E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

দেশে বিনিয়োগ ইতিহাসে সর্বনিম্ন, এডিপি বাস্তবায়ন ১০ বছরে সবচেয়ে কম

২০২৬ জানুয়ারি ১০ ১৪:১১:০১
দেশে বিনিয়োগ ইতিহাসে সর্বনিম্ন, এডিপি বাস্তবায়ন ১০ বছরে সবচেয়ে কম

স্টাফ রিপোর্টার : দেশে এডিপি বাস্তবায়নের হার গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ ঐতিহাসিকভাবে নিচে নেমে গেছে, সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন। বিদেশি বিনিয়োগও সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি অসহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। এ অবস্থায় দেশের ব্যাংক ব্যবস্থার উন্নয়নে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কাজ নির্বাচিত সরকারকেও চালিয়ে যেতে হবে।

শনিবার (১০ জানুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালাগ (সিপিডি) আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০২৫-২৬: নির্বাচনি বাঁকে বহুমাত্রিক ঝুঁকি’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তিনি। এসময় উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, সিপিডির গবেষণা ফেলো ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রমুখ।

নির্বাচিত সরকারকে ব্যাংক খাতের সংস্কার চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, নতুন সরকারের সময়ে সংস্কার কার্যক্রম যেন থেমে না যায়। সংস্কার কাজ চালিয়ে যেতে হবে। প্রয়োজন হলে একীভূত করতে হবে। প্রয়োজন হলে কোনোটি বন্ধ করে দিতে হবে। আমানতকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে হবে। ব্যাংক খাত নিয়ে স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকতে হবে।

তিনি বলেন, দেশে অর্থনৈতিক গতি মন্থর রয়েছে। এডিপি বাস্তবায়ন গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এডিপি বাস্তবায়নের ধীরগতি চিন্তার বিষয়। বেসরকারি বা ব্যক্তিগত বিনিয়োগ ঐতিহাসিকভাবে নিচে নেমে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন। বিদেশি বিনিয়োগও সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।

রাজস্ব বাড়াতে বেশকিছু পরামর্শ দিয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, রাজস্ব বাড়াতে নতুন পথ খুঁজতে হবে। করদাতাদের উৎসাহিত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় কর ছাড় বাদ দিতে হবে। অবৈধ অর্থপাচার রোধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এলডিসির জন্য কর ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া যাবে না। প্রকল্প ব্যয়ের খরচ নজরদার রাখতে হবে।

মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে খাদ্যপণ্যের দাম কেন কমছে না? বিশ্বের সঙ্গে ফারাক রয়েছে। চালের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সম্পর্ক রয়েছে। তথ্য বলছে, চালের চাহিদার চেয়ে দেশে উৎপাদন বেশি রয়েছে। বিশ্বে চালের দাম কমলেও বাংলাদেশে কমেনি। দেশে বিক্রেতারা সবচেয়ে বেশি লাভ করছেন আলু, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, বেগুন, মাছ, মাংস- এসবে। এখানে মধ্যস্বত্বভোগী থাকে। কিন্তু চালের ক্ষেত্রে তেমন লাভ হয় না।

তিনি আরও বলেন, সুদের হার বাড়িয়ে কেবল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। বিশ্ব বাজারে চাল ও আটার দাম কমলেও বাংলাদেশে কমেনি। মজুত ব্যবস্থার কারণে এমনটি হচ্ছে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিনিয়োগ কমে যাওয়াই দেশের অর্থনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় ও প্রধান সমস্যা। কারণ বিনিয়োগ কমলে কর্মসংস্থান কমে। মানুষ বেকার হয়ে পড়ে। অর্থনীতিতে অস্বস্তি তৈরি হয়। আর দেশের জন্যে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার জায়গাটি হচ্ছে এ দেশের জনগণ। এখনো এদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী তরুণ। এটি সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার।

তিনি বলেন, অর্থনীতিতে একটা স্থিতিশীলতা থাকা সত্ত্বেও রাজস্ব ঘাটতি, উচ্চ মূল্যস্থিতি, খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, বিদেশি বিনিয়োগ, জ্বালানি সংকট এবং বৈদেশিক খাতের অনিশ্চয়তা- এসব মিলিয়ে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় একটা সমন্বিত ও সাহসী সংস্কার কর্মসূচি অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। সরকারি অর্থব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানো এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। রাজস্ব আদায় বাড়ানো, উন্নয়ন ব্যয়ের স্বচ্ছতা জোরদার ও ঘাটতি অর্থায়নে সংযত নীতি অনুসরণ করাটা হবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থীতিশীলতার একটা ভিত্তি। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে নীতি ধারাবাহিকতা ও সুশাসন নিশ্চিত করাই বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর শর্ত হবে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, মূল্যস্ফীতি এখন একটা কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। শুধু সুদের হার বাড়িয়ে এটি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এটা স্পষ্টতই এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা সংস্কার, মজুতদারি বন্ধ, পরিবহন ও সংরক্ষণ অবকামো বিনিয়োগ এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য এগুলোর ভিত্তিতে সময়মতো খাদ্য আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কৃষি এবং খাদ্যশস্য ব্যবস্থাপনায় দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং কার্যকর সংগ্রহ ও মজুতব্যবস্থা শক্তিশালী করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ছাড়া খাদ্যবাজার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে না।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংক খাত সংস্কার ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। ঋণখেলাপি কমাতে রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যাংক রেজুশন আইন বাস্তবায়ন, ব্যাংক কোম্পানি আইন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে আনতে হবে, কর ও ভ্যাট ব্যবস্থা সহজ করতে হবে। জ্বালানি খাতে বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি খাতের জন্য নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ, দেশীয় অনুসন্ধান জোরদার ও এই খাতের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে এই খাতের উন্নয়ন সম্ভব নয়। রপ্তানি বহুমুখীকরণ, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং প্রবাসী আয় ধরে রাখার কৌশল ছাড়া ভবিষ্যৎ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের সামনে অনেক সুযোগও রয়েছে, একই সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে। অর্থাৎ একটা মিশ্র অবস্থায় রয়েছি। রাজনৈতিক অঙ্গীকার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত- এই পদক্ষেপগুলো যদি প্রয়োগ করে সঠিক পথে বাংলাদেশ এগুতে পারে তাহলে আমরা সামষ্টিক অর্থনীতির যে গতিময়তাটা সেটা আবার ফিরে পাবো এবং মানুষের মাঝে আস্থা ফিরে আসবে।

সিপিডি বলছে, সিপিডি চায় আগামী নির্বাচন যাতে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হয়। নির্বাচনে যাতে অর্থের ছড়াছড়ি না থাকে। নির্বাচন যাতে সহিংসতা মুক্ত থাকে।

অর্থনীতির গতি ফেরাতে গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকার কেমন করেছে এমন প্রশ্নের উত্তরে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, উনারা খুব ভালো করেছে, কিংবা খুব খারাপ করেছে সেটা বলা যাবে না। একটা মিশ্র অবস্থায় রয়েছে। অনেক খাতে অনেক সংস্কার হয়েছে। কিন্তু এই সময়ে নতুন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছে। এসব হলে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে। বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান হবে। অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে। এজন্যই বিনিয়োগকে আমি প্রধান সমস্যা বলেছি।

(ওএস/এএস/জানুয়ারি ১০, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

১২ জানুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test