E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

‘বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে নতুন সাবমেরিন ক্যাবলের বিকল্প নেই’

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২২ ১৫:২৫:০৮
‘বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে নতুন সাবমেরিন ক্যাবলের বিকল্প নেই’

স্টাফ রিপোর্টার : বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল এলে দেশে ইন্টারনেটের দাম ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সভাপতি মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম।

তিনি বলেন, বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে নতুন সাবমেরিন ক্যাবলের বিকল্প নেই। সাবমেরিন ক্যাবল না এলে ব্যান্ডইউথ আমদানির ক্ষেত্রে ভারতের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর রাওয়া ক্লাবে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত ‘সবার জন্য সাশ্রয়ী ইন্টারনেট: টেক জায়ান্টদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে বাধা ও সমাধান কোথায়?’ শীর্ষক কর্মশালা ও আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন আইএসপিএবি সভাপতি।

বেসরকারি তিনটি প্রতিষ্ঠান সাবমেরিন ক্যাবল নির্মাণে প্রায় ২৭০০–৩০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে উল্লেখ করে আমিনুল হাকিম প্রশ্ন তোলেন, জনগণের স্বার্থে এসব বিনিয়োগকে কেন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। একই সঙ্গে তিনি মন্ত্রণালয়কে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।

আইএসপিএবির প্রস্তাবনা
অনুষ্ঠানে সাশ্রয়ী ও মানসম্মত ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে আইএসপি খাতের পক্ষ থেকে একাধিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল বিনিয়োগ ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা, একাধিক সাবমেরিন ক্যাবল ও ল্যান্ডিং স্টেশন স্থাপন, আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথে ক্যারিয়ার-নিউট্রাল ও অ্যাক্টিভ শেয়ারিং চালু, সরকারি ফাইবার অবকাঠামোকে ‘ফাইবার ব্যাংক’ হিসেবে আইএসপিদের ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া, স্থানীয় পিয়ারিং ও আইএসপির সংখ্যা বাড়ানো এবং বিভাগীয় ও শহর পর্যায়ে ডেটা সেন্টার, ক্লাউড ও সিডিএন অবকাঠামো গড়ে তোলা। পাশাপাশি গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় ব্রডব্যান্ড সম্প্রসারণে সরকারি প্রণোদনা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইন্টারনেটের খরচ কমানোর পাশাপাশি মানসম্মত ও অর্থবহ ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত এবং টেক জায়ান্টদের জন্য দেশে আরও অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব বলে মনে করছে আইএসপি খাত।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন টিআরএনবি সভাপতি এস এম মাসুদুজ্জামান রবিন। সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাবেক সভাপতি সমীর কুমার দে। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রকল্পপ্রধান মাহমুদ শাহেদ ও আইএসপিএবির কোষাধ্যক্ষ মঈন উদ্দিন আহমেদ।

বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান
সাশ্রয়ী ও অর্থবহ ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে দেশে একাধিক আন্তর্জাতিক সংযোগের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি এ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশনের (বিএনএনআরসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম বজলুর রহমান। সরকারি খাতের একচেটিয়া ব্যবস্থার কারণে অতীতে টেলিযোগাযোগ খাতে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইন্টারনেট অবকাঠামোতেও প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বজলুর রহমান। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যের উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের প্রায় ৫৮ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। তার মতে, এর অর্থ এখনো বড় একটি জনগোষ্ঠী ইন্টারনেট ব্যবহারের বাইরে রয়েছে। এই জনগোষ্ঠীকে ইন্টারনেটের আওতায় আনতে একাধিক ব্যবস্থা ও বিকল্প অবকাঠামো প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক সংযোগ ও ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে বেসরকারি খাতকে আরও সুযোগ দেওয়া উচিত বলে জানান তিনি।

সিডিনেট কমিউনিকেশন্স লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মশিউর রহমান বলেন, বাব আল-মান্দেব প্রণালীর নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতির কারণে সিঙ্গাপুর-মার্সেই সাবমেরিন কেবল প্রকল্পের কাজ অনিশ্চয়তায় পড়েছে। বিকল্প হিসেবে সৌদি আরব ও মিশরের স্থলভাগ ব্যবহার করে কেবল স্থাপনের পরিকল্পনা বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে প্রকল্পটি প্রায় দুই বছর পিছিয়ে যেতে পারে।

তিনি বলেন, একই সময়ে দেশের বেসরকারি সাবমেরিন কেবল প্রকল্পও থেমে গেলে আগামী কয়েক বছরে নতুন কেবল আসার সুযোগ কমে যাবে। ফলে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর ওপর বাংলাদেশের ব্যান্ডউইথ নির্ভরতা বর্তমানের প্রায় ৬০ শতাংশ থেকে ৮০–৯০ শতাংশে বেড়ে যেতে পারে।

সাবমেরিন ক্যাবলেই বড় ঘাটতি
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট কানেক্টিভিটির ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ সাবমেরিন কেবলের ওপর নির্ভরশীল। অথচ বাংলাদেশে মাত্র দুটি সাবমেরিন ক্যাবল ও দুটি ল্যান্ডিং স্টেশন রয়েছে এবং এ খাতে কোম্পানি মাত্র একটি। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এটি বাংলাদেশের অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা।

এছাড়া আইটিসি ও টেরেস্ট্রিয়াল ক্যাবল থাকলেও এগুলো মূলত ব্যাকআপ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য ও বিকল্প সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ বাড়ানো জরুরি।

ব্যান্ডউইথের বড় ব্যবহারকারী টেক জায়ান্টরা
মূল প্রবন্ধের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট ১৩ দশমিক ৫ টেরাবাইট ব্যান্ডউইথ ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে ২৮-২৯ শতাংশ ব্যবহার করে গুগল, ২৬-২৭ শতাংশ মেটা, ১৪-১৫ শতাংশ আকামাইন এবং ৬-৭ শতাংশ ক্লাউডফ্লেয়ার ও অ্যামাজন। এসব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ডেটা সেন্টার স্থাপন করলে দেশের ইন্টারনেট অবকাঠামো ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে বাড়বে স্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ।

১০০ পয়েন্টের স্কোর কার্ড
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো দেশে বিনিয়োগের আগে রাজনৈতিক ও রেগুলেটরি পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় ১০০ পয়েন্টের একটি ‘স্কোর কার্ড’ বা চেকলিস্ট বিবেচনা করে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও গ্রিড ব্যবস্থার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এ খাতে প্রায় ২২ শতাংশ ওয়েটেজ থাকে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও নির্ভরযোগ্য গ্রিড ব্যবস্থা বড় বিনিয়োগের অন্যতম পূর্বশর্ত।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ব্যান্ডউইথের চাহিদা দ্রুত বাড়া এবং নতুন প্রাইভেট সাবমেরিন ক্যাবলের লেটেন্সি ৩৩-৩৫ মিলিসেকেন্ড হওয়াকে ইতিবাচক দিক হিসেবে তুলে ধরা হয়।

অনুমতি পেতে ৭-৮ মাস
বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবলসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে অনুমোদনের জন্য প্রায় ১০টি মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। এতে ৭ থেকে ৮ মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায় বলে জানানো হয়। তাতেও আটকে রয়েছে বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবলের অনুমতি।

বক্তারা বলেন, অনুমোদন প্রক্রিয়ায় ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ ব্যবস্থা চালু করা গেলে সময় ও জটিলতা দুটোই কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে নীতিমালার ধারাবাহিকতা ও আইনি নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বিনিয়োগ হতে পারে ৩৫ বিলিয়ন ডলার
আলোচনায় বলা হয়, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো দেশে এলে তাদের বিনিয়োগ সাধারণত ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে শুরু হতে পারে। বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে তা ৩৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এ ধরনের বিনিয়োগের ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।

বক্তাদের মতে, প্রতিটি টেক জায়ান্টের সাইটে ১ হাজার থেকে ৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকে। সব মিলিয়ে দেশে প্রায় ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে।

কমতে পারে ইন্টারনেটের দাম
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, টেক জায়ান্টদের বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশের ভেতরে প্রতিযোগিতাও বাড়াতে হবে। প্রতিযোগিতা বাড়লে ইন্টারনেটের দাম কমার সুযোগ তৈরি হবে এবং শক্তিশালী হবে ডিজিটাল যোগাযোগ অবকাঠামো।

তারা বলেন, টেক জায়ান্ট আসুক বা না আসুক, আমাদের এখানে প্রতিযোগিতা দরকার। প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে ইন্টারনেট দরকার।

(ওএস/এএস/সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test