E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

দেবহাটায় ওয়াহেদুজ্জামানকে ধর্ম অবমানানার অভিযোগে হত্যা

পিটিয়ে হত্যা, পুলিশের অভিযান অব্যহত, গ্রেপ্তারদের ৫ দিন করে রিমাণ্ড আবেদন

২০২৬ অক্টোবর ১৭ ১৮:২৬:২৪
পিটিয়ে হত্যা, পুলিশের অভিযান অব্যহত, গ্রেপ্তারদের ৫ দিন করে রিমাণ্ড আবেদন

রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া ইউনিয়নের বড় শান্ত গ্রামের শামছুদ্দিন সানার ছেলে ওয়াহেদুজ্জামান সানা ওরফে শামীমকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মব সৃষ্টি করে হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার এজাহারভুক্ত আটজন আসামীসহ অজ্ঞাতনামাদের গ্রেপ্তারে পুলিশ জেলা ও জেলার বাইরে চিরুনী তল্লাশী চালাচ্ছে। ভিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সংবাদ মাধ্যমে শামীমকে হত্যার আগে যে ঘোষণা দিয়েছিলেন ফজলুল হক আমিনী, পারুলিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক সাদিকুল ইসলাম ওরফে ভদু ও ৭ নং ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি কামরুল ইসলাম, তা ভাইরাল হওয়ায় তাদেও গ্রেপ্তারের দাবি শুধু সময়ের দাবি। সেখানে জামায়াত নেতাদের বিবৃতি কেউ আমলে নিচ্ছেন না।

নিহতের বড় ভাই আব্দুল জলিলের দায়েরকৃত মামলার আসামীরা হলেন, দক্ষিণ পারুলিয়া গ্রামের কারী রুহুল আমিনের ছেলে ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেল চালক ফয়জুল হক আমিনী, পারুলিয়া শেখপাড়ার শওকত আলীর ছেলে পারুলিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারী সাদিকুল ইসলাম ওরফে ভদু(২৮), বড়শান্তা গ্রামের নওয়াব আলী গাজীর ছেলে পারুলিয়া ৭ নং ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি কামরুল ইসলাম গাজী (৫০), ছোট মান্তা গ্রামের বাবর আলী মোড়লের ছেলে মোবারেক হোসেন মোড়ল(৪৫), নাজিরের ঘের গ্রামের রহিম বক্স মোল্ল্যার ছেলে আসাদুল ইসলাম মোল্লা(৪৬), সুবর্ণাবাদ গ্রামের মহাতাবউদ্দিন খানের ছেলে মোক্তার হোসেন খান (৫৩), দক্ষিণ পারুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর গ্রামের শাহীদুল ইসলামের ছেলে নাজমুল (৩০), বদরদলা- পরুলিয়া সড়কের গোপাখালি বটতলার লেদেও দোকানদার মিজানুর রহমান মিজান(৩৮), দঃ কুলিয়ার সাবেক চেয়ারম্যান ইমদাদুল হকের বাড়ির পাশের আবুল কাশেম(৩৫) ও দক্ষিণ পারুলিয়া জেলেপাড়া ফুটবল মাঠের পাশে মোঃ আজাহারুল ইসলাম(২৩)।

এদিকে গ্রেপ্তারকৃত আসাদুল ও মোক্তার হোসেন খানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা দেবহাটা থানার উপপরিদর্শকব আল আমিন শনিবার আদালতে ৫ দিন করে রিমা- আবেদন জানিয়েছেন। তবে জামায়াতের দুই নেতা হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকলেও তাদেরকে বাঁচাতে দলীয় নেতাদের দৌড়ঝাঁপ সাধারণ মানুষকে নতুন করে ভাবনায় ফেলেছে। নিহতের পরিবারের সদস্য ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ তাদেরকে গ্রেপ্তার করে রিমাণ্ড নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদেও দাবি জানিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, বড়শান্তা গ্রামের মৃত শামসুদ্দিন সানার ছেলে ওয়াহেদুজ্জামান সানা ওরফে শামীম ১০/১২ বছর ধরে মানসিক রোগে ভুগছিলেন। তিনি মহানবীকে কটুক্তি করেছেন এমন একটি অডিও সামাজিক যাগাযোগ মাধমে ছড়িয়ে পড়ায় সোমবার সন্ধ্যায় কিছু জামায়াত সমর্থিত লোকজনসহ ১০০/১৫০ জন লোক জামায়াত অফিসের সামনে থেকে বের হতে তার বাড়ির কোলাবসিগ্যল গেট ভাঙচুর করে ভিতরে ঢুকে পড়ে। এ সময় তাকে মারপিট করে। পিছনের দিক দিয়ে পালিয়ে যেয়ে সে কুলিয়া বাজারের ডাঃ এম এ সবুরের ক্লিনিকে ভর্তি রাখা হয়।

মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে দক্ষিণ পারুলিয়ার রুহুল আমিনের ছেলে ভাড়ায় চালিত মোটর স্ইাকেল চালক ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে পারুলিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারী সাদিকুল ইসলামসহ শতাধিক বিক্ষুব্ধ জনতা ডাঃ সবুরের ক্লিনিক ঘেরার করে। ক্লিনিকে ঢুকে ওয়াহেদুজ্জামনের চিকিৎসা বন্ধ করতে বলা হয় ডাঃ সবুরকে। সেখানে ওয়াহেদুজ্জামানকে মারপিট শুরু করলে আতঙ্কিত ডাঃ সবুর তাকে বাইরে নিয়ে যেতে বলেন। এরপর সাদিকুলের উপস্থিতিতে তাকে টেনে হিঁচড়ে বাইরে নিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে জখম করা হয়। বিক্ষুব্ধ জনতাকে বলতে শোনা যায়, পুলিশের কোন ক্ষমতা নেই। তাকে মেরে পুড়িয়ে দাও।

এ সময় সদেকুল বলেন, আল্লাহ এবং আল্লা রসুলের বিরুদ্ধে বললে তার বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই। এরপর পুলিশ এসে ওয়াহেদুজ্জামানকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা সখীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। রাত ১০টার দিকে ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে কয়েক’শ লোক নারায় তকবীর- আল্লাহু ’আকবর স্লোগান দিতে দিতে মিছিল নিয়ে সখীপুর হাসপাতাল ঘেরাও করে। পরে তারা হাসপাতালে ঢোকার সকল প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দিয়ে ্একটি দরজা ভাংচুর করে ওয়ার্ডের মধ্যে ঢুকে পড়ে। হামলাকারিরা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ সাইফুল ইসলাম, পুলিশ ও আনছার সদস্যদের জিম্মি করে চিকিৎসা বন্ধ করে দিয়ে ওয়াহেদুজ্জামান শামীমকে তাদের হাতে তুলে দিতে বলে। পরে তারা ওয়াহেদুজ্জামানকে ওয়ার্ডের মেঝে ও দেয়ালে আছাড় মারে। লাথি মেরে তাকে মুমুর্ষ অবস্থায় ফেলে রেখে চলে যায়।

পরবর্তীতে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে ওয়াহেদুজ্জামান শামীম মারা যায়। ফজলুল হক আমিনী নিহত ওয়াহেদুজ্জামানের বিবস্ত্র ছবি নিজের ফেইসবুকে ইমো নাম্বার দেয়। ফেইসবুক লাইভে এসে ফজলুল হক বলে যে, কোন সাংবাদিক যেন তার পক্ষে নিউজ না করে। কোন মুসলিম যেন তার গোসল করানো বা জানাজায় না যায়। ফজলুল হক আমিনী আরো বলেন, শামিমকে যদি হত্যা করতে হয় তবে আমি ফজলুল হক পিছপা হবো না। অবশ্যই তাকে দুনিয়া থেকে বিদায় করতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। এসময় বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কয়েকজন বলেন, “আমরা তাকে স্বহস্তে শাস্তি প্রদান করবো। কেই তাকে বাঁচাতে পারবে না।”

তবে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারী মাওলাানা আজিজুর রহমান বৃহষ্পতিবার এক ভিডিও বার্তায় বলেন যে, ওয়াহেদুজ্জামান ওরফে শামীমের হত্যার সঙ্গে তার দলের কোন নেতা, কর্মীর সম্পৃক্ততা নেই। অথচ কিছু সামাজিক ও যোগাযোগ মাধ্যমে তার দলের নেতা কর্মীদের নাম উল্লেখ করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দলের ভবমুর্তি নষ্ট করা হচ্ছে। তিনি ওয়াহেদুজ্জামানের হত্যার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন।

দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এইচএম শাহীন বলেন, ওয়াহেদুজ্জামানকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায়গ্রেপ্তারকৃত মোক্তার হোসেন খান ও আসাদুলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শনিবার আদতালতে পাঁচ দিন করে রিমাণ্ড আবেদন জানানো হয়েছে। পলাতক আসামীদেও গ্রেপ্তার করতে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।

(আরকে/এসপি/অক্টোবর ১৭, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

১৭ অক্টোবর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test