E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

৫০৩ কোটি টাকার স্থাপনার পাশে বালু উত্তোলন, নীরব প্রশাসন!

২০২৬ নভেম্বর ০২ ১৭:১৭:৩৬
৫০৩ কোটি টাকার স্থাপনার পাশে বালু উত্তোলন, নীরব প্রশাসন!

জে.জাহেদ, চট্টগ্রাম : একদিকে কর্ণফুলী টানেলের ৫০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সার্ভিস এরিয়া, অন্যদিকে পারকি সমুদ্রসৈকত ও উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। মাঝখানে কর্ণফুলী নদী থেকে চলছে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন। সেই বালু যাচ্ছে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির নির্মাণাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি ভরাটে। উন্নয়ন প্রকল্পের এই কর্মযজ্ঞে নদী ও উপকূলের পরিবেশগত ঝুঁকি কতটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ১২ দিন ধরে পারকি সৈকতসংলগ্ন কর্ণফুলী নদী থেকে বালু তুলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি ভরাট করা হচ্ছে। এতে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ৫০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত টানেল সার্ভিস এরিয়া এবং উপকূলীয় প্রতিরক্ষা অবকাঠামো ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তবে বালু উত্তোলনের ফলে এসব স্থাপনায় বাস্তবে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা এখনো কোনো কারিগরি সমীক্ষায় নিশ্চিত করা হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, ঢাকার প্রিমিয়ার কোম্পানি নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্থানীয় বারশত ইউনিয়নের বিএনপি নেতাদের সহযোগিতায় এ কাজ পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির সুপারভাইজার মো. সাইফুল ইসলামসহ ১০ থেকে ১৫ জন কর্মী কাজের তদারকি করছেন।

গত শনিবার ও রোববার (৩১ অক্টোবর ও ১ নভেম্বর) বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, পারকি সৈকতসংলগ্ন কর্ণফুলী নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ঝাউবাগানের ভেতর দিয়ে পাইপলাইন বসিয়ে বালু নেওয়া হচ্ছে টানেল সার্ভিস এরিয়ার সামনে। সেখানে বাল্কহেডে জমা করে প্রায় এক কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে নির্মাণাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি ভরাট করা হচ্ছে।

প্রশ্ন উঠেছে, বন্দরের আউটার এলাকা থেকে বালু উত্তোলনের অনুমোদন থাকলেই কি পারকি সৈকতসংলগ্ন নদীর নির্দিষ্ট স্থান থেকেও বালু তোলা যাবে? অনুমোদন থাকলে তার সীমানা কতটুকু? উত্তোলনের পরিমাণ ও পরিবেশগত প্রভাব যাচাইয়ের দায়িত্ব কার?

স্থানীয় বাসিন্দা হাবিব, হাসান ও আজগর বলেন, ‘পারকি সৈকতসংলগ্ন নদী থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। সমুদ্র বা নদী থেকে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নীতিমালা, অনুমোদন ও কার্যাদেশ থাকতে হয়। সেখানে কোথা থেকে কতটুকু বালু তোলা যাবে, তা উল্লেখ থাকে।’

তাঁদের অভিযোগ, কাজ শুরুর দিকে এলাকাবাসী বাধা দিয়েছিলেন। পুলিশও ঘটনাস্থলে এসেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বালু উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, এত বড় প্রকল্পের জন্য বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করা হলে নদী ও উপকূলের ওপর এর প্রভাব কী হবে, তা কেউ পর্যবেক্ষণ করছে কি না।

শুধু বালু নয়, ড্রেজারের পাইপলাইন দিয়ে উঠে আসছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছও। সরেজমিনে স্থানীয়দের কয়েকজনকে পাইপলাইন দিয়ে আসা মাছ জাল ও হাত দিয়ে সংগ্রহ করতে দেখা গেছে। পরিবেশসংশ্লিষ্টদের মতে, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন নদীর তলদেশের গঠন, জলজ প্রাণীর আবাসস্থল এবং উপকূলীয় বাস্তুসংস্থানের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

উপকূল রক্ষায় পারকি ও আশপাশের এলাকায় ১৯৯৩-৯৪ ও ২০০২ সালে পর্যায়ক্রমে প্রায় ৮০ হেক্টর জায়গায় ঝাউগাছ লাগায় বন বিভাগ। পরবর্তী সময়ে এসব গাছ বড় হয়ে এলাকাটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়। স্থানীয়দের কাছে ঝাউবাগান নামে পরিচিত এই এলাকাই এখন বালু পরিবহনের পাইপলাইন স্থাপনের কারণে আলোচনায় এসেছে।

এদিকে প্রকল্প এলাকায় ঝাউগাছের পাশে স্থাপিত একটি হলুদ রঙের সাইনবোর্ডে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) এবং চায়না ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন (সিএনটিআইসি)-এর নাম ও লোগো দেখা গেছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রতিনিধির বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সাইনবোর্ডে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রিমিয়ার কোম্পানির নামও দেখা যায়নি।

বালু উত্তোলনের বৈধতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যেও রয়েছে অস্পষ্টতা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হেড কন্ট্রাক্টর মনির হোসেন দাবি করেন, বন্দরের আউটার এলাকা থেকে বালু উত্তোলনের অনুমোদন রয়েছে। তিনি বলেন, ‘বন্দর কর্তৃপক্ষের লোকজন নিজেরাই জাহাজ নিয়ে সেখানে অবস্থান করেন। কোথা থেকে বালু তোলা হচ্ছে, তা তাঁরা পর্যবেক্ষণ করছেন। বড় বড় সিসিটিভিও বসানো হয়েছে। আমাদের কোম্পানি ঢাকার প্রিমিয়ার কোম্পানি। আমাদের সঙ্গে চীনা প্রতিষ্ঠানও পাওয়ার গ্রিডের কাজে যুক্ত রয়েছে।’

তবে আনোয়ারা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবু জাফর মজুমদার বলেন, ‘পারকি সৈকতসংলগ্ন নদী থেকে বালু উত্তোলনের কোনো অনুমোদন নেই। কারা বালু উত্তোলন করছে, তা এখনো আমার নজরে আসেনি। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব। এ-সংক্রান্ত ভিডিও বা ছবি থাকলে আমাকে পাঠাতে পারেন।’

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হাইড্রোগ্রাফার (ফিল্ড) মোহাম্মদ গোলাম হোসাইন বলেন, ‘বন্দরের আউটার এলাকায় বালু উত্তোলনের জন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অনুমোদন নিয়েছে। তবে আমাদের জানা মতে, চীনা একটি প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিডের কাজ করছে। কারা বালু উত্তোলন করছে এবং কোথা থেকে নিচ্ছে, তা সরেজমিনে পরিদর্শন না করে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। শিগগিরই ওই এলাকায় গিয়ে বিষয়টি দেখব।’

অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষের এস্টেট শাখার ডেপুটি ম্যানেজার মোহাম্মদ রায়হান উদ্দিন বলেন, ‘এ ধরনের কোনো বিষয় আমার নজরে আসেনি। সম্ভবত বন্দরের হাইড্রোগ্রাফার বিভাগ থেকে অনুমোদন নিতে পারে। ওই শাখায় যোগাযোগ করেন।’

আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিনের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। একইভাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সুপারভাইজার মো. সাইফুল ইসলামও একাধিকবার ফোন করেও সাড়া দেননি।

সব মিলিয়ে বালু উত্তোলনের অনুমোদন, নির্ধারিত উত্তোলনস্থল এবং পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে স্পষ্ট তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের কথা বললেও উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা পারকি সৈকতসংলগ্ন নদী থেকে বালু উত্তোলনের অনুমোদন নেই বলে জানিয়েছেন। বন্দর কর্তৃপক্ষও সরেজমিন পরিদর্শন ছাড়া বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারছে না।

উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বালুর প্রয়োজনীয়তা থাকতেই পারে। কিন্তু সেই প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে নদী, উপকূল ও সরকারি অর্থে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ঝুঁকিতে পড়ছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। ৫০৩ কোটি টাকার টানেল সার্ভিস এরিয়ার নিরাপত্তা এবং পারকির পরিবেশ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত সরেজমিন তদন্ত, অনুমোদনপত্র যাচাই ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

(জেজে/এসপি/নভেম্বর ০২, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

০২ নভেম্বর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test