E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

স্কুল প্রতিষ্ঠায় জমি দান, অব্যবহৃত দেড় একর জমি ফেরত চান দত্ত পরিবার

২০২৬ আগস্ট ২৪ ১৮:১৩:৫২
স্কুল প্রতিষ্ঠায় জমি দান, অব্যবহৃত দেড় একর জমি ফেরত চান দত্ত পরিবার

সালথা প্রতিনিধি : ফরিদপুরের সালথায় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য জমি দান করেছিল একটি দত্ত পরিবার। তবে বিদ্যালয়ের নামে রেকর্ড হওয়া জমির একটি বড় অংশ বর্তমানে বিদ্যালয়ের কাজে ব্যবহার হচ্ছে না বলে দাবি করেছেন জমিদাতা পরিবারের উত্তরসূরি সনজিত কুমার দত্ত। তাঁর অভিযোগ, বিদ্যালয়ের প্রয়োজনের বাইরে থাকা এসব জমির কিছু অংশ স্থানীয় ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখল করছেন। আদালতের রায় ও ডিক্রি নিজেদের পক্ষে পাওয়ার পর অব্যবহৃত ১ দশমিক ৫০ একর জমি নিজেদের নামে নামজারি করে দখল ফিরে পেতে উপজেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছেন তিনি।

উপজেলার ১৮ নম্বর সলিয়া মৌজার বিভিন্ন খতিয়ানের আওতাধীন বিদ্যালয়ের নামে রেকর্ড হওয়া মোট ২ দশমিক ০১ একর জমির মধ্যে বিদ্যালয়ের ভবন ও ব্যবহারযোগ্য অংশ বাদ দিয়ে ১ দশমিক ৫০ একর জমি নিজেদের নামে নামজারির আবেদন করেছেন সনজিত কুমার দত্ত। গত ৯ জুলাইয়ের আদালতের আদেশসহ রায়-ডিক্রি, আরএস-এসএ খতিয়ান ও বিএস খতিয়ানের কপি সংযুক্ত করে তিনি সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর আবেদন করেন।

দত্ত পরিবারের ভাষ্যমতে জানা যায়, সনজিত কুমার দত্তের বাবা রমেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯৬২ সালে সাড়ুকদিয়া উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য ৪০ শতাংশ জমি দান করেছিলেন। ওই জমিতেই বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ভূমি রেকর্ডের সময় তাঁদের পরিবারের মালিকানাধীন আরও জমি বিদ্যালয়ের নামে রেকর্ড হয়। এরমধ্যে বিদ্যালয়ের ভবন ও শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় জমি ব্যবহৃত হলেও বাকি জমির বড় অংশ বিদ্যালয়ের কোনো কাজে আসছে না। তাঁদের পূর্বপুরুষ উপেন্দ্রনাথ দত্ত ওরফে ‘পঞ্চায়েত বাবু’ এ এলাকার একজন প্রভাবশালী জমিদার ছিলেন। শিক্ষা, চিকিৎসা ও জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন কাজে তাঁদের পরিবারের ভূমিকা ছিল। সাড়ুকদিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ছাড়াও ভোট অফিস, কৃষি অফিস ও হাসপাতালের জন্য তাঁদের পরিবার জমি দান করেছে বলে তাঁরা দাবি করেন।

আবেদন সূত্রে জানা যায়, সালথার ১৮ নম্বর সলিয়া মৌজার আরএস ৫২, ৭৯ ও ৯১; এসএ ৫৬, ৭৪ ও ৯১ এবং বিএস ২, ৩, ৪ ও ২৫৬ নম্বর খতিয়ানের আওতাধীন মোট ২ দশমিক ০১ একর জমি নিয়ে দেওয়ানি ৮৮৩/২৬ নম্বর মামলা হয়। পরিবারের দাবি, ওই মামলায় তাঁদের পক্ষে রায় ও ডিক্রি হয়েছে।

সনজিত কুমার দত্তের আবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ৯ জুলাইয়ের ১০ নম্বর আদেশপত্রে উল্লিখিত রায়-ডিক্রির ভিত্তিতে বিদ্যালয়ের ব্যবহারের বাইরে থাকা ১ দশমিক ৫০ একর জমি তাঁদের নামে নামজারি করার আবেদন করা হয়েছে। আবেদনের সঙ্গে আদালতের রায়-ডিক্রির কপি এবং সংশ্লিষ্ট আরএস, এসএ ও বিএস খতিয়ানের নথিও দেওয়া হয়েছে।

দত্ত পরিবারের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের নামে রেকর্ড হওয়া জমির একটি অংশ বর্তমানে স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তি দখল করে দোকানপাট ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। এসব জমি থেকে বিদ্যালয়ও কোনো সুবিধা পাচ্ছে না বলে তাঁরা দাবি করেন। তাঁদের ভাষ্য, বিদ্যালয়ের জন্য দান করা জমি নিয়ে তাঁদের কোনো আপত্তি নেই; বরং বিদ্যালয়ের ভবন ও কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় জমি তাঁরা বিদ্যালয়ের স্বার্থেই রাখতে চান। তাঁদের আপত্তি মূলত বিদ্যালয়ের কাজে ব্যবহার না হওয়া জমি নিয়ে।

সনজিত কুমার দত্ত বলেন, আমার বাবা ভোট অফিসকে ১০ শতাংশ, কৃষি অফিসকে ১৫ শতাংশ এবং হাসপাতালের জন্য ৩৫ শতাংশ জমি দিয়েছেন। স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্যও ৪০ শতাংশ জমি দান করেছেন। এরপরও আমাদের পরিবারের অনেক জমি হাতছাড়া হয়ে গেছে। বিভিন্ন ব্যক্তি আমাদের জমি ভোগদখল করছেন। বিদ্যালয়ের প্রয়োজনে ভবিষ্যতে আমাদের আরও জমি প্রয়োজন হলে আমরা সেটিও দিতে প্রস্তুত। কিন্তু বিদ্যালয়ের বাইরে আমাদের যে জমিগুলো রয়েছে, সেগুলো আমাদের বুঝিয়ে দিতে হবে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে আইনি লড়াই করেছি। আদালতের রায়ও আমাদের পক্ষে এসেছে। এখন আমরা চাই, আইন অনুযায়ী আমাদের জমির দখল আমাদের বুঝিয়ে দেওয়া হোক। আমরা স্কুলের বিরুদ্ধে নই। আমাদের বাবা-দাদারা শিক্ষা বিস্তারের জন্য জমি দিয়েছেন। বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় জমি বিদ্যালয়েরই থাকবে। কিন্তু আমাদের পরিবারের মালিকানাধীন যে জমি বিদ্যালয়ের কাজে ব্যবহার হচ্ছে না, সেগুলো যদি অন্যরা দখল করে রাখে, তাহলে আমরা কেন আমাদের জমির অধিকার থেকে বঞ্চিত হব?”

তিনি এ বিষয়ে প্রশাসনের পাশাপাশি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, “আমরা চাই বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত হোক। সরকারি রেকর্ড, আদালতের রায়-ডিক্রি ও অন্যান্য কাগজপত্র যাচাই করে প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ করা হোক। আমরা কোনো অন্যায় সুবিধা চাই না, শুধু আমাদের ন্যায্য অধিকার চাই।

স্থানীয় বাসিন্দা নাসির উদ্দিন বলেন, দত্ত পরিবার স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য জমি দিয়েছিল বলে আমরা জানি। কিন্তু স্কুলের ব্যবহারের বাইরে থাকা জমি যদি তাঁদের মালিকানাধীন হয় এবং অন্যরা দখল করে থাকে, তাহলে আইন অনুযায়ী প্রকৃত মালিককে জমি বুঝিয়ে দেওয়া উচিত।

সাড়ুকদিয়া গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আশরাফ আলী বলেন, আমার জানামতে, পঞ্চায়েত বাবুর বংশধরদের এই এলাকায় অনেক জমি ছিল। তাঁরাই স্কুল প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছেন। এখন তাঁদের কোনো জমি যদি অন্যরা দখল করে থাকে, তাহলে বিষয়টি তদন্ত করে সঠিক সমাধান হওয়া দরকার।

খাগৈর গ্রামের সোহেল মোল্লা বলেন, বিদ্যালয়ের ভেতরে যে অংশ নিয়ে বিরোধ আছে, সেটি নিয়ে আইনগত যে সিদ্ধান্ত হবে, সেটিই মেনে নেওয়া উচিত। তবে বিদ্যালয়ের বাইরে দত্ত পরিবারের জমি থাকলে এবং সেটির মালিকানা কাগজপত্রে প্রমাণিত হলে তাঁরা যেন তাঁদের জমি ফেরত পান।

এদিকে সাড়ুকদিয়া উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিদ্যালয়ের সীমানা ও ব্যবহৃত জমির সুরক্ষার জন্য তারা আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জয়ন্ত কুমার বিশ্বাস বলেন, বিদ্যালয়ের ব্যবহারকৃত জমি বাদে বাইরের কিছু জায়গায় স্থানীয়রা দোকানপাট করে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করছে। এসব জায়গা থেকে বিদ্যালয় কোনো সুবিধা পাচ্ছে না। তবে যেহেতু আদালতের একটি রায় হয়েছে এবং রায়ভুক্ত জমির মধ্যে বিদ্যালয়ের ভবন রয়েছে, তাই বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে।

সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সাড়ুকদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি দবির উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, আদালতের রায়ভুক্ত জমির মধ্যে বিদ্যালয়ের ভবন রয়েছে। তাই বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আপিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে বিদ্যালয়ের সীমানার মধ্যে কোনো পক্ষ প্রবেশ করতে না পারে।

তিনি বলেন, বিদ্যালয়টি এলাকার গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। তাই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। আদালতের আপিলের বিষয়টি নিষ্পত্তির পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিদ্যালয়ের বাইরে বিভিন্ন ব্যক্তির দখলে থাকা জমি সম্পর্কে ইউএনও বলেন, সনজিত কুমার দত্ত যদি বিদ্যালয়ের জমির বাইরে বিভিন্ন ব্যক্তির দখলে থাকা জমির বিষয়ে আদালত থেকে তাঁর পক্ষে রায় পান, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দত্ত পরিবারের দাবি ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মধ্যে যে বিরোধ তৈরি হয়েছে, তার নিষ্পত্তিতে এখন আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও সরকারি নথিপত্রই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জমির মালিকানা, রেকর্ড, আদালতের রায়-ডিক্রি এবং বর্তমান দখল সবকিছু যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমেই দীর্ঘদিনের এ বিরোধের সমাধান সম্ভব বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

(এএন/এসপি/আগস্ট ২৪, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

২৪ আগস্ট ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test