E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

দেবহাটায় ওয়াহেদুজ্জামানকে ধর্ম অবমানানার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা

১০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ২৫০ জনের নামে থানায় মামলা, গ্রেপ্তার ২ 

২০২৬ অক্টোবর ১৬ ১৮:০৯:৫৯
১০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ২৫০ জনের নামে থানায় মামলা, গ্রেপ্তার ২ 

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া ইউনিয়নের বড় শান্ত গ্রামের শামছুদ্দিন সানার  ছেলে ওয়াহেদুজ্জামান সানা ওরফে শামীমকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মব সৃষ্টি করে হত্যার ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহতের বড় ভাই আব্দুল জলিল বাদি হয়ে মব সৃষ্টির নায়ক ফজলুল হক আমিনীসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ২৫০ এর বিরুদ্ধে বৃহষ্পতিবার রাতে মামলা (৯ নং) দায়ের করেন। পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বৃহষ্পতিবার রাতে ও শুক্রবার সকালে এজাহারভুক্ত দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া ইউনিয়নের সুবর্ণাবাদ গ্রামের গ্রামের রুহুল আমিনের ছেলে মোক্তার হোসেন(৫২) ও নাজিরের ঘের গ্রামের রহিম বক্স মোল্লার ছেলে আসাদুল মোল্লা (৪৬)।

মামলা ও ঘটনার বিবরণে জানা যায়, বড়শান্তা গ্রামের মৃত শামসুদ্দিন সানার ছেলে ওয়াহেদুজ্জামান সানা ওরফে শামীম ১০/১২ বছর ধরে মানসিক রোগে ভুগছিলেন। তিনি মহানবীকে কটুক্তি করেছেন এমন একটি অডিও সামাজিক যাগাযোগ মাধমে ছড়িয়ে পড়ায় সোমবার সন্ধ্যায় কিছু জামায়াত সমর্থিত লোকজনসহ ১০০/১৫০ জন লোক জামায়াত অফিসের সামনে থেকে বের হতে তার বাড়ির কোলাবসিগ্যল গেট ভাঙচুর করে ভিতরে ঢুকে পড়ে। এ সময় তাকে মারপিট করে। একপর্যায়ে সে বিষ পান করে। তাকে উদ্ধার করে কুলিয়া বাজারের ডাঃ এম এ সবুরের ক্লিনিকে ভর্তি রাখা হয়। মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে দক্ষিণ পারুলিয়ার রুহুল আমিনের ছেলে ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেল চালক ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে পারুলিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারী সাদিকুল ইসলামসহ শতাধিক বিক্ষুব্ধ জনতা ডাঃ সবুরের ক্লিনিক ঘেরার করে।

ক্লিনিকে ঢুকে ওয়াহেদুজ্জামনের চিকিৎসা বন্ধ করতে বলা হয় ডাঃ সবুরকে। সেখানে ওয়াহেদুজ্জামানকে মারপিট শুরু করলে আতঙ্কিত ডাঃ সবুর তাকে বাইরে নিয়ে যেতে বলেন। এরপর সাদিকুলের উপস্থিতিতে তাকে টেনে হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে জখম করা হয়। বিক্ষুব্ধ জনতাকে বলতে শোনা যায়, পুলিশের কোন ক্ষমতা নেই। তাকে মেরে পুড়িয়ে দাও। এ সময় সদেকুল বলেন, আল্লাহ এবং আল্লা রসুলের বিরুদ্ধে বললে তার বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই। এরপর পুলিশ এসে ওয়াহেদুজ্জামানকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা সখীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। রাত ১০টার দিকে ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে কয়েক’শ লোক মিছিল নিয়ে সখীপুর হাসপাতাল ঘেরাও করে। পরে তারা হাসপাতালে ঢোকার সকল প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দিয়ে ্একটি দরজা ভাংচুর করে ওয়ার্ডের মধ্যে ঢুকে পড়ে।

হামলাকারিরা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ সাইফুল ইসলাম, পুলিশ ও আনছার সদস্যদের জিম্মি করে চিকিৎসা বন্ধ করে দিয়ে ওয়াহেদুজ্জামান শামীমকে তাদের হাতে তুলে দিতে বলে। পরে তারা ওয়াহেদুজ্জামানকে ওয়ার্ডের মেঝে ও দেয়ালে আছাড় মারে। লাথি মেরে তাকে মুমুর্ষ অবস্থায় ফেলে রেখে চলে যায়। পরবর্তীতে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে ওয়াহেদুজ্জামান শামীম মারা যায়। ফজলুল হক আমিনী নিহত ওয়াহেদুজ্জামানের বিবস্ত্র ছবি নিজের ফেইসবুকে ইমো নাম্বার দেয়। ফেইসবুক লাইভে এসে ফজলুল হক বলে যে, কোন সাংবাদিক যেন তার পক্ষে নিউজ না করে। কোন মুসলিম যেন তার গোসল করানো বা জানাজায় না যায়।

ফজলুল হক আমিনী আরো বলেন, শামিমকে যদি হত্যা করতে হয় তবে আমি ফজলুল হক পিছপা হবো না। অবশ্যই তাকে দুনিয়া থেকে বিদায় করতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। এসময় বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কয়েকজন বলেন, “আমরা তাকে স্বহস্তে শাস্তি প্রদান করবো। কেই তাকে বাঁচাতে পারবে না।”

একজন ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেল চালক হলেও ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট সরকার পরিবর্তণের পর ফজলুল হক আমিনী অনেক বেশি জেহাদী হয়ে পড়ে। ২০২৫ সালের মে মাসে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ফজলুল হকের নেৃতত্বে দক্ষিণ পারুলিয়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলামের বাড়িতে ঢুকে ভাংচুর ও লুটপাট চালানো হয়। তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের গণপিটুনি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে একই অভিযোগে কুলিয়ার সোহাগ, দক্ষিণ পারুলিয়ার এক ইউপি সদস্যকে গণপিটুনি দেওয়া হয়। লুটপাট করা হয় তাদের বাড়ির মালামাল।

তবে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারী মাওলাানা আজিজুর রহমান বৃহষ্পতিবার এক ভিডিও বার্তায় বলেন যে, ওয়াহেদুজ্জামান ওরফে শামীমের হত্যার সঙ্গে তার দলের কোন নেতা, কর্মীর সম্পৃক্ততা নেই।অথচ কিছু সামাজিক ও যোগাযোগ মাধ্যমে তার দলের নেতা কর্মীদের নাম উল্লেখ করে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে দলের ভবমুর্তি নষ্ট করা হচ্ছে। তিনি ওয়াহেদুজ্জামানের হত্যার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন।

দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এইচএম শাহীন বলেন, ওয়াহেদুজ্জামানকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় তার বড় ভাই আব্দুল জলিল বাদি হয়ে বৃহষ্পতিবার রাতে থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামী করে আরো নয়জনের নাম উল্লেখ করে ও ২৫০ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামী করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মোক্তার হোসেনকে বৃহস্পতিবার রাতে তার বাড়ি থেকে ও আসাদুলকে শুক্রবার সকালে নাজিরের ঘের থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যান্য আসামীদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ চিরুনি তল্লাশি অভিযান অব্যহত রেখেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে রিমা- আবেদন জানানো হবে।

(আরকে/এসপি/অক্টোবর ১৬, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

১৬ অক্টোবর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test