E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের বিকল্প নয়, সক্ষমতা বৃদ্ধির হাতিয়ার’

২০২৬ জুলাই ২২ ১৪:০৯:৩৫
‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের বিকল্প নয়, সক্ষমতা বৃদ্ধির হাতিয়ার’

স্টাফ রিপোর্টার : চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত পরিবর্তনের সময়ে ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকতে হলে দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং মানবকেন্দ্রিক কর্মপরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এমনটাই জানিয়েছেন বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্র আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়, এটি এরই মধ্যে বাস্তবে চলে এসেছে। প্রযুক্তি মানুষের কাজ কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়, বরং মানুষের সক্ষমতা বাড়ানো, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং কাজের চাপ কমানোর জন্য ব্যবহৃত হওয়া উচিত।

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বাংলাদেশ অ্যাপারেল ইয়ুথ লিডার্স অ্যালায়েন্স (বায়লা) আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ‘বায়লা ফিউচার সামিট-২০২৬’-এর দ্বিতীয় দিনে এক সেশনে ফজলে শামীম এহসান এ কথা বলেন।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানান, একসময় পোশাক কারখানায় কাপড় হাতে পরীক্ষা করা হতো। কিন্তু বর্তমানে স্বয়ংক্রিয় মেশিন, ক্যামেরা ও এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে কাপড় পরীক্ষা ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এআই কোনো কর্মীকে প্রতিস্থাপন করছে না; বরং তার কাজকে সহজ করছে, উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করছে।

‘আমাদের বুঝতে হবে, এআইকে আমাদের পরিচালনা করতে হবে, এআই যেন আমাদের পরিচালনা না করে। আমরা যদি এআইকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারি, তাহলে এটি বড় সুযোগ তৈরি করবে,’ যোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে এআইয়ের যুগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হবে নতুন কিছু শেখার সক্ষমতা। একবার কোনো দক্ষতা অর্জন করে থেমে গেলে চলবে না; পরিবর্তিত প্রযুক্তির সঙ্গে নিয়মিত নিজেকে উন্নত করতে হবে।

ফজলে শামীম এহসান বলেন, এআই নিয়ে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং এটিকে নতুন সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। তার মতে, ভবিষ্যতের চাকরিতে শুধু প্রযুক্তিগত জ্ঞান নয়, বিশ্লেষণী চিন্তা, যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং দলগতভাবে কাজ করার ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ভবিষ্যতে এমন অনেক নতুন ধরনের চাকরি তৈরি হবে, যার নাম বা ধরন এখনো কেউ জানে না। তাই তরুণদের শুধু নির্দিষ্ট কোনো পেশার জন্য প্রস্তুত না করে পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা তৈরি করতে হবে বলে জানান এ ব্যবসায়ী নেতা।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মীর মূল দক্ষতায় পরিবর্তন আসবে। একই সময়ে ১৭ কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং ৯ কোটি ২০ লাখ পুরোনো ধরনের কাজ পরিবর্তিত বা বিলুপ্ত হতে পারে।

ফজলে শামীম এহসান বলেন, এর অর্থ কর্মসংস্থান কমে যাবে না, বরং কাজের ধরন পরিবর্তিত হবে। যারা নতুন দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন, তারাই ভবিষ্যতের সুযোগ কাজে লাগাতে পারবেন।

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আগে ভালো ফলাফল করা শিক্ষার্থী হয়তো মনে করতেন তার শেখার আর প্রয়োজন নেই। কিন্তু বর্তমানে যে ব্যক্তি নিয়মিত নতুন প্রযুক্তি, এআই বা ডিজিটাল টুল শিখছেন, তিনিই ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে বেশি মূল্য তৈরি করতে পারবেন।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, গত চার দশকে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রেখেছে। তবে একটি দেশের রপ্তানি কাঠামো কোনো একটি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়া দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ।

এ ব্যবসায়ী নেতা জানান, এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের জন্য শুধু কম শ্রম ব্যয়ের সুবিধা ধরে রাখা সম্ভব হবে না। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, শ্রমনীতি ও উৎপাদনশীলতার চাহিদা পূরণ করতে হলে কর্মীদের নতুন দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করতে হবে। শুধু উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা নয়, কারখানার শ্রমিকদেরও ডিজিটাল প্রযুক্তি, এআই ও আধুনিক উৎপাদন পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত করতে হবে।

ভবিষ্যতে শুধু পোশাক বিক্রি করলেই হবে না, বিক্রি করতে হবে কার্বন ব্যবস্থাপনা, টেকসই উৎপাদন ও সার্কুলার ইকোনমির সক্ষমতা, যোগ করেন ফজলে শামীম এহসান। তিনি বলেন, ক্রেতারা এখন শুধু টি-শার্ট বা জ্যাকেট কিনতে চান না। তারা জানতে চান পণ্যের উৎস, উৎপাদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে। তাই কারখানার কর্মীদেরও সবুজ প্রযুক্তি, টেকসই উৎপাদন এবং পরিবেশবান্ধব কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

তিনি জানান, ভবিষ্যতের শিল্প ব্যবস্থায় মালিক, শ্রমিক ও সরকারের মধ্যে কার্যকর সামাজিক সংলাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে অনেক ক্ষেত্রে মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে দূরত্ব ছিল। কিন্তু ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে পারস্পরিক আস্থা, সমতা ও আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

তার মতে, সরকার, নিয়োগকর্তা ও শ্রমিক- তিন পক্ষকেই তথ্যভিত্তিক, গঠনমূলক ও খোলামেলা আলোচনায় যুক্ত হতে হবে।

ভবিষ্যতের কর্মশক্তি তৈরিতে কয়েকটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে এ ব্যবসায়ী নেতা বলেন, কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগ করতে হবে। ব্যবস্থাপনা পর্যায় থেকে শুরু করে কারখানার সহায়ক কর্মী পর্যন্ত সবাইকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি গ্রহণ বাড়াতে হবে এবং কর্মীদের নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষম করে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মপরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া, যেখানে শ্রমিকদের মতামত ও অভিজ্ঞতাকে মূল্য দেওয়া হবে। চতুর্থত, একই সঙ্গে সবুজ উৎপাদন, টেকসই শিল্প ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো। সর্বশেষে, নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারলেই নতুন সাফল্যের সুযোগ তৈরি হবে। আমাদের এখন থেকেই ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।

(ওএস/এএস/জুলাই ২২, ২০২৬)












পাঠকের মতামত:

২২ জুলাই ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test