E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

পরিবার বলছে মানসিক রোগী

সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গণপিটুনিতে নিহত শামীম

২০২৬ অক্টোবর ১৪ ১৮:৫৬:৩০
সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গণপিটুনিতে নিহত শামীম

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : আল্লাহ্ রাসূল সাঃ ও ইসলাম ধর্মকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগে সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া ইউনিয়নের বড় শান্তা গ্রামে ওয়াহিদুজ্জামান সানা ওরফে শামীম(৩৮) নামের এক ব্যক্তির বাড়ি ভাংচুর করে তিন দফায় গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করেছে তৌহিদী জনতা। সোমবার সন্ধ্যায়, মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সন্ধ্যার পূর্বে দ্বিতীয় দফা ও রাত ১০ টার দিকে তৃতীয় গণপিটুনির ঘটনা ঘটে। সখীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ওয়াহেদুজ্জামান সানা ওরফে শামীমকে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১২ টার দিকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। নিহত ওয়াহিদুজ্জামান সানা ওরফে শামীম এর বাবার নাম মৃত শামছুর রহমান সানা।

নিহতের বড় ভাই আব্দুল জলিল জানান, সোমবার সন্ধ্যায় স্ত্রীর সাথে বচসায় জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন ধরণের গালিগালাজ করে তার মানসিক রোগাক্রান্ত ভাই ওয়াহিদুজ্জামান। এ সময় স্থানীয়বএকজন অডিও রেকডিং করে সামাজিক যোগাযোগ মাধযমে ছড়িয়ে দেয়। ওই অডিওতে মহানবীকে কটুক্তি সংক্রান্ত কথা আছে দাবি করে দেবহাটার হুজুর ফজলুল হক আমিনী ধর্মীয় ভাই ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে ফেসবুকে লাইভ করে সোমবার সন্ধ্যায় জনতাকে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান। এর কিছুক্ষণ পর ক্ষুব্ধ কয়েকশত জনতা ওয়াহিদুজ্জামান এর বাড়ির ক্লোবসিগ্যল ফটক ভাংচুর করে ও তাকে ঘর থেকে মারতে মারতে সুবর্ণাবাদ বাজারের জামায়ত অফিসের সামনে নিয়ে যায়। পরে সে মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় বাড়িতে এসে বিষপান করে। রাতে তাকে কুলিয়া এলাকায় গ্রাম্য চিকিৎসক এম এ সবুরের চেম্বারে নিয়ে ওয়াশ করানোর পর সুস্থ হয়ে ওঠে।

মঙ্গলবার রাত সাড়ে আটটার দিকে সবুরের চেম্বারের সামনে ফজলুল হক আমিনীসহ জড়ো হন বিক্ষুব্ধরা। ফজলুল হক তাকে চিকিৎসা না দেওয়া বা পুলিশের হাতে না দেওয়ার ঘোষণা দেয়। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকা শামীমকে বের করে গণপিটুনি দেয় তারা। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সখীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। রাত সাড়ে ১০ টার দিকে ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে এক হাজারের বেশি উগ্র মৌলবাদী তৌহিদী জনতার ব্যানার নিয়ে পারুলিয়া বাসস্টাণ্ড থেকে সখীপুর হাসপাতালে যেয়ে চিকিৎসাধীন ওয়াহেদুজ্জামানকে দেয়ালে আছাড় মারে। বাইরে এনে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে মৃত ভেবে ফেলে রেখে চলে যায় পরে পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে রাত সাড়ে ১২ টার দিকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দীপঙ্কর মণ্ডল তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। মব সৃষ্টির মাধ্যমে আইন হাতে তুলে নিয়ে ভাইকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন আব্দুল জলিল।

ঘটনার বিষয়ে ফজলুল হক আমিনী বলেন, আল্লাহ্ রাসুল ও আমাদের ইসলাম ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য দীর্ঘ ৬ মাস ধরে করে আসছিল ওয়াহিদুজ্জামান। প্রতিবেশী বা তার সঙ্গে কেউ কথা বললে ইসলাম বিদ্বেষী কথাবার্তা বলতো। আজ তৌহিদী জনতা গণপিটুনি দিয়ে তাকে পৃথিবী থেকে বিদায় করে দিয়েছে।

নিহতের ছোট ভাই জেলা রেফারী এ্যসোসিয়েশনের সদস্য ও সুবর্ণাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি তাহসিভ রহমান সাগর জানান, তারা পাঁচ ভাই, শামীম চতুর্থ। সে মাদরাসা থেকে কামেল পাশ। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স মাস্টার্স করেছে।তার দুটো সন্তান আছে। পারিবারিক সমস্যার কারণে মানসিক রোগী হয়ে গেছে। ১০/১২ বছর ধরে সে অসুস্থ মানুষ। সে মানসিক ভারসম্যহীন হওয়ার কারণপ ডাঃ ধীরাজ মোহনের কাছে চিকিৎসা নিচ্ছে। কখনো ভালো আবার কখনো খারাপ অস্বাভাবিক আচরণ ও কথাবার্তা বলে। ঔষধপত্র খাচ্ছে। অসুস্থ অবস্থায় সে কাউকে গালি দিলে পরে ভালো হয়ে ক্ষমা চায়। সে যদি কিছু বলে থাকে তাহলে তাকে আইনে বিচার করতো, একটা মানুষকে এভাবে পিটিয়ে মেরে ফেললো? তারা কিছুই করতে পারেননি। তারা সামনে যেতে পারিনি গেলে তাদেরকেও মারপিট করতো।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার মাহমুদপুর গ্রামের মনিরুজ্জামান জানান,ওয়াহিদুজ্জামান তার বোনের দেবর। কবর খুড়তে দেবে না,জানাজা পড়তে দেবে না বলে ওরা হুমকি দিচ্ছে। সদর হাসপাতালে বিকেল ৫ টার দিকে ময়নাতদন্তের পরও লাশ দেওয়া হয়নি। দেবহাটা থানার উপপরিদর্শক আল আমিন তাকে রাতে ছাড়া লাশ না আনার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। ওরা নাকি লাশ দাফন করতে দেবে না বল মিটিং করেছে মর্মে তিনি জেনেছেন। এঘটনায় প্রশাসনের কাছে তারা নিরাপত্তা দাবী করেন।

সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক দীপঙ্কর মণ্ডল জানান,মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২ টা ৩৫ মিনিটে ওয়াহেদুজ্জামানকে জরুরী বিভাগে আনা হয়। এর আগেই তার মৃত্যু হয়।
ময়নাতদন্তকারি চিকিৎসক সদর হাসপাতালের আরাফাত হোসেন জানান,ভারী জিনিস দিয়ে আঘাতের ফলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ জনিত কারণে ওয়াহিদুজ্জামান এর মৃত্যু হয়েছে।

দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসএম শাহীন জানান, ওয়াহিদুজ্জামান এর কিছু অডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়। তা দেখে জনগন উত্তেজিত হয়ে পড়ে। তাকে কুলিয়া বাজারে আটক করে মারপিট করে। তাকে উদ্ধার করে সখীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। পুলিশ চলে যাওয়ার পর রাত ১০ টার দিকে হাসপাতাল থেকে বের করে তাকে আবারো মারপিট করা হয়।পরে তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে রাত সাড়ে ১২ টার দিকে ডাক্তার তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। বুধবার দুপুরে লাশের ময়নাতদন্তের জন্য সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

(আরকে/এসপি/অক্টোবর ১৪, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

১৪ অক্টোবর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test