E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

কালিগঞ্জে পাওনা টাকা না দেওয়ায় দোকানের ৬০ লাখ টাকার মালামাল লুট, বাধা দেওয়ায় তিনজনকে পিটিয়ে জখম

২০২৬ অক্টোবর ১১ ১৮:২৭:৩০
কালিগঞ্জে পাওনা টাকা না দেওয়ায় দোকানের ৬০ লাখ টাকার মালামাল লুট, বাধা দেওয়ায় তিনজনকে পিটিয়ে জখম

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : খরচসহ বিকাশ এজেন্টকে পাওনা টাকা না দিয়ে টালবাহানা করায় এক ব্যবসায়ির দোকানের ৬০ লাখ টাকার মালামাল লুটপাট করার অভিযোগ উঠেছে। 

গতকাল শনিবার রাত ১১টার দিকে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার বাঁশতলা বাজারের ইমরানর মালিকানাধীন “ভিআইপি ইমরান ফ্যাশানে” এ ঘটনা ঘটে। লুটপাটে বাধা দেওয়ায় দুই মহিলাসহ তিনজনকে মারপিট করা হয়েছে। তাদেরকে কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
আহতরা হলেন, কালিগঞ্জ উপজেলার ফতেপুর গ্রামের রেজোয়ান কারিকরের ছেলে শওকত হোসেন, তার স্ত্রী ফাতেমা খাতুন ও ভাবী শাহানারা খাতুন।

বাঁশতলা বাজারের “ভিআইপি ইমরান ফ্যাশানের” স্বত্বাধিকারী ইমরান হোসেন জানান, জয়পত্রকাটি গ্রামের আব্দুস সাত্তারের কাছ থেকে মাসিক দুই হাজার টাকা ভাড়ায় ২০১৯ সাল থেকে তিনি বাঁশতলা বাজারে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। ব্যবসায়িক কারণে এক বছর আগে তিনি নীলকণ্ঠপুর গ্রামের আব্দুল হামিদ গাজীর ছেলে বিকাশ এজেন্ট আলমগীর হোসেনের কাছ থেকে প্রতি লাখে মাসিক ৪৫ হাজার টাকা দেওয়ার শর্তে দুই লাখ ৩০ হাজার টাকা নেন। মূল টাকাসহ সুদের বড় অংশ পরিশোধ করার পরও আলমগীর তার কাছে ছয় লাখ ৬৬ হাজার টাকা দাবি করে আসছিল। এ নিয়ে স্থানীয় গণ্যমাণ্য ব্যক্তি, বাজার কমিটি নিয়ে ও বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন পরিষদে বসাবসি হয়। একপর্যায়ে তিন মাস আগে সর্বশেষ শালিসি বৈঠকে তাকে তিন লাখ টাকা পরিশোধ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। প্রতি মাসে তাকে ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করার কথা থাকলেও টাকা সংগ্রহ করতে না পারায় ও হালখাতায় টাকা না ওঠায় তিনি আলমগীরের টাকা পরিশোধ করতে পারেননি। একপর্যায়ে আড়াই মাস আগে বাঁশতলা মাছের সেট থেকে তার বাবা শওকত কারিকরকে তুলে নিয়ে আটক রেখে তিনটি ১০০ টাকার নন জুডিয়িাল স্টাম্পে টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত দোকানে তালা মারা থাকবে বলে একটি চুক্তিপত্র করে সাক্ষর করিয়ে বাবাকে দিয়ে দোকানে তালা মেরে চাবি বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদকের কাছে রাখে আলমগীর।

ইমরান হোসেন আরো জানান, আড়াই মাস বন্ধ থাকা দোকানে থাকা মালামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ভেবে শনিবার বিকেলে তিনি দোকানের তালা ভেঙে দোকানে ঢোকেন। খবর পেয়ে আলমগীরের নেতৃত্বে বেশ কিছু লোকজন তার দোকানে এসে দোকানের তালা ভাঙার জবাব চায়। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে তিনি বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক রজব আলী বাবুকে অবহিত করেন। তিনি ৯৯৯ এ ফান করলে উপপরিদর্শক মল্লিক মনিরুজ্জামান এর নেতৃত্বে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। এ সময় দক্ষিণ শ্রীপুর ই্উনিয়ন বিএনপি’র সাধারণ স¤্পাদক নুরুজ্জামান পাড় ও বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোঃ মাহমুদ মোস্তফাসহ কয়েকজন তার দোকানে আসেন। পরে পুলিশ চলে যাওয়ার পর বাজারে মীমাংসার জন্য বসাবসি শুরু হয়। তাঃক্ষণিক টাকা দাবি করায় রাত সাড়ে ১০টার দিকে বাজার কমিটির লোকজনসহ অন্যান্যরা চলে যান। একপর্যায়ে রাত ১১ টার দিকে আলমগীর হোসেন, তার ভাই শাকিল হোসেন, তার বাবা হামিদ গাজী ও মুজিবর রহমানসহ ১৫/২০ জন দোকানের মধ্যে ঢুকে পড়ে।

তারা তাকে জোরপূর্বক দোকানের মধ্যে আটকে রেখে পাকিস্তানি শাড়ি. ভানতীয় বেনারসী শাড়ি. থ্রী পিচ, বোরখা, লুঙ্গি, শার্ট, প্যাণ্ট ও জুতাসহ ৬০ লাখ টাকার মালামাল লুট করে। তার দোকানে ৮০ লাখ টাকার মালামাল ছিল। লুটপাটে বাধা দেওয়ায় তার বাবা শওকত কারি কর, মা ফাতেমা খাতুন ও চাচা শাহানারা খাতুনকে পিটিয়ে জখম করে। পুলিশে খবর দিয়ে আহতদের মটর সাইকেলযোগে কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। রাত আড়াইটার দিকে উপপরিদর্শক মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন আলমগীর ও তার পাঁচ সহযোগীর বাড়ি থেকে লুটপাটকৃত মালের মধ্যে ২৩ গাইট মালামাল উদ্ধার করে দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়ন বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান পাড় এর জিম্মায় দিয়ে তার ঘরে তালা লাগিয়ে চাবি ওই বিএনপি নেতার কাছে দিয়ে যান। তার দোকানের মালামাল লুটপাটের সময় বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক বন্দকাটি গ্রামের মোঃ মাহমুদ মোস্তফা, নীলকণ্ঠপুর গ্রামের কাশেম গাজীর ছেলে মিলন, সাত্তার সরদারের ছেলে সালাম সরদার, মোকছেদ এর ছেলে মনিরুল ও মজনু, মজনুর ছেলে বারিক, আব্বাসের ছেলে ইদ্রিস, মহিদুল ও হাশেসসহ ৫০/৬০ জন তার দোকানের সামনে অবস্থান করছিলো।

জানতে চাইলে আলমগীর হোসেন জানান, সুদ নয়, তিন বছর ধরে বিকাশে পাঠানো টাকার খরচসহ ইমরানের কাছে তিনি ছয় লাখ ৬৬ হাজার টাকা পান। এ নিয়ে বাঁশতলা বাজার কমিটি কয়েকবার শালিস করেছে। বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন পরিষদে না যাওয়ায় চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম তার অনুকুলে প্রতিবেদন দিয়েছেন। শওকত হোসেনকে মাছের সেট থেকে তুলে এনে জোরপূর্বক স্টাম্পে সাক্ষর করিয়ে নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে আলমগীর বলেন, সর্বশেষ তিন লাখ টাকায় সমস্যার সমাধানের সিদ্ধান্ত হয়। প্রথম দফায় ৫০ হাজার টাকা ও পরবর্তীতে মাসে ১০ হাজার টাকা পরিশোধ সংক্রান্ত চুক্তিপত্রে সাক্ষর করে প্রথম দফায় ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত দোকান না খোলার শর্তে শওকত কারিকর নিজেই দোকানে তালা মেরে চাবি বাজার কমিটির কাছে জমা দেন। টাকা পরিশোধে বারবার টালবাহানা এমনকি হালখাতার পরও টাকা পরিশোধ না করায় তিনি ক্ষুব্ধ হন।
আলমগীর হোসেন আরো জানান, শনিবার বিকেলে ইমরান তার দোকানের তালা ভেঙে ব্যবসা শুরু করেন। খবর পেয়ে তিনি স্থানীয়দের কয়েকজনকে নিয়ে ইমরানের কাছে টাকা চান।

এক পর্যায়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ এসে সমস্যার সমাধান না করতে পেরে চলে যান। এরপরও বাজারে আলোচনার মাধ্যমে সামাধান না হওয়ায় সাড়ে ১০টার দিকে সকলে চলে যান। রাত ১১টার দিকে টাকার পরিবর্তে ইমরান নিজেই জিনিপত্র গুনে তাদের (আলমগীর) লোকজনকে বুঝিয়ে দেন। এ সময় কোন মারপিটের ঘটনা ঘটেনি। রাত আড়াইটার দিকে পুলিশ তার বাড়িতে রাখা আট থেকে ১০ লাখ টাকার ওইসব মালামাল নিয়ে দোকানে তালা মেরে বিএনপি নেতা নুরুজ্জামান পাড় এর জিম্মায় রেখে যায়। বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মীমাংসার কথা থাকলেও ইমরান একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের নেতাদের পরামর্শে তার ও তার লোকজনদের বিরুদ্ধে থানায় মিথ্যা মামলা করে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে। এতে প্রতারকদের হাত আরো বেশি শক্তিশালী হবে।

প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন ব্যবসায়ি জানান, ইমরান একজন অনলাইন জুয়াড়ি। জুয়া খেলে সে অনেক টাকা ঋণী। শালিসী সিদ্ধান্তে আলমগীর পাবেন তিন লাখ টাকা, আর লুট করলেন ৬০ লাখ টাকার মালামাল। এটা মগের মুল্লুক পাওয়ার মত অবস্থা। মনে হয় যেন দেশে কোন আইন কানুন নেই।
বাঁশতলা বাজার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রজব আলী বাবু জানান, আলমগীর অনেক টাকা পাবে ইমরানের কাছে। এ নিয়ে তারা শালিস করেছেন কয়েকবার। সমস্যার সমাধান হয়নি। শনিবার সন্ধ্যায় তিনি মালামাল কিনে যশোর থেকে বাড়িতে ফেরেন। ইমরানের দোকানে হামলা হতে পারে এমন খবর পেয়ে তিনি ৯৯৯ এ পুলিশকে অবহিত করেন। এরপর তিনি বাসায় এসে শুয়ে পড়েন। রবিবার সকালে তিনি খবর পান যে ইমরানের দোকান থেকে মালামাল নিয়ে গেছে আলমগীর।

জানতে চাইলে বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক মোঃ মাহমুদ মোস্তফা জানান, নগদ তিন লাখ ৩৫ হাজার টাকা ও বিকাশে টাকা পাঠানো খরচ বাবদ আলমগীর ছয় লাখ ৬৬ হাজার টাকা ইমরানের কাছে পাবে। এ নিয়ে কয়েকবার শালিস হয়েছে। টাকা না দিয়ে তালা ভেঙে দোকান খোলার পর তিনিও ঘটনাস্থলে হাজির হয়েছিলেন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে তিনি ও স্থানীয় লোকজন চলে যাওয়ার পর আলমগীর লোকজন নিয়ে ইমরানের দোকান থেকে মালামাল নিয়ে এসেছে। এটা সে ভাল করেনি।

বিষ্ণুপুর ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম জানান, তার পরিষদে আলমগীরের অভিযোগের ভিত্তিতে শালিস বসে। দুই বার ইমরান এসে তৃতীয়বার সময় নিয়ে আর আসেনি। ফলে তিনি বাস্তবতার আলোকে আলমগীরের পাওনা টাকার আলোকে প্রতিবেদন দিয়েছিলেন।

দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়ন বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান পাড় জানান, আলমগীরের পাওনা টাকা নিয়ে কয়েকবার শালিস হওয়ার পর টাকা না পাওয়ায় শনিবার রাতে ইমরানের দোকান থেকে মালামাল নিয়ে গেছে আলমগীর। পরে পুলিশ এসে রাত আড়াইটার দিকে ওই ২৩ গাইট মাল উদ্ধার করে ও দোকানে তালা লাগিয়ে মালামাল ও চাবি তার জিম্মায় দিয়ে গেছে। চাবি তিনি রবিবার সকালে বাঁশতলা বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদকের কাছে দিয়েছেন।

কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ শাহীন রহমান জানান, ইমরানের লুটপাটকৃত মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

(আরকে/এসপি/অক্টোবর ১১, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

১১ অক্টোবর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test