E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

তিস্তায় মাছের আকাল, জেলেপল্লিতে ম্লান পূজার আনন্দ

২০২৬ অক্টোবর ১৪ ১৯:৩৯:৩৮
তিস্তায় মাছের আকাল, জেলেপল্লিতে ম্লান পূজার আনন্দ

পিএম সৈকত, কুড়িগ্রাম : কাঁধে লাঠি, এক পাশে মাছ ধরার জাল, অন্য পাশে পুরোনো হাঁড়ি। তিস্তা নদীতে মাছ ধরতে যাচ্ছেন হরেন্দ্র নাথ দাস(৫৫)। সামনে শারদীয় দুর্গাপূজা। অথচ স্ত্রী, মা, ছেলে কিংবা নিজের জন্য নতুন পোশাক কেনার সামর্থ্য নেই তাঁর। মাছ বিক্রির টাকায় সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। হয়তো পূজার বাজার করতে হবে ধারদেনা করে।

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের তৈয়বখা এলাকার মাঝিপাড়ার হরেন্দ্র নাথের মতো অনেক জেলে পরিবারের চিত্র এখন এমনই। নদীতে মাছ কমেছে, কমেছে আয়ও। একসময় সারাদিন মাছ ধরে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার মাছ বিক্রি করলেও এখন দেড় থেকে দুই কেজি মাছ বিক্রি করে আয় হয় মাত্র ২৫০–৩০০ টাকা। সংসারের খরচ মেটাতে গিয়ে চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা ও উৎসবের কেনাকাটা সবই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

হরেন্দ্র নাথ বলেন, মাছ নাই, তাই নৌকা বিক্রি করে দিয়েছি। মাছ ধরাই আমার পেশা। এটা ছাড়া আর কিছু করতেও পারি না। স্ত্রী, মা ও ছেলে কাপড় চেয়েছে, দিতে পারিনি। পূজায় মেয়ের বাড়িতেও কিছু দিতে পারব না। ধার নিয়ে বাজার করতে হবে।

উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রাজারহাটে নিবন্ধিত জেলে পরিবারের সংখ্যা ১ হাজার ৭৬৭টি। এর মধ্যে তিস্তা তীরবর্তী বিদ্যানন্দ, ঘড়িয়ালডাঙ্গা ও নাজিমখান ইউনিয়নের ৬৮৬টি পরিবার জীবিকা সংকটে রয়েছে। মাছ কমে যাওয়ায় কেউ দিনমজুরি করছেন, কেউ কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন, আবার কেউ অন্য এলাকায় গিয়ে শ্রম বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন।

বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের জেলে আব্দুল জলিল বলেন, আগে মাছ ধরেই ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা চালিয়েছি। এখন অন্যের জমিতে কাজ করতে হয়। কখনো ঢাকায় গিয়েও কাজ করি।

তৈয়বখা এলাকার জেলে সবুজ কুমার দাসের পরিবারে সদস্য ৬ জন। তাঁর অভিযোগ, গত পাঁচ বছরে সহায়তা হিসেবে ১০ কেজি চালও পাননি। নদীতে মাছ না থাকায় আয় কমেছে। অন্যদিকে অসুস্থ মেয়ের চিকিৎসায় ১৭/১৮ হাজার টাকা ঋণ করতে হয়েছে। এখন ঋণের কিস্তি ও সংসারের খরচ সামলাতে গিয়ে ছেলের পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার জন্য গাইড বইও কিনে দিতে পারছেন না।
সবুজের স্ত্রী সাধনা রানী বলেন, জেলে কার্ড করে নিয়েছি, কিন্তু কখনো কিছুই পাইনি।

জেলেদের অভিযোগ, তিস্তা নদীতে বালু-পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়া এবং চর জেগে ওঠায় মাছের বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে। ফলে মাছ ধরতে গিয়ে অনেক সময় খরচও ওঠে না।

রাজারহাট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এমদাদুল হক বলেন, নদীদূষণ, নাব্যতা হ্রাস ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মাছের প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশ কমছে। এতে মাছের উৎপাদন কমে জেলেদের জীবিকায় প্রভাব পড়ছে। তিনি জানান, উপজেলায় জেলেদের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো অনুদান দেওয়া হয়নি। সরকার থেকে বরাদ্দ এলে তাঁরা সহায়তা পাবেন। জেলেরা সমিতির মাধ্যমে সরকারের কাছে সহায়তার আবেদন করতে পারেন।

শারদীয় দুর্গাপূজা ঘিরে যখন নতুন পোশাক ও আনন্দের প্রস্তুতি চলছে, ঠিক তখন তিস্তাপাড়ের অনেক জেলে পরিবারের দুশ্চিন্তা প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করা নিয়ে। তাঁদের দাবি, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও মাছের প্রজনন পরিবেশ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থান এবং প্রকৃত জেলেদের জন্য কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

তিস্তায় মাছ কমার সঙ্গে সঙ্গে ছোট হয়ে আসছে জেলেদের স্বপ্নও। তাঁদের কাছে এবার পূজার আনন্দের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে সংসার চালানোর কঠিন হিসাব।

(পিএস/এসপি/অক্টোবর ১৪, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

১৪ অক্টোবর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test