E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নে পুঁজিবাজারের কাঠামোগত রূপান্তর জরুরি

২০২৬ এপ্রিল ১৬ ১৩:২৮:২২
দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নে পুঁজিবাজারের কাঠামোগত রূপান্তর জরুরি

স্টাফ রিপোর্টার : দেশের পুঁজিবাজার এখনও ‘ফ্রন্টিয়ার মার্কেট’ অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ এই বাজার ইমার্জিং মার্কেট থেকে অনেকটি পিছিয়ে আছে।

এ কারণে স্বল্প মেয়াদি আমানত নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ দিচ্ছে ব্যাংক। এতে ব্যাংক খাতেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

এসব কারণে সংস্কারের মাধ্যমে পুঁজিবাজারের কাঠামোগত রূপান্তর ঘটাতে চেষ্টা করছে সরকার।

বুধবার (১৫ এপ্রিল) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘ব্যাংক খাতের সমন্বয়: ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

দীর্ঘমেয়াদী টেকসই ঋণ ব্যবস্থা প্রতর্বনের জন্য একটি শক্তিশালী বন্ড মার্কেট ও পুঁজিবাজার গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ওই আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সিএমএসএমই খাতের উন্নয়ন মানেই দেশের উন্নয়ন।
এখাতের সামগ্রিক অগ্রগতির জন্য ঢাক চেম্বার এবং সরকার একযোগে কাজ করতে পারে।
এসময় তিনি একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক কাঠমো তৈরির ওপর জোর দেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় ব্যাংক কোম্পানি আইনসহ আর্থিকখাতের অন্যান্য আইনের সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। শ্রমঘন শিল্প, যার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব, সেগুলোর উন্নয়নে বর্তমান সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এছাড়াও ইতোমধ্যে বন্ধ হওয়া শিল্প-কারখানাগুলো চালুর পাশাপাশি অন্যান্য শিল্পখাতে উৎপাদন বাড়ানো এবং নারী উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

উপদেষ্টা বলেন, বর্তমানে আমরা আন্তর্জাতিক সংকটের মাঝেও সব প্রতিকূলতা মোকাবিলা করছি। এর মধ্যেই আমরা সর্বজনীন ফ্যামিলি কার্ড চালু করেছি। আগে এগুলো টার্গেট গ্রুপ ভিত্তিক ছিল। আমরা এখন সবার জন্য এই সুবিধা সম্প্রসারিত করছি। এর মধ্যে থেকে যার সহায়তা দরকার সে নেবে, যার দরকার নেই সে নেবে না। এখন কৃষককে ব্যাংকে যেতে হচ্ছে না, ব্যাংক কৃষকের কাছে গিয়ে হিসাব খুলছে। সোনালী ব্যাংক চিপযুক্ত কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের সেবা দিচ্ছে। ভূমিহীন থেকে শুরু করে সব স্তরের কৃষক এই সেবার আওতায় আসছেন।

তিনি বলেন, কর ছাড় দেওয়ার ক্ষেত্রে সংসদকে কেন্দ্রবিন্দু করা হবে। আমরা চাই না আগের মতো এসআরও বা প্রজ্ঞাপনের সংস্কৃতি চালু থাকুক। জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আমরা সবকিছু পার্লামেন্টের ফিন্যান্স অ্যাক্টের মাধ্যমে করতে চাই।

রাশেদ তিতুমীর বলেন, যুদ্ধের কারণে বাড়তি টাকা দিয়ে তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এই বাড়তি ব্যয়ের বোঝা জনগণের ওপর না চাপিয়ে আমরা সংকট মোকাবিলা করতে চাই। যারা সংকটকে পুঁজি করে অবৈধ ব্যবসা ও পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি কায়েম করেছিল, তাদের দিন শেষ। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শ্রমঘন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে আমাদের সরকার যেকোনো যৌক্তিক প্রস্তাব গ্রহণ করতে প্রস্তুত। আমি আশা করি এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন হিসেবে ডিসিসিআই তার মৌলিক চরিত্রের দিকে আরও মনোযোগী হবে এবং অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র হিসেবে নিজেদের তুলে ধরবে। এটাই ডিসিসিআইয়ের মূল বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিৎ এবং এটি খুবই জরুরি।

অর্থনীতির এই অধ্যাপক বলেন, বিগত সময়ে আমাদের মূল্যবোধ ও রীতিনীতিকে এমনভাবে ধ্বংস করা হয়েছে যে, কিছু হলেই বাজারে আতঙ্ক শুরু হয়ে যায় এবং মজুতদারি চালু হয়ে যায়। গত বছর এই সময়ে যে পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হয়েছিল, আজও ঠিক একই পরিমাণ সরবরাহ করা হচ্ছে। অথচ বাজারে অস্থিরতা তৈরি করা হয়। অন্যদিকে আর্থিক খাতের দুরবস্থার কারণে ব্যাংকগুলো এলসি মার্জিন বাড়িয়ে দিচ্ছে।

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন যাবত ব্যবসা সহায়ক পরিস্থিতির অভাবে শিল্পখাতে উৎপাদন কমে যাওয়া, বকেয়া ঋণ বৃদ্ধি, উচ্চ খেলাপী ঋণ, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়া এবং সরকারের ঋণ গ্রহণ বৃদ্ধির কারণে দেশের শিল্পখাত মারাত্নক চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে। এ অবস্থা উত্তরণে ব্যাংক খাতের কাঠামোগত দূর্বলতার সংষ্কার, স্থিতিশীলতা ও সুশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় বাড়ানো জরুরি।

ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এক চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এখাতের টেকসই ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির জন্য ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এখন সময়ের দাবি।

তিনি জানান, ব্যাংক খাতে তারল্যের সংকট নেই। বরং রেকর্ড ৩ লাখ ২১ হাজার ২৫৫ কোটি টাকার অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে। তারপরও বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি সংকুচিত হয়ে ৬.০৩ শতাংশে নেমে এসেছে। যা আগের বছরের তুলনায় ৭.১৫ শতাংশের অনেক কম।

তিনি আরো বলেন, শিল্প খাতের মোট ঋণের বর্তমানে ৫০.৪৬ শতাংশ অনাদায়ী এবং খেলাপি ঋণের হার ৩১.২ শতাংশে পৌঁছেছে। ব্যাংকগুলো এখন চরম আতঙ্কে ভুগছে। এসএমই উদ্যোক্তাদের নেওয়া ঋণের ৩৫.৪৩ শতাংশও এখন সময়মতো পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় তা খেলাপী হয়ে পড়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ব্যাংক খাতের গভীরে থাকা কাঠামোগত দূর্বলতার সংস্কার, ব্যাংক ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনায়ন ও সুশাসনের ওপর গুরুত্ব প্রদান এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের ওপর অতিরিক্ত প্রাধান্য না দিয়ে স্থানীয় শিল্পায়নে অর্থায়ন নিশ্চিত করার সুপারিশ করেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার, এসএমই ফাইন্যান্সিং সহজ করার কোনো বিকল্প নেই এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলো এখাতে অর্থায়নে এগিয়ে এসেছে। এছাড়াও সরকারের নীতি নির্ধারকসহ সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয়ের অভাব রয়েছে।

এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম শামসুল আরেফিন বলেন, বর্তমানে পরিবেশবান্ধব সবুজ প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়টিকে ব্যাংকগুলো প্রাধান্য দিয়ে থাকে। উদ্যোক্তাদের এধরনের ব্যবসায় এগিয়ে আসতে হবে। এসএসমই খাতের উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণের ঘাটতির কারণে তাদের ঋণ প্রদান বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

সিটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আশানুর রহমান বলেন, এসএমইদের সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এখাতের উদ্যোক্তাদের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত ক্রেডিট গ্যারিন্টি স্কিমের সীমা বাড়ানো এবং ঋণ প্রাপ্তির প্রয়োজনীয় নথিপত্রের সংখ্যা কমিয়ে আনা জরুরি। এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য একটি মার্কেট প্লেস খুবই আবশ্যক। এটা না হলে উদ্যোক্তারা নিজেদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারবেন না এবং ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রদানের প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্থ হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক (এসএমই ও স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগ) নওশাদ মোস্তফা বলেন, আর্থিক খাতে আমাদের প্রকৃত তথ্যের প্রচুর ঘাটতি রয়েছে। ফলে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। সরকারি সংস্থাসহ আর্থিক খাতের সকল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালক (গবেষণা) সেলিম আল মামুন বলেন, অতিরিক্ত তারল্য থাকা সত্ত্বেও ম্যাক্রো ইকোনোমিক স্ট্যাবিলিটি না থাকার কারণে বেসরকারি খাতে চাঞ্চল্য পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এজন্য ব্যবসা পরিচালনা সূচকে উন্নয়নের উপর জোর দেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক (গবেষণা) মো. আব্দুল ওয়াহাব বলেন, ঋণ পরিশোধে উদ্যোক্তাদের সময়সীমা রক্ষা না করার কারণে ব্যাংক ও উদ্যোক্তাদের সম্পর্কটা নিম্নমুখী হচ্ছে। এ সম্পর্কের উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই| অর্থায়নের জন্য বেসরকারি খাতকে শুধু ব্যাংকের উপর নির্ভর থাকলে চলবে না। বিকল্প অর্থায়ন যেমন: বন্ড মার্কেট সহ অন্যান্য খাতের উপর নির্ভরশীলতা বাড়াতে হবে।

মুক্ত আলোচনায় ঢাকা চেম্বারের সাবেক পরিচালক মো. সারফুদ্দিন এবং এফবিসিসিআইর সদস্য তানভীর মোহাম্মদ দিপু অংশগ্রহণ করেন। ডিসিসিআই সহসভাপতি মো. সালিম সোলায়মান এবং পরিচালনা পর্ষদের সদস্যসহ সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা আলোচনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

(ওএস/এএস/এপ্রিল ১৬, ২০২৬)


















পাঠকের মতামত:

১৮ এপ্রিল ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test