E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ফের সক্রিয় চরমপন্থীরা

২০২৬ মে ১৯ ১৭:১৬:৪১
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ফের সক্রিয় চরমপন্থীরা

বিশেষ প্রতিনিধি : দীর্ঘদিন ধরে নিস্তব্ধ থাকার পর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে আবারও তৎপর হয়ে উঠছে নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থী সংগঠনগুলো। বিশেষ করে যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া ও মাগুরা জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় তাদের পুনরুত্থাণের নানা ইঙ্গিত মিলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা সত্ত্বেও স্থানীয়দের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ ও আতঙ্ক। সম্প্রতি এক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, গত কয়েক মাসে ধরে যশোরের মনিরামপুর ও চৌগাছা, কুষ্টিয়ার সদর ও মিরপুর, ঝিনাইদহের শৈলকুপা ও হরিণাকুণ্ডু, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা এবং মাগুরারার শ্রীপুর উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলে গোপন বৈঠক, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে চরমপন্থীরা। রাতের আঁধারে মোটরসাইকেলে অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা, চরমপন্থী সংগঠনের পোস্টার ও লিফলেট বিতরণ এসব ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৯ সালে সশস্ত্র চরমপন্থী দলগুলোকে নিঃশেষ করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করে। ওই বছরের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, খুলনা, যশোর, মাগুরা ও ঝিনাইদহ জেলার ২২ জন বাহিনী প্রধানসহ ২ হাজার ৫৯৪ জন চরমপন্থী নামমাত্র দেশীয় পিস্তল, কাটা বন্দুক, পাইপগান জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। সে সময় পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ ২২ নেতা ও সর্বহারা পার্টির ১৩ নেতা আত্মসর্মপণ না করে আত্মগোপন করে এলাকা ছেড়ে চলে যায়। তখন চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালাতে থাকে। তবে সে সময়ও কিছুতেই থামেনি চরমপন্থীরা। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আবারো ক্ষমতায় আসার পর ক্রসফায়ারে মেতে উঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জনযুদ্ধের আব্দুর রশিদ মালিথা তপন, খুলনার মৃণাল, বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির (হক গ্রুপ) দেবু ওরফে গোল্ডেন শিহাব, কুষ্টিয়ার শাহিন-মুকুল বাহিনীর শাহিন, একদিল, ইত্তেহাদ, কোটচাঁদপুরের ডাক্তার টুটুল, পূর্ববাংলার মাফখারুল ইসলামসহ শত শত চরমপন্থী সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্রসফায়ারে মারা যেতে থাকে।

গণমুক্তি ফৌজ নামে প্রকাশ্যে একটি দল গঠন করেন বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মীর ইলিয়াস হোসেন দিলিপ। ঝিনাইদহ শহরের পাগলা কানাই মোড়ে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন দিলিপ ও তাঁর সহযোগী আলফাজ উদ্দিন। সে সময় থেকেই অস্ত্রধারী চরমপন্থী সদস্যরা প্রকাশ্যে স্থানীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে তাদের প্রাণ রক্ষার চেষ্টা করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরাকার পতনের পর লুকিয়ে থাকা ওই সব সশস্ত্র চরমপন্থীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। থানা লুট করা অস্ত্রসহ বিভিন্ন ভাবে তারা নিজেদের আধুনিক সাজ-সজ্জায় সজ্জিত করতে থাকে। চলমান পরিস্থিতিতে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দূর্বলতার সুযোগে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা ও যশোর এলাকায় তৎপর হয়ে ওঠে সশস্ত্র চরমপন্থী গ্রুপগুলো।

সূত্র জানায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে লাল পতাকা বাহিনী, পুরানো সর্বহারা গ্রুপ ও জনযুদ্ধ নামের কয়েকটি নিষিদ্ধ চরমপন্থী সংগঠনের সদস্যরা তাদের আগের নেটওয়ার্ক পুনরুজ্জীবিত করতে বেশ তৎপর হয়ে উঠেছে। স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি করেছেন তাঁরা। তাদের লক্ষ্য প্রভাব বিস্তার করে সশস্ত্র উপস্থিতির মাধ্যমে রাজনৈতিক মাঠ নিয়ন্ত্রণ করা। নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জন্য চরমপন্থী গোষ্ঠীর সহায়তা নিচ্ছেন অনেক রাজনৈতিক নেতা।

এদিকে, নিজেদের আধিপত্য জানান দিতে কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিনিয়ত মহড়া দিচ্ছে চরমপন্থী সদস্যরা। এছাড়াও অর্থ যোগানের জন্য বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করছে তাঁরা। সম্প্রতি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর ও চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিয়েছে নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থীরা। এছাড়াও কুষ্টিয়ার হরিপুরে পদ্মা নদীতে বালুরঘাট দখলে নিতে নৌপুলিশের ওপর গুলিবর্ষণের মত সহিংস ঘটনা ঘটিয়েছে। এ ঘটনায় তিন নৌপুলিশ ও একজন মাঝি আহত হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যশোরের চৌগাছার এক মাছ ব্যবসায়ী বলেন, ‘মাসের প্রথম সপ্তাহে তাদের নিকট দাবিকৃত টাকা দিয়ে আসতে হয়। টাকা দিতে দেরি হওয়ায় আমার মাছের ঘের এর আগে ভাঙচুর পর্যন্ত করেছে চরমপন্থীরা। তাই কাছে টাকা না থাকলেও ধার-দেনা করে যথাসময়ে টাকা পৌঁছে দিয়ে আছি।’

ঝিনাইদহের শৈলকুপার যগনী গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, ‘কয়েকদিন আগে মাঠ থেকে পেঁয়াজ তুলেছি। এজন্য আমার কাছে চিঠি দিয়ে বাহিনীর লোক দেড়লাখ টাকা চাঁদা চেয়েছে। আমি ভয়ে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে আসছি। এখন আবার বাকি টাকার জন্য চাপ দিচ্ছে। তাঁরা বলেছে, থানা-পুলিশকে জানালে একবারে মেরে ফেলবো। আমি পরিবার নিয়ে শঙ্কার মধ্যে রয়েছি।’

অপরাধ বিশ্লেষক লিয়াকত হোসেন বলেন, ‘শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে চরমপন্থীদের নির্মূল সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে না পারলে এদের পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়।’

এ ব্যাপারে খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি তোফায়েল আহম্মেদ বলেন, ‘চরমপন্থীদের পুনরুত্থাণ ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। তাদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। চরমপন্থীদের যেকেনো ধরণের অপতৎপরতা কঠোর ভাবে দমন করা হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সম্প্রতি বেশ কয়েকজন চরমপন্থী সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

(একে/এসপি/মে ১৯, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

১৯ মে ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test