E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

২০ বছর ধরে বোনের সংসারে নিতাই, দুই মুঠো খাবার আর একটু মমতার আশায় কাটে দিন

২০২৬ অক্টোবর ০৭ ১৮:৪৮:০৫
২০ বছর ধরে বোনের সংসারে নিতাই, দুই মুঠো খাবার আর একটু মমতার আশায় কাটে দিন

বিশ্বজিৎ সিংহ রায়, মহম্মদপুর : কারও কাছে তিনি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষ, কারও কাছে সহজ-সরল এক অসহায় প্রাণ, কিন্তু নিতাই সিকদারের (৬০) এর উর্ধ্বে বয়স। পিতা মাতাকে হারিয়ে জীবন যেন প্রতিদিনের এক নীরব অপেক্ষার নাম। কখন খাবার জুটবে, কখন ঘুমাবেন, কোথায় বসে থাকবেন-এসবের অনেকটাই নির্ভর করে অন্যের সহযোগিতার ওপর।

মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের রাজপাট গ্রামের নিতাই সিকদার ঠিকমতো কথা বলতে পারেন না। বুদ্ধিগত সক্ষমতাও কম। তাই নিজের প্রয়োজনের কথাও সবসময় পরিষ্কার করে বোঝাতে পারেন না। কখনো রাস্তার পাশে, কখনো গাছের নিচে, বাগিচার ভিতরে চুপচাপ বসে থাকতে দেখা যায় তাকে।

খাবারের বিষয়টিও তার জীবনে ভিন্ন এক বাস্তবতা, খাবার দিলে খেয়ে নেন, আবার খাবারের কথা মনে করিয়ে না দিলে বা খেতে না দিলে অনেক সময় চুপচাপই থাকেন। ঘুমানোর সময়ও তাকে অনেকটা বুঝিয়ে বা বলে দিতে হয়।

তবে নিতাই সিকদার বাবার মৃত্যুর পর ২০ বছর ধরে বোনের বাড়িই তার আশ্রয়স্থল। মাগুরার হাজরাপুর ইউনিয়নের লাওতাড়া গ্রামের মৃত হরিপদ শিকদারের ছেলে নিতাই বর্তমানে রাজপাট গ্রামের বোন শিতু রানী প্রামাণিক ও ভগ্নিপতি শ্রীবাস কুমার প্রামাণিকের সংসারে থাকছেন।

বোন ও ভগ্নিপতি জানান, নিতাইয়ের দেখাশোনা করার মতো আর কেউ না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে তারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে সঙ্গে রেখেছেন। তার খাবার, থাকা এবং প্রয়োজনীয় দেখভালের দায়িত্বও তারা পালন করে আসছেন।

পরিবারের পক্ষ থেকে আরও জানা যায়, কোথাও নিমন্ত্রণ হলে নিতাইকে একা ছেড়ে দেওয়া সম্ভব হয় না। তাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে খাওয়াতে হয়। তার সহজ-সরল স্বভাব ও সীমিত বোধশক্তির কারণে পরিবারের সদস্যদেরই তার প্রতি বাড়তি নজর রাখতে হয়।

নিতাইয়ের এই জীবনযাপন কোনো অভিযোগের গল্প নয়; বরং এটি একজন সহজ-সরল মানুষের প্রতি পরিবারের দীর্ঘদিনের দায়িত্ববোধ ও মমতার গল্প। নিজেদের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বোন ও ভগ্নিপতি তাকে আপন করে রেখেছেন দুই দশক ধরে।

জীবনের অনেক পথ পেরিয়ে নিতাই আজও যেন সেই ছোট্ট শিশুটির মতো-নিজের প্রয়োজন নিজে গুছিয়ে বলতে পারেন না,কখন খাবেন তা নিজে ঠিক করতে পারেন না, কখন ঘুমাবেন সেটিও অনেক সময় অন্যকে বলে দিতে হয়।

তার পৃথিবী খুব ছোট, সেই পৃথিবীতে আপনজনের যত্নই তার সবচেয়ে বড় ভরসা। মানুষের জীবনে কিছু গল্প থাকে, যেগুলো বড় কোনো শব্দ চায় না। শুধু নীরবে চোখের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় মানবিকতার প্রশ্ন। নিতাই সিকদারের জীবনও তেমনই একটি গল্প।

তার প্রয়োজন হয়তো অনেক বড় কিছু নয়-একটু নিরাপদ আশ্রয়, সময়মতো খাবার, আর চারপাশের মানুষের সামান্য মমতা। আজও নিতাই কখনো গাছের নিচে, কখনো পথের পাশে বসে থাকেন। হয়তো তিনি জানেন না জীবনের হিসাব, জানেন না আগামী দিনের কথা। শুধু আপনজনের ডাকে সাড়া দেন, খাবার পেলে খান,আর কারও মমতায় কিছুক্ষণ নিশ্চিন্ত থাকেন।

একজন মানুষের জীবনে যতটুকু মানবিকতা প্রয়োজন, কখনো কখনো সেটুকুই তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশ্রয় হয়ে ওঠে।

(বিএস/এসপি/অক্টোবর ০৭, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

০৭ অক্টোবর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test