E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care

For Advertisement

Mobile Version

‘পাকিস্তানের সৌর বিপ্লব থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ আছে’

২০২৬ জুন ২৩ ১৪:২৮:৪২
‘পাকিস্তানের সৌর বিপ্লব থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ আছে’

স্টাফ রিপোর্টার : পাকিস্তানের মতো সৌরবিদ্যুৎ খাতে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করতে হলে বাংলাদেশকে নীতিগত সংস্কার, কর-শুল্ক কমানো এবং সহজ অর্থায়নের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে এখনও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে, তবে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) রাজধানীর একটি হোটেলে ‘পাকিস্তানে সৌর বিপ্লব: জাতীয় বাজেটের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা’ শীর্ষক সংলাপে এসব কথা বলা হয়। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এ সংলাপের আয়োজন করে।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, পাকিস্তানে সৌর বিপ্লব চলছে এবং তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জীবাশ্ম জ্বালানির বাইরে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে গুরুত্ব দেওয়ার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ইতিবাচক উদ্যোগ।

তিনি বলেন, এবারের বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিভিন্ন ধরনের কর ও রাজস্ব সুবিধা দেওয়া হয়েছে। শুধু বিদ্যুৎ খাত নয়, বিদ্যুতায়িত অন্যান্য খাত, বৈদ্যুতিক যান (ইভি) এবং ব্যাটারি শিল্পের জন্যও প্রণোদনা রাখা হয়েছে। তবে কৃষি খাতে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন ছিল।

মোয়াজ্জেম বলেন, জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচির অগ্রগতিও জানতে হবে। সরকারি সব প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তার ভাষ্যে, ‌‘নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরে বাংলাদেশকে বড় পথ পাড়ি দিতে হবে। এই জায়গায় আমাদের মনে হয় পাকিস্তানের কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়ার আছে'।

তিনি বলেন, পাকিস্তান দেখিয়েছে কীভাবে একটি সংকটকে সম্ভাবনায় রূপ দেওয়া যায়। অল্প সময়ের মধ্যে দেশটিতে রুফটপ সোলারের বিস্তার ঘটেছে। বর্তমানে পাকিস্তানের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪১ শতাংশ আসে জীবাশ্ম জ্বালানির বাইরে থেকে। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ জলবিদ্যুৎ, ৯ শতাংশ পারমাণবিক এবং ৭ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদিত হচ্ছে।

সংলাপে ‘সোলার রাশ’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পাকিস্তানের রিনিউএবল ফার্স্টের ম্যানেজার মোহাম্মদ বাসিত ঘৌরি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সৌরবিদ্যুতের নতুন এক রূপান্তরের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে পাকিস্তানে কয়েক বছরের মধ্যে সৌরবিদ্যুতের বিস্ফোরণধর্মী প্রবৃদ্ধি বিদ্যুৎ খাতের চিত্র বদলে দিয়েছে, অন্যদিকে, বাংলাদেশে অফ-গ্রিড সোলার হোম সিস্টেম থেকে অন-গ্রিড রুফটপ সোলারে রূপান্তর শুরু হয়েছে।

তারমতে, উচ্চ কর, অর্থায়নের সংকট এবং নীতিগত জটিলতা এ রূপান্তরের পথে বড় বাধা।

বাসিত জানান, ২০২৫ অর্থবছরে পাকিস্তানে সৌর প্যানেল আমদানি ১৭ দশমিক ৯ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে, যা দেশটির মোট ইউটিলিটি-স্কেল গ্রিড সক্ষমতার চেয়েও বেশি। বর্তমানে দেশটিতে আনুমানিক ২৮ থেকে ৩৮ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপিত হয়েছে, যার প্রায় ৯৮ শতাংশই বিতরণভিত্তিক পর্যায়ে।

তিনি বলেন, ২০২৩ সালে পাকিস্তানে এ খাতে সংশ্লিষ্ট পরিবারের সংখ্যা ছিল ৩৫ লাখ, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৭৩ লাখে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ৭৩ শতাংশ পরিবার গ্রামীণ অঞ্চলে অবস্থিত।

তার ভাষ্য, বিদ্যুতের উচ্চমূল্য, গ্রিড ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা এবং বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর মাধ্যম হিসেবে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার পাকিস্তানের ‘সোলার রাশ’-এর মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

তিনি আরও জানান, চীনে অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে এক বছরে সৌর প্যানেলের দাম ৪৩ শতাংশ কমে যাওয়ায় পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুতের দ্রুত বিস্তার সম্ভব হয়েছে। দেশটিতে সৌরবিদ্যুৎ খাতে ৯৬ দশমিক ৬ শতাংশ বিনিয়োগই ভোক্তারা নিজেরা করেছেন।

তার তথ্য অনুযায়ী, সৌরবিদ্যুতের কারণে ২০২৫ অর্থবছরে পাকিস্তানে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য নির্গমন এড়ানো গেছে এবং প্রায় পাঁচ লাখ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশটি ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের বেশি তেল ও গ্যাস আমদানি ব্যয় সাশ্রয় করেছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান একই ধরনের বিদ্যুৎ সক্ষমতা সংকটের মুখোমুখি হলেও বাংলাদেশে ১১ থেকে ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি শুল্ক সৌরবিদ্যুতের বিস্তারকে ধীর করেছে।

সংলাপে ‘ফ্রম অফ-গ্রিড টু অন-গ্রিড: সোলার হোম সিস্টেম টু রুফটপ সোলার’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট আতিকুজ্জামান সাজিদ।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সোলার হোম সিস্টেম কর্মসূচি দুই কোটির বেশি মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় এনেছিল এবং এটি একসময় বিশ্বের বৃহত্তম অফ-গ্রিড সৌর কর্মসূচি ছিল। তবে ২০১৩ সালে বছরে ৮ লাখ ৫৩ হাজার সিস্টেম স্থাপনের রেকর্ডের পর ২০১৮ সালে তা নেমে আসে মাত্র ৩ হাজার ৪৫৫টিতে।

সাজিদ বলেন, সিপিডির ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী বর্তমানে দেশে স্থাপিত সোলার হোম সিস্টেমের প্রায় ৪৭ শতাংশ অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে।

তিনি জানান, বর্তমানে দেশে ৪ হাজার ৫৫১টি নেট-মিটারিংভিত্তিক রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনা রয়েছে, যার মোট সক্ষমতা ২১৩ দশমিক ৩ মেগাওয়াট। শুধু ২০২৫ সালেই ১ হাজার ৫৩১টি নতুন স্থাপনা যুক্ত হয়েছে। দেশের মোট রুফটপ সৌরবিদ্যুতের ৬০ দশমিক ৪ শতাংশ ঢাকা বিভাগে কেন্দ্রীভূত। তার মতে, সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের ওপর ২৭ দশমিক ৫ থেকে ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত কর ও শুল্ক আরোপ বিনিয়োগ ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র গ্রাহকদের জন্য সহজ অর্থায়নের অভাব, নেট মিটারিং অনুমোদনে জটিলতা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এ খাতের সম্প্রসারণে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, জাতীয় সংসদ ভবনেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার শুরু হয়েছে। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ব্যাপক কর-সুবিধা দিয়েছে এবং ব্যবসায়ীদের এ খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে।

তিনি বলেন, সরকার দেশের সব সেচ পাম্পকে ধীরে ধীরে সৌরশক্তিচালিত ব্যবস্থায় রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে এবং এ খাতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।

(ওএস/এএস/জুন ২৩, ২০২৬)




পাঠকের মতামত:

২৩ জুন ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test