। এসময় ইজরাইলি ড্রোন হামলায় ঘটনাস্থলে মারা যান শফিকুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলাম।

শফিকুল ইসলামের স্ত্রী রুমা খাতুন বলেন, শফিকুল ইসলাম ৮ লক্ষাধিক টাকা ঋণী। তিনি লেবাননে যাওয়ার পরে এক মাস আগে ৪০ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন। কিভাবে বৃদ্ধ শ্বশুর শাশুড়িসহ সন্তানদের প্রতিপালন করবেন তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তাছাড়া ঋণের বোঝা নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায়। দুই মেয়ের পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

শফিকুলের বড় বোন জাহানারা খাতুন বলেন, একমাত্র উপার্জসক্ষম ভাই শফিকুল মারা যাওয়ায় তার পরিবার সাগরে ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

বাবা আফসার আলী বলেন, তিনি তার ছেলের লাশ দ্রুত ফেরৎ চান। বিলাপ করতে করতে মুর্চ্ছা যান আফসার আলী।

শফিকুলের বুধহাটা কওছারিয়া দাখিল মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণীতে পড়–য়া মেয়ে বৃষ্টি ও ভালুকা চাঁদপুর ডিগ্রী কলেজের একাদশ শ্রেণীর মেধাবী ছাত্রী (এসএসসিতে জিপিএ-৫) মৌ জানায়, তার বাবার অবর্তমানে তাদের পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যাবে। তার দাদা দাদীসহ পরিবারের ৫ সদস্যের মুখে ভাত কিভাবে জুটবে তা সে বুঝতে পারছে না। তা ছাড়া সমিতির কিস্তি দিতে হলে তাদেরকে বাড়ি ছাড়তে হবে।

প্রতিবেশী রফিকুল ইসলাম বলেন, শফিকুল বড় ভাল ছেলে ছিলো। সংসারের হাল ফেরাতে যেয়ে সে এভাবেই হারিয়ে যাবে তা বুঝতে পারিনি।

ভালুকা চাঁদপুর ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোবাশ্বেরুল হক জ্যোতি জানান, মেধাবী মৌ এর পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য কলেজের পক্ষ থেকে সার্বিক সহায়তা করা হবে।

নাহিদুল ইসলামের মা নূরনাহার বলেন, নাহিদ শফিকুলের সাথে একই সময়ে লেবাননে যায়। দু’ভাইয়ের বড় নাহিদ (২০)। তাঁর ছোট ভাইয়ের নাম নাফিজ (১২)। আশাশুনির দরগাহপুর কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে একাদশ শ্রেণীতে পড়াশুনা করাকালিন সে গত ২১ ফেব্রুয়ারি শফিকুল ইসলামের সাথে লেবাননে যায়। সে লেবাননে একই কাজ করতো। ছেলের টাকা পরিশোধ করতে নিজে ঢাকার আশুলিয়াতে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে কাজ করছেন। মঙ্গলবার বাড়ি ফিরে ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়েছেন। নাহিদ ও শফিকুলের মরদেহ নাখতিয়ের নাবিহো বেরোবী হাসপাতালে রয়েছে মর্মে জানতে পেরেছেন।

নাহিদের ফুফু রোজিনা খাতুন জানান, নাহিদের বিদেশে যাওয়ার সময় জাগরণীচক্র সমিতি থেকে এক লাখ টাকা ঋণ, ও এক লাখ টাকার সোনার গহনা বন্ধকসহ স্থানীয়ভাবে ৫ লক্ষ টাকা ঋণ করে। সে বিদেশে গিয়ে গত ৯ মে মাত্র এক মাসের বেতন বাবদ ৪০ হাজার টাকা পাঠিয়েছে।

নাহিদের সহপাঠী আফছানা ইয়াসমনি অর্ণি জানায়, নাহিদ তার ভাল বন্ধু ছিল। সে তাকে খুব ভালবাসতো। তাকে হারিয়ে জীবনে অনেক ক্ষতি হয়ে গেল। এ সময় নাহিদের বাড়িতে ছুঁটে আসে তার সহপাঠী জনি, সামিউল্লাহ, সৌরভ মণ্ডল, কল্লোল শীল, আফসানা ইয়াসমিন ফারিয়া।

নাহিদের চাচা জাহিদুল ইসলাম বলেন, নাহিদের মৃত্যু তারা মেনে নিতে পারছেন না।

নাহিদের দাদী বৃদ্ধা ফিরোজা খাতুন বলেন, নাহিদের মত ভাল ছেলে এই তল্লাটে খুঁজে পাওয়া যাবে না। ওর মুত্যুর খবরে এলাকায় পিন পতন নীরবতা দেখা যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিষ্ণুপদ পাল জানান, বিষয়টি সরেজমিনে খোঁজখবর নিতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদ্বয়কে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন পেলে প্রবাসি কল্যাণ মন্ত্রণালয়ৈর মাধ্যমে তাঁদের মরদেহ আনার বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

(আরকে/এসপি/মে ১২, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

১২ মে ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test