E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

সাতক্ষীরায় চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে জবাই করে হত্যা করেছে স্বামী 

২০২৬ মে ১৭ ১৭:৩৯:১৫
সাতক্ষীরায় চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে জবাই করে হত্যা করেছে স্বামী 

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : পারিবারিক কলহের জেরে তাসলিমা খাতুন নামের চার মাসের এক অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূকে জবাই করে হত্যা করেছে তার স্বামী সাদ্দাম হোসেন। শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১১ টার দিকে সাতক্ষীরা সীমান্তের লক্ষীদাঁড়ি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত তাসলিমা খাতুন (৩৫) সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভোমরা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী লক্ষীদাঁড়ি গ্রামের সাদ্দাম হোসেনের স্ত্রী ও দেবহাটা উপজেলার উত্তর বহেরা গ্রামের নূুরুজ্জামান ঢালীর মেয়ে।

দেবহাটা উপজেলার কুলিয়া ইউনিয়নের উত্তর বহেরা গ্রামের সজল ইসলাম জানান, তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তাসলিমা সকলের বড়। ১৬ বছর আগে তাসলিমার সাথে সদর উপজেলার লক্ষীদাঁড়ি গ্রামের লুৎফর রহমানের ছেলে সাদ্দাম হোসেনের সাথে বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের পর সাদ্দাম ভোমরা বন্দরের জাহাঙ্গীর মার্কেটে প্রথমে চায়ের দোকান পরিচালনা করতো। পরে কাপড়ের ব্যবসা পরিচালনা করতে যেয়ে প্রথম বছরেই পাঁচ লাখ টাকা ঋণগ্রস্ত হলে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ছাদ্দাম তার স্ত্রী তাসলিমাকে বিভিন্ন সময়ে বাপের বাড়ি থেকে টাকা আনতে বলতো। অভাবের সংসার হলেও বাবা নুরুজ্জামান ঢালী সাদ্দামের চাহিদা অনুযায়ি টাকা দেওয়ার চেষ্টা করতেন। চাহিদা অনুযায়ী বাপের বাড়ি থেকে টাকা আনতে না পারায় তাসলিমাকে দুই সন্তানের উপস্থিতিতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। এ নিয়ে শালিসি বৈঠক হয় কয়েকবার। তাসলিমাকে তার দুই সন্তানসহ বাপের বাড়িতে আনা হলে সাদ্দাম এসে তাসলিমাকে বুঝিয়ে বাড়িতে নিয়ে যেতো। এক মাস আগে বিদেশ যাওয়ার জন্য তামলিমাকে বাপের বাড়িতে দুই লাখ টাকা আনতে বলে। দেওয়া হয় এক লাখ টাকা। দালাল সে টাকা আত্মসাৎ করে। এরপর থেকে সাদ্দাম তার স্ত্রী তাসলিমার উপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। শনিবার দিবাগত রাত একটার দিকে সাদ্দামের মা ফাতেমা খাতুন মুঠোফোনে তাসলিমাকে জবাই করে সাদ্দাম হত্যা করেছে মর্মে তাকে অবহিত করে।

লক্ষীদাঁড়ি গ্রামের ফাতেমা খাতুন জানান, ২০০০ সালে যশোর জেলার শার্শা উপজেলার কাগজপুকুর গ্রামের শ্বশুর বাড়ি থেকে তিনি স্বপরিবারে বাপের বাড়ি সাতক্ষীরা সীমান্তের লক্ষীদাঁড়ি গ্রামে মোহাম্মদ গাজীর বাড়িতে চলে আসেন। ছেলে সাদ্দাম বর্তমানে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করে। প্রথম স্বামী লুৎফর রহমান মানসিক রোগাক্রান্ত হওয়ায় তিনি ভোমরা গ্রামের আব্দুর রশিদকে বিয়ে করেন। প্রথম পক্ষের চোট ছেলে সাঈউদ্দিন মানসিক বিকারগ্রস্ত। সাদ্দামের মেয়ে সাদিয়া ভোমরা রাশিদা কে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণীতে ও ছেলে রোহান ভোমরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যারয়ের তৃতীয় শ্রেণীতে পড়াশুনা করে। ব্যবসায়ে লোকসান খাওয়া সাদ্দাম সম্প্রতি ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণসহ এলাকায় কয়েকজনের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে স্ত্রী তাসলিমার সাথে খারাপ আচরণ করতো। মারপিট করতো। মোবাইলে অনলাইন জুয়া খেলতো সাদ্দাম। স্ত্রীর সঙ্গে অন্যের পরকীয়া আছে মর্মে তাকে মারধর করতো। ঋণ করে চারটি সিসি ক্যামেরা বাড়ি[তে লাগায় সাদ্দাম। কয়েকদিন আগে ব্যাংকের বিস্তির টাকা পরিশোধ না করায় বাড়িতে নোটিশ আসে।

ফাতেমা খাতুন আরো জানান, শনিবার দুপুর ১২টার দিকে সাদ্দাম তার স্ত্রীকে দুই সন্তান নিয়ে বাপের বাড়ি যেত বলে। তাসলিমা রাজী হয়নি। একপর্যায়ে তিনি তাসলিমাকে সান্ত¡না দেন। রাত ৯টার দিকে রান্না ঘরের সঙ্গে থাকা একটি চৌকিতে স্ত্রী তাসলিমা, মেয়ে সাদিয়া ও ছেলে রোহানকে ঘুমোতে যেতে বলে। আনুমানিক রাত ১০টার পর তাসলিমাকে ডেকে নিয়ে দুই সন্তানসহ রান্না ঘরের বেড়ায় তালা লাগিয়ে দেয় সাদ্দাম। বারান্দার ক্লোবাসসিগ্যাল ফটকে তালা লাগিয়ে ও ঘরের দরজা দিয়ে তাসলিমা মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে ক্ষুর দিয়ে জবাই করে হত্যা করে। পরে স্ত্রীর তলপেটে ক্ষুর দিয়ে রক্তাক্ত জখম করে পালিয়ে যায়। সাদ্দাম তাসলিমাকে ডেকে নিয়ে যাওয়ার পর পুতনি সাদিয়া তাকে ডাকলেও তিনি ঘুমিয়ে পড়ায় শুনতে পাননি। পরে স্থানীয়দের ডেকে তিনি জানালা দিয়ে তাসলিমার গলাকাটা লাশ দেখতে পান। এ সময় সাদ্দাম দরজা খুলে সীমান্ত বেড়িবাঁধের দিকে চলে যায়। বিজিবি ও পুলিশের সহায়তায় তাসলিমার লাশ উদ্ধার করা হয়। রান্নাঘরের বেড়া ভেঙে সাদিয়া ও রোহানকে উদ্ধার করা হয়। তাসলিমাকে একটা ভালো মেয়ে বলে বর্ণনা দেন তিনি।

সাদিয়া খাতুন জানান, তার বাবা সাদ্দাম হোসেন মা তাসলিমাকে কারণে অকারণে মারধর করতো। শনিবার রাত ১০টার দিকে বাবা যখন মাকে তাদের কাছ থেকে ডেকে নিয়ে যান তারপর থেকে সে দুশ্চিন্তায় ছিলো। রান্না ঘরের বাইরে থেকে বেড়ায় তালা দিয়ে যাওয়ায় দাদীকে চিৎকার করে ডাকলেও শুনতে পাননি তিনি। একপর্যায়ে মাকে মেঝেতে ফেলে মাথায় হাতুড়িপেটা করে গলায় ক্ষুর দিয়ে জবাই করে বাবা।

একইভাবে রোহান বলেন, তার মাকে যেভাবে খুন করা হলো তাতে তার কথা বলার মত ক্ষমতা হারিয়ে গেছে। বাবাকে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে রোহান। তাসলিমার মা ফাতেমা খাতুন খুনী জামাতা সাদ্দামের ফাঁসি দাবি করেন।

ভোমরা ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সন্তোষ ঘোষ ও সংরক্ষিত সাবেক নারী সদস্য থাদেজা খাতুন বলেন, এটা সাদ্দামের পরিকল্পিত হত্যা। তারাসহ স্থানীয়রা তাসলিমাকে একজন ভাল মানুষ বলে উল্লেখ করেন।

সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক ডাঃ রাহুল সাহা বলেন, ময়না তদন্তে তাসলিমাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই ও কপালের উপরে ভারী জিনিস দিয়ে আঘাতের কারণে মৃত্যু হয়েছে বলে মনে করেন।

সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ আমিনুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে পারিবারিক কলহের জের ধরে দুই সন্তানের জননী ও চার মাসের অন্তঃস্বত্বা তাসলিমাকে জবাই করে হত্যা করেছে তার স্বামী সাদ্দাম। লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের বাবা নুরুজ্জামান ঢালী বাদি হয়ে রবিবার সাদ্দাম এর নাম উল্লেখ করে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। সাদ্দামকে গ্রেপ্তারে চিরুন্নী তল্লাশী করা হচ্ছে।

(আরকে/এসপি/মে ১৭, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

১৭ মে ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test