E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

১০ বিষয়ে ফেল, ফল জালিয়াতি করে পাস!

শিক্ষার্থীসহ শিক্ষা বোর্ডের ৩ কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা, প্রোগ্রামারদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

২০২৬ অক্টোবর ৩০ ১৭:৫৪:১২
শিক্ষার্থীসহ শিক্ষা বোর্ডের ৩ কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা, প্রোগ্রামারদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

জে.জাহেদ, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ১০ বিষয়ে অকৃতকার্য এক শিক্ষার্থীর নম্বর বাড়িয়ে পাস করানোর অভিযোগে ওই শিক্ষার্থীসহ শিক্ষা বোর্ডের কম্পিউটার সেলের তিন কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে সিএমপির পাঁচলাইশ মডেল থানায়।

মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিএমপি পাঁচলাইশ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মোজাম্মেল হক। থানা মামলা নম্বর ২৬/২৩৪। মামলাটি তদন্ত করছেন পাঁচলাইশ মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. কাউছার হামিদ।

এজাহারে অভিযোগ অনুযায়ী, শিক্ষার্থীর ১১টি বিষয়ের সৃজনশীল অংশের নম্বর বাড়িয়ে অনলাইনে প্রকাশিত ফলাফল পরিবর্তন করা হয়।

মামলার আসামিরা হলেন, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কম্পিউটার সেলের স্ক্যানিং অপারেটর ইমতিয়াজ আহমেদ চৌধুরী (২৮), স্ক্যানিং অপারেটর মো. রাশেদুল ইসলাম (৩০) এবং কম্পিউটার অপারেটর (সলভার) নূর হোসেন রায়হান (৩২)। এ ছাড়া ১৭ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে আসামি করা হয়েছে। তার পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে না। তদন্তে শনাক্তযোগ্য অন্য ব্যক্তি ও অজ্ঞাতনামা সহযোগীদেরও এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন বাদী হয়ে নগরের পাঁচলাইশ মডেল থানায় মামলাটি করেন। মামলায় দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৫, ৪৬৬, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ৪৭৭(ক) ধারা এবং পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০-এর ৫, ৬, ১২ ও ১৩ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করে ওই শিক্ষার্থী। পুনর্নিরীক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের উত্তরপত্রের নম্বরের সঙ্গে শিক্ষা বোর্ডের কম্পিউটার সেল থেকে পাওয়া প্রিন্ট আউটের নম্বরের ব্যাপক পার্থক্য দেখতে পান। বিষয়টি তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানান। পরে বোর্ডের প্রোগ্রামার যাচাই করে নম্বরের গরমিলের সত্যতা পান।

এ ঘটনায় বোর্ডের চেয়ারম্যানের নির্দেশে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি দুজন আইসিটি বিশেষজ্ঞের কারিগরি সহযোগিতায় মূল উত্তরপত্র, পরীক্ষকদের পাঠানো ম্যানুয়াল নম্বর ফর্দ, প্রকাশিত ফলাফল, এমসিকিউ ওএমআর এবং কম্পিউটার সেলের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে। গত ৯ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, তদন্তে শিক্ষার্থীর ১১টি বিষয়ের সৃজনশীল অংশের নম্বর বাড়ানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বাংলার প্রথম পত্রে ২৩ নম্বরকে ৩৩, দ্বিতীয় পত্রে ২৪ নম্বরকে ৬২, ইংরেজির প্রথম পত্রে ৩৩ নম্বরকে ৮৩ এবং দ্বিতীয় পত্রে ২০ নম্বরকে ৮২ করা হয়। গণিতে ৯ নম্বর বাড়িয়ে ৬৬, ইসলাম শিক্ষায় ৭ থেকে ৬৪, উচ্চতর গণিতে শূন্য থেকে ৪৬, পদার্থবিজ্ঞানে শূন্য থেকে ৪৫, রসায়নে ১ থেকে ৪৬, জীববিজ্ঞানে ১ থেকে ৪৬ এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়ে ৪ থেকে ৬৫ নম্বর করা হয়।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীর ইন্ধনে এবং কম্পিউটার সেলের সংশ্লিষ্ট তিন কর্মীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় পারস্পরিক যোগসাজশে এ জালিয়াতি করা হয়েছে। প্রকৃত নম্বরের পরিবর্তে বাড়ানো নম্বর বসিয়ে ফলাফলের হিসাব পরিবর্তন করা হয় এবং জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি ফলাফল অনলাইনে প্রকাশ করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

এজাহারে আরও বলা হয়েছে, ফলাফলে অসংগতি ধরা পড়ার পর শিক্ষার্থীর ফলাফল স্থগিত রাখা হয়। গত ১৫ অক্টোবর তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। ২৬ অক্টোবর শিক্ষার্থী নোটিশের জবাব দিলেও তা সন্তোষজনক না হওয়ায় বোর্ড কর্তৃপক্ষ মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রোগ্রামারদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

তবে এ ঘটনায় শিক্ষা বোর্ডের কম্পিউটার সেলের মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্য একটি শিক্ষা বোর্ডের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'প্রোগ্রামার ও সহকারী প্রোগ্রামার মূল ফলাফল প্রস্তুতের দায়িত্বে থাকেন। অথচ এ মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে, তারা দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারী। ফলে মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে শুধু দৈনিক কর্মচারীদের আসামি করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।'

ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, 'এদের (প্রোগ্রামার ও সহকারী প্রোগ্রামার) কৌশলে বাঁচানো হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। সুষ্ঠু তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। মামলার এজাহারে সৃজনশীল অংশের নম্বর পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। শিক্ষার্থী বহুনির্বাচনী (এমসিকিউ) অংশেও ফেল করেছিল কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন। অথচ এজাহারে ওই অংশের নম্বর পরিবর্তনের কোনো উল্লেখ নেই।'

তিনি খোলাসা করে আরও বলেন, 'এজাহারে যে ধরনের নম্বর পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে, তাতে প্রোগ্রামার ছাড়া অন্য কারও এ কাজ করার সুযোগ থাকার কথা নয়। কারণ, ওই প্রক্রিয়ায় রোল নম্বর থাকে না। নম্বর পরিবর্তন করতে হলে মূল ডিভাইসে প্রবেশ করতে হয়, যা কেবল প্রোগ্রামার ও সহকারী প্রোগ্রামার ব্যবহার করতে পারেন।'

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সংশ্লিষ্ট প্রোগ্রামার, সহকারী প্রোগ্রামার ও অভিযুক্ত কর্মচারীদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে মামলার বাদী ও শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মামলা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সে অনুযায়ী পাঁচলাইশ মডেল থানায় চারজনের বিরুদ্ধে এজাহার দেওয়া হয়েছে।”

ফলাফল জালিয়াতির ক্ষেত্রে সাধারণত প্রোগ্রামার, সহকারী প্রোগ্রামার কিংবা মূল ডিভাইসে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের জড়িত থাকার সম্ভাবনা থাকে। তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রোগ্রামার ও সহকারী প্রোগ্রামারকে আসামি না করে কর্মচারীদের কেন আসামি করা হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, “ফল জালিয়াতির ঘটনা জানার পর তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটি যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছে। সম্ভবত সে কারণেই তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তবে তদন্তে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে, কারা জড়িত তা জানা যাবে।”

পাঁচলাইশ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হক বলেন, 'চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড থেকে এসএসসি পরীক্ষার ফল জালিয়াতির অভিযোগে একটি মামলার এজাহার দেওয়া হয়েছে। বাদী বোর্ডের সচিব। তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

আগেও উঠেছিল ফল জালিয়াতির অভিযোগ

এর আগেও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষার ফল জালিয়াতির অভিযোগে মামলা হয়েছিল। ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফল জালিয়াতির অভিযোগে বোর্ডের তৎকালীন এক পরিচালক ও তাঁর সন্তানসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি পাঁচলাইশ থানায় মামলা হয়। ওই মামলার নম্বর ছিল ৭।

কিন্তু আগের সেই মামলাটির তদন্ত ও অভিযোগপত্র নিয়েও নানা আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। নতুন করে আবারও এসএসসি পরীক্ষার ফল জালিয়াতির অভিযোগে মামলা হওয়ায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল প্রস্তুত ও প্রকাশের প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, কম্পিউটার সেলের নিরাপত্তা এবং আগের মামলার তদন্তের অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

(জেজে/এসপি/অক্টোবর ৩০, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

৩০ অক্টোবর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test