E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের দৃষ্টান্ত

ব্র্যাক ব্যাংকের অর্থায়নকৃত গ্রিন ফ্যাক্টরি ঘুরে দেখলেন বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাবৃন্দ

২০২৬ অক্টোবর ২৭ ১৮:১৯:৩০
ব্র্যাক ব্যাংকের অর্থায়নকৃত গ্রিন ফ্যাক্টরি ঘুরে দেখলেন বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাবৃন্দ

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশের পরিবেশবান্ধব কারখানা এনজেড ডেনিম লিমিটেড পরিদর্শনের মাধ্যমে আঞ্চলিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিরা সরাসরি দেখার সুযোগ পেয়েছেন— কীভাবে গ্রিন ফাইন্যান্স বা পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন নীতিগত উদ্যোগকে বাস্তব উৎপাদনব্যবস্থায় রূপান্তরিত করছে। এ পরিদর্শনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টের নেওয়া সবুজ ও টেকসই অর্থায়নবিষয়ক নীতিগত উদ্যোগ কীভাবে ব্র্যাক ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজে লাগছে, তা তুলে ধরা। 

গত ৬ থেকে ৮ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক ও অ্যালায়েন্স ফর ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন (এএফআই) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে এ পরিদর্শনের আয়োজন করা হয়। সাউথ এশিয়া রিজিয়ন ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ইনিশিয়েটিভ (সারফি)-এর আওতায় আয়োজিত এ কর্মসূচিতে শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেপাল ও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি এএফআই, বাংলাদেশ ব্যাংক ও মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ)-এর প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংকের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ পরিদর্শনের মাধ্যমে নীতিগত আলোচনা থেকে বাস্তব শিল্পকারখানার কার্যক্রমে সবুজ অর্থায়নের প্রয়োগ তুলে ধরা হয়। এ সময় ব্র্যাক ব্যাংকের কর্পোরেট ব্যাংকিং এবং ইএসজি অ্যান্ড সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স টিমের সদস্য এবং এনজেড ডেনিমের ম্যানেজমেন্ট টিমের সদস্যরা আমন্ত্রিত প্রতিনিধিদলকে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে ধারণা দেন।
কারখানা পরিদর্শনকালে প্রতিনিধিরা নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ব্যবস্থা ও জ্বালানিসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ঘুরে দেখেন। পাশাপাশি গ্রিন রিফাইন্যান্সিং কীভাবে প্রতিষ্ঠানটির পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থায় বিনিয়োগে সহায়তা করেছে, সে সম্পর্কেও তাঁরা ধারণ লাভ করেন। এ সময় টেকসই অর্থায়নে ব্র্যাক ব্যাংকের অভিজ্ঞতা এবং গ্রাহকপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশবান্ধব কার্যক্রম গ্রহণে সহায়তার বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরা হয়।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেদের গ্রিন ফাইন্যান্স কার্যক্রমের বাস্তব প্রয়োগ তুলে ধরতে ব্র্যাক ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহক এনজেড ডেনিমকে নির্বাচন করে। এর মাধ্যমে সবুজ অর্থায়ন ব্যবস্থায় ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান ও অর্থায়নকারী ব্যাংকের ভূমিকা সম্পর্কে প্রতিনিধিদলকে বাস্তব ধারণা দেওয়া হয়। পরিদর্শনে নীতিমালা ও পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার সঙ্গে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের চাহিদা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন পরিকল্পনার সমন্বয়ের গুরুত্বও উঠে আসে।

টেকসই অর্থায়নে ব্র্যাক ব্যাংকের রয়েছে উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবিলিটি রেটিংয়ে ধারাবাহিকভাবে পাঁচ বছর দেশের শীর্ষ টেকসই ব্যাংকগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে ব্যাংকটি। পাশাপাশি, ব্লুমবার্গের ইএসজি রেটিংয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেছে ব্র্যাক ব্যাংক। এসব স্বীকৃতি এবং গ্রিন রিফাইন্যান্সিং সুবিধা প্রাপ্তিতে গ্রাহকদের সহায়তার বিষয়গুলো আঞ্চলিক প্রতিনিধিদের সামনে বাস্তবভিত্তিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে ব্যাংকটিকে সহায়তা করেছে।

এই কর্মসূচি সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, “এ পরিদর্শনের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা সরাসরি দেখার সুযোগ পেয়েছেন, কীভাবে গ্রিন ফাইন্যান্সবিষয়ক নীতিমালা কারখানার বাস্তব বিনিয়োগে রূপ নেয়। এ ধরনের বিনিয়োগ আরও বেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছে দিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যাংক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

এনজেড ডেনিমের ম্যানেজমেন্ট টিম কীভাবে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও আধুনিক, জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ উৎপাদনপ্রক্রিয়ার উন্নয়ন এবং ব্যবসার অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখতে পারে— সেই বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেন। কারখানার ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎব্যবস্থা, জ্বালানিসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি এবং বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) শিল্পকারখানার কার্যক্রমে পরিবেশগত বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার বাস্তব উদাহরণ হিসেবে প্রতিনিধিদলের সামনে তুলে ধরা হয়।

এনজেড ডেনিমের মো. সালেউদ্ জামান খান (জিতু) বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন রিফাইন্যান্সিং সুবিধা পেতে ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগিতা আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সুযোগ করে দিয়েছে। এসব বিনিয়োগ আমাদের পরিচালন দক্ষতা বাড়াচ্ছে, ব্যবসার প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করছে এবং টেকসই উৎপাদনব্যবস্থার প্রতি আমাদের অঙ্গীকারকে আরও দৃঢ় করছে। আঞ্চলিক প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানাতে পেরে এবং উৎপাদনকে আরও টেকসই ও পরিবেশবান্ধব করার চলমান উদ্যোগগুলো তুলে ধরতে পেরে আমরা আনন্দিত।”

পরিদর্শনের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধিরা দেখার সুযোগ পান, কীভাবে নীতিগত উদ্যোগ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত ভূমিকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণে উৎসাহিত করতে পারে। একই সঙ্গে, টেকসই অর্থায়নের প্রসার এবং সম্পদের আরও দক্ষ ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদনব্যবস্থাকে পরিবেশবান্ধব করে তুলতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের গুরুত্বও উঠে আসে এখানে।

স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের পরাস আব্বাসি বলেন, “এ ধরনের পরিদর্শন পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করে। একই সাথে, এই অঞ্চলের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তা সরাসরি দেখারও সুযোগ করে দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে যৌথভাবে এই রূপান্তরে ভূমিকা রাখতে পারে— সে বিষয়ে টেকসই পোশাকশিল্প খাতে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে অনেক কিছু জানার আছে।”

কারখানা পরিদর্শনের পাশাপাশি এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ছিল কেবল নীতি নির্ধারণ কিংবা কর্মসূচির নকশা তৈরির মধ্যেই গ্রিন ফাইন্যান্সকে সীমাবদ্ধ না রেখে বরং এ বিষয়ে অংশগ্রহণকারীদের বোঝাপড়াকে আরও সমৃদ্ধ করা। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এক মঞ্চে নিয়ে আসার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত বাস্তবায়ন, চ্যালেঞ্জ ও বিভিন্ন শিক্ষণীয় দিক নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়, যা প্রতিনিধি দেশগুলোর নিজস্ব বাজারে টেকসই অর্থায়ন কার্যক্রমকে আরও সমৃদ্ধ করতে ভূমিকা রাখবে।

এএফআইয়ের এশিয়া অঞ্চলের রিজিওনাল ম্যানেজার মিস নাংসি ডেমা বলেন, “নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধিরা যখন অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়নের বাস্তব ফলাফল সরাসরি দেখতে পারেন, তখন পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময় আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে। এ পরিদর্শন দেখিয়েছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ কীভাবে ব্যবসার টেকসই প্রবৃদ্ধি ও বাণিজ্যিক সাফল্যে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পরিবেশবান্ধব ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তি গ্রহণের পথও সুগম করতে পারে।”

ব্র্যাক ব্যাংকের জন্য এ উদ্যোগ টেকসই অর্থায়নের প্রসারে পারস্পরিক সহযোগিতার গুরুত্বকে তুলে ধরে। উপযুক্ত অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ কীভাবে ব্যবসা ও পরিবেশের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে, সে বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতেও ব্যাংকটি কাজ করছে।

ব্র্যাক ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর অ্যান্ড সিইও তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, “এ পরিদর্শনের আয়োজন এবং আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধিদের সামনে ব্র্যাক ব্যাংকের টেকসই অর্থায়ন কার্যক্রম তুলে ধরার সুযোগ করে দেওয়ায় আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি কৃতজ্ঞ। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে গ্রাহকদের সহায়তা করা তাদের আরও শক্তিশালী, দক্ষ ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”

এ উদ্যোগের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে, কীভাবে গ্রিন ফাইন্যান্স নীতিগত লক্ষ্যকে শিল্পকারখানার বাস্তব উদ্যোগে রূপ দিতে পারে। একটি সচল শিল্পকারখানা পরিদর্শন এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অর্থায়নকারী ব্যাংকের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি করে এ উদ্যোগ টেকসই অর্থায়নের প্রসার, ব্যবসার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে আরও পরিচ্ছন্ন ও দক্ষ উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতাকে এগিয়ে নিয়েছে।

(পিআর/এসপি/অক্টোবর ২৭, ২০২৬)

পাঠকের মতামত:

২৭ অক্টোবর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test