E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

ফরিদপুরে দিনে দুপুরে ব্যবসায়ীর বাড়িতে ডাকাতি, ভাঙচুর, লুটপাট

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৭ ১৬:০৫:৫৬
ফরিদপুরে দিনে দুপুরে ব্যবসায়ীর বাড়িতে ডাকাতি, ভাঙচুর, লুটপাট

রিয়াজুল রিয়াজ, বিশেষ প্রতিনিধি : ফরিদপুর সদর উপজেলার কানাইপুর ইউনিয়নের কানাইপুর বাজার সংলগ্ন হোগলাকান্দি গ্রামে দিনে দুপুরে ডাকাতি, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এসময় ডাকাত দল বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর পরিবার। এ ঘটনার সাথে ফরিদপুর জেলা যুবদলের সভাপতি রাজিব হোসেন সহ জেলা য়ুবদল, জেলা ছাত্রদল, স্থানীয় কয়েকজন বিএনপিনেতা ও একজন আওয়ামী লীগ কর্মীর নাম উঠে এসেছে। আর তারা হচ্ছেন- জেলা যুবদলের সভাপতি রাজিব হোসেন, জেলা ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক মহিদুল ইসলাম স্বরন, কানাইপুর ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ সরদার বাবু, জেলা যুবদল নেতা জাহিদ হোসেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মী মোস্তাক শেখ প্রমুখ।

ওই বাড়ী ও আশেপাশে থাকা একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে উপরোক্ত সবার উপস্থিত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তবে, এ ঘটনায় নাম উঠে আসা নেতৃবৃন্দ ঘটনাটির প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তি সৌরভ মোল্লার আহবানে ঘটনাস্থলে গেলেও কোনো প্রকার ভাঙচুর ও লুটপাটের সাথে তারা জড়িত ছিলেন না বলে জানিয়েছেন তারা। সৌরভ মোল্লা ও তার লোকজন লোহা কাটার মেশিন দিয়ে হাসান বিশ্বাসের বাড়ীর গ্যারেজের গাড়ী বের করার চেষ্টা করছেন শুনে তাঁদের মধ্যে দু'জন (যুবদল নেতা রাজিব ও বিএনপি নেতা বাবু সরদার) ডৌরভদের প্রতি ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত হয়ে তখনই বের হয়ে চলে আসেন বলে জানিয়েছন তারা।

রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) দুপুর পৌনে দুইটার দিকে স্থানীয় প্রয়াত প্রভাবশালী ব্যনসায়ী হাসান বিশ্বাসের বাড়ীতে এ ঘটনা ঘটে।

এসময় ডাকাতদল হাসান বিশ্বাসের বাড়ীর দ্বিতীয় তলায় তাঁর স্ত্রীর রুমে ঢুকে আসবাবপত্র ভাঙচুর করে স্টিলের আলমারী ভেঙে নগদ আনুমনিক সাড়ে ৫ কোটি টাকা ও প্রায় ২০ ভড়ি স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেছেন হাসান বিশ্বাসের পরিবারের সদস্যবৃন্দ।

খবর পেয়ে কোতয়ালি থানার ওসির নেতৃত্বে থানা পুলিশের একটি দল, জেলায় কর্মরত একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যবৃন্দ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গেছেন।

এছাড়া এ সময় তাদের সাথে ছিলো আরও প্রায় ২০/২৫ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল। প্রথমে কালো রঙের একটি প্রাইভেটকার ও তার পিছনে ১০/১২টি মোটরসাইকেল নিয়ে ২০/২৫ জন লোক একযোগে হাসান বিশ্বাসের বাড়ীতে ঢোকার দৃশ্য ফুটে উঠেছে পাশের বাসার একটি সিসিটিভি ফুটেজে।

এ ঘটনার পর স্থানীয় জনগণ ও কানাইপুর বাজারের ব্যবসায়ীবৃন্দ একত্রিত হয়ে এঘটনার বিচার চেয়ে বিক্ষোভ মিছিল করতে দেখা গেছে । বিক্ষোভ মিছিলকালে ঘটনাস্থল প্রদর্শন করে বের হওয়ার পর ওসি মাহমুদুল হাসানসহ পুলিশের গাড়ী ঘিরে রেখে ঘটনার বিচারের দাবি জানাম স্থানীয় জনগণ ও বাজারের সর্বস্তরের ব্যবসায়ীবৃন্দ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে মর্মে প্রতিশ্রুতি দিলে বিক্ষোভকারী পুলিশের রাস্তা ছেড়ে দেন।

ডাকাতি, ভাঙচুর ও লুটপাট ঘটনার খবর পেয়ে বেলা দুইটা থেকে বিকেল সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন গিয়ে পাশের বাড়ির সিসিটিভির ফুটেজে দেখা যায়, কালো একটি প্রাইভেটকারের পিছনে একে একে ১০/১২টি মোটরসাইকেলে বাড়ির সামনে পৌছায় এবং প্রত্যেকটি মোটর সাইকেলে দুই থেকে তিন জন আরোহী ছিলো। এরপর ওই ব্যবসায়ীর দেয়াল ঘেরা বাড়ির প্রধান ফটক দিয়ে তাদের অধিকাংশকে হাসান বিশ্বাসের বাড়ীতে প্রবেশ করতে দেখা যায়।

এদিকে, ঘটনাস্থলে থেকে এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন কানাইপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ও প্রবীণ বিএনপি নেতা এহতেশাম খান, ইউনিয়ন বিএনপি'র বর্তমান সভাপতি মোতালেব শেখ, ইউনিয়ন বিএনপি'র সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর মো. ইউসুফ আলী মোল্লা, কানাইপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ আলতাফ হুসাইন, কোতয়ালি থানা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. মোস্তাক হোসেন, কোতয়ালি থানা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহবায়ক মো. সোহেল মুন্সী, ইউনিয়ন বিএনপি নেতা ও কানাইপুর বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. হাসিব মাতুব্বর, কানাইপুর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি মো. লিয়াকত মাতুব্বর, সাধারণ সম্পাদক তুষার খান সহ কানাইপুর ও কৃষ্ণ নগর ইউনিয়নের ওয়ার্ড জনপ্রতিনিধিগণ, কানাইপুর বাজারের ব্যবসায়ীবৃন্দ এবং স্থানীয় অনঢ়ানঢ় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ সহ স্থানীয় সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গ।

ঘটনাস্থল থেকে ভুক্তভোগীর পরিবার ও স্থানীয়দের থেকে জানা যায়, এ ঘটনার পিছনে হাসান বিশ্বাসের ছেলে মুকুট বিশ্বাসের বাল্যবন্ধু ও মুকুটের ব্রিক্স কোম্পানি (ইট ভাটা) দেখভালের দায়িত্নে থাকা সৌরভ মোল্লা তাদের চোখে মুল অভিযুক্ত ব্যক্তি। সম্প্রতি সৌরভের নিকট মুকুট তার ব্যবসার হিসেব চাইতে গেলে তাদের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। সেই বিরোধ থেকে সৌরভ আয়োজন করে এমন ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারেন বলে এলাকাবাসীর ধারণা।

প্রয়াত ব্যবসায়ী হাসান বিশ্বাসের ছেলে ও কেবি ব্রিক্স নামের ইটের ভাটার স্বত্বাধিকারী মুকুট বিশ্বাস অভিযোগ করে বলেন, গত তিন/চার বছর যাবৎ সৌরভ মোল্যা নামের এক যুবক আমার সব ধরণের ব্যবসা দেখা শোনার দায়িত্বে ছিলেন। গত ১৫ দিন আগে তার কাছে হিসাব চাইলে তিনি আমার সাথে তাল বাহানা ও শত্রুতা শুরু করেন। আজ (রবিবার) দুপুরে সৌরভ বেশকিছু অস্ত্রধারী লোক নিয়ে আমার বাড়িতে এসে হামলা চালিয়ে মায়ের ঘরের আলমারি ভেঙ্গে প্রায় পাঁচ কোটি টাকাসহ বিপুল পরিমান স্বর্নালংকার লুটপাট করে তারা। পরে আমার গাড়ীর গ্যারেজের তালা কেটে হুন্দাই মডেলের নতুন প্রাইভেটকার নেওয়র চেষ্টা করে। এসময় ভাঙচুরের শব্দ শুনে এলাকাবাসী এগিয়ে আসলে দ্রুত তারা চলে যায়।

হাসান বিশ্বাসের স্ত্রী (মুকুটের মা) পারভীন বেগম জানান, সকাল থেকে আমাদের বাড়ির দ্বিতীয় তলায় সংস্কারের জন্য মিস্ত্রিরা কাজ করছিলেন। দুপুরের এ ঘটনার সময় তিনি বাড়িতে গোসলে ছিলেন। হঠাৎ ৩০/৪০ জন ব্যাক্তি হুট করে আমাদের বাড়ি ঢুকে ভাঙচুর শুরু করে। আমার ছেলে মুকুটকে খোঁজার কথা বলে আমার ঘরের আলমারি ভেঙ্গে টাকা পয়সা ও স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে যায়। যেখানে আমার বিপুল পরিমান সোনার গহনা ও ছেলের কয়েক কোটি টাকা লুটে নিয়ে যায় ওই ডাকাতেরা।

রহস্যজনকভাবে এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠা জেলা যুবদলের সভাপতি রাজিব হোসেন এ বিষয়ে জানান, 'মুকুটের সাথে সৌরভ ব্যবসায়িক দন্দ ছিল। সৌরভের বন্ধু মুকুট তার প্রাইভেটকার ঐ বাড়িতে আটকিয়ে রেখেছে এমনটিই সৌরভ তাঁকে জানায় এবং ঘটনাস্থলে ডেকে নিয়ে যায়। কিন্তু সৌরভ ওই বাসায় কাজ করা মিস্ত্রি থেকে লোহা কাটার মেশিন দিয়ে গাড়ীট গ্যারেজের তালা কাঁটার বিষয়টি আমি ভালো চোখে দেখিনি। তাই আমি তখন আমি দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে চলে আসি'।

স্থানীয় কানাইপুর ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ সরদার বাবু এ ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানান, আমাকে জেলা যুবদল সভাপতি রাজিব ফোন করে বলে যে, সে কানাইপুরে আসছে। সময় থাকলে দেখা করতে অনুরোধ করে হাসান বিশ্নাসের বাড়ী সামনে যেতে বলে। আমি তখন রাজিবের সাথে দেখা করতে গেলে দেখি ওর সাথে জেলা যুবদল ও ছাত্রদলের আরও কয়েকজন নেতাকর্মী রয়েছে। মুকুটের সাথে কি কাজ আছে নলে হাসান বিশ্বাসের বাসায় নিয়ে যায়। মুকুট এ সময় বাসায় না থাকায় রাজিব সহ আমরা কয়েকজন বাসার নীচ তলায় একটা রুমে বসি। ওই বাসায় কর্মরত এক শ্রমিক মুকুটকে ফোন দিয়ে আমাকে ধরিয়ে দেয়। আমি তাকে বাসায় আসতে বলে ফোন রেখে দিয়ে বসে মুকুটের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। কিছুক্ষণ পরে শুনি সৌরভ মোল্লা তার মিস্তিদের থেকে লোহা কাটার মেশিন এনে গ্যারেজের তালা কেটে ফেলেছে এটা নিয়ে বাইরে হাউকাউ হচ্ছে। আমি বের হয়ে এসে সৌরভ মোল্লাকে গলা ধাক্কা দিয়ে ওইখান থেকে সরিয়ে দেই। আমার কাছে সৌরভদের এসন কামকাজ পছন্দ না হওয়ায় আমি তৎক্ষনাৎ ওই বাসা থেকে বের হয়ে আসি।'

মুল অভিযুক্ত মহারাজপুর গ্রামের কালাম মোল্যার ছেলে সৌরভ মোল্লার সাথে ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি সাংবাদকর্মী পরিচয় শুনে জানান, 'আমি গাড়ীতে, একটু পরে কল ব্যাক করছি' -বলেই লাইনটি কেটে দেন। পরবর্তীতে তিনি আর ফোন ব্যাক করেননি। এমনকি তার বক্তব্য নিতে একাধিক নম্বর দিয়ে ফোন করা হলেও তিনি আর ফোন ধরেননি।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে কানাইপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর মো. ইউসুফ আলী মোল্লা এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে নলেন, এলাকার একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর বাড়িতে এমন হামলা ও লুটপাটের ঘটনা দুঃখজনক। এ বিএনপি নেতা বাড়ীর আসবাবপত্র ভাঙচুর, নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার লুটের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনায় যারাই জড়িত থাকুক না কেনো, সিসি টিভির ফুটেজ দেখে প্রকৃত দোষীদেরকে খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্টদের নিকট জোর দাবি জানাচ্ছি।

এদিকে, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার পর পুলিশ সুপারের অনুমতি ছাড়া এ ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের কোনো বক্তব্য দিতে রাজি না হলেও পরবর্তীতে কোতয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হাসান এ নিষয়ে জানান, 'খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এসেছি। ফেরার পথে এ ঘটনায় বিচার চেয়ে এলাকবাসীর করা বিক্ষোভ মিছিলের কবলে পড়ে কয়েক মিনিট আটকে থাকতে হযেছে। পরে, বিক্ষোভকারীদের সাথে কথা বলে, তাদের শান্ত থাকার অনুরোধ জানালে তারা রাস্তা ছেড়ে দেন। এছাড়া, এ বিষয়ে অভিযোগ পেলে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান ওসি মাহমুদুল।

রবিবার দিবাগত রাত ১০টার দিকে এ রিপোর্ট লেখার সময় ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ দিতে থানায় অবস্থান করছিলেন বলে জানা গেছে।

এদিকে, এ ঘটনায় থানায় মামলা নিতে গড়িমসি করলে বা সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের খুঁজে বের করে যথাযত আইনি পদক্ষেপ না নিলে পরবর্তীতে বাজার ধর্মঘট ও মহাসড়ক অবরোধ সহ কঠোর আন্দোলনের হুশিয়ারী দিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী ও কানাইপুর বাজারের ব্যবসায়ী সমাজ। রবিবার বিকেলে হাসান বিশ্বাসের বাড়ির আসবাবপত্র ভাঙচুর ও লুটের ঘটনায় নিন্দা প্রকাশ এনং দোষীদের বিচারের দাবিতে স্থানীয় এলাকানাসী ও কানাইপুর বাজারের বঢ়নসায়ী সমাজের সম্মিলিত এক বিক্ষোভ মিছিল শেষে এ হুশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়।

বিক্ষোভ মিছিলটি হোগলাকান্দি বিশ্বাসের বাড়ীর সামনের মোড় থেকে শুরু হয়ে কানাইপুর বাজার প্রদক্ষিণ করে আবার ষূচনাস্থলে এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাাধ্যমে শেষ হয়।

(আরআর/এএস/সেপ্টেম্বর ০৭, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test