E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

পোশাক শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নির্ধারণে তিন পক্ষের আস্থা

২০২৬ নভেম্বর ০৫ ০০:৫৫:৫৫
পোশাক শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নির্ধারণে তিন পক্ষের আস্থা

স্টাফ রিপোর্টার : পোশাক শ্রমিকদের নতুন নিম্নতম মজুরি নির্ধারণে গঠিত মজুরি বোর্ডের ওপর আস্থা রেখেছে সরকার, মালিক ও শ্রমিকপক্ষ। ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি ঘোষণা এবং জানুয়ারি থেকে তা কার্যকরের প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। শ্রমিকদের ন্যায্য ও যৌক্তিক মজুরি নির্ধারণে সব পক্ষ একমত হওয়ার পাশাপাশি শিল্পের স্বার্থে চলমান অসন্তোষ ও অস্থিরতা কাটিয়ে কারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।

বুধবার (৪ নভেম্বর) সচিবালয়ে শ্রম মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে শ্রমিক, মালিক ও সরকারের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তারা। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।

বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, মজুরি বোর্ডের ওপর সরকারের পূর্ণাঙ্গ আস্থা রয়েছে। বোর্ডের সদস্যরা শ্রমিক ও মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে একটি গ্রহণযোগ্য, যৌক্তিক ও ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ করবেন। নভেম্বর ও ডিসেম্বরের মধ্যে আলোচনা শেষ করে ডিসেম্বরের ভেতরেই নতুন নিম্নতম মজুরি ঘোষণা করা হবে বলে বোর্ড জানিয়েছে।

তিনি বলেন, আগে পাঁচ বছর অন্তর মজুরি বোর্ড গঠন করা হলেও এবার তিন বছর অন্তর নতুন বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বোর্ডের প্রথম সভাও স্বল্পতম সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে। দ্বিতীয় সভাও দ্রুত আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, এতে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা হবে, শিল্পের স্বার্থ রক্ষা হবে এবং বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা হবে।

পোশাকশিল্পের স্বার্থে শ্রমিক, মালিক ও সরকারকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, শ্রমিকদের ত্যাগ ও সংগ্রামের ওপর ভিত্তি করেই ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ স্লোগান বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই এ শিল্পকে এগিয়ে নিতে সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে।

শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বৈঠকে মালিক, শ্রমিক ও সরকারের প্রতিনিধিদের মধ্যে যে আন্তরিকতা দেখা গেছে, তা কারখানাগুলোতেও বজায় থাকা প্রয়োজন। বৃহস্পতিবার থেকে শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে কাজে ফিরবেন বলে সরকার প্রত্যাশা করে। তবে মজুরি বোর্ডের সঙ্গে সংলাপ, পরামর্শ ও আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

পোশাকশিল্পে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ শ্রমিকদের মধ্যে কিছু বহিরাগত এসে উসকানি দিচ্ছেন এবং উত্তেজনা সৃষ্টি করছেন। বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এতে সাধারণ শ্রমিকদের রক্ত ঝরছে। এ পরিস্থিতিতে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য ইতোমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বোর্ডের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। চার দিনের মাথায় আবারও সভা হবে। অতীতে কোনো দাবি নিষ্পত্তিতে তিন-চার বছর সময় লাগলেও বর্তমান সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে।

শ্রমিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমি আহ্বান করবো, আপনারা কলকারখানায় কালকে ফিরে যান। আপনাদের সমস্ত দাবি সরকারের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বোর্ড বসেছে, বোর্ডে আলোচনা হবে। আলোচনার ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান হবে, ইনশাআল্লাহ।

মন্ত্রী বলেন, শ্রমিকদের দাবি জানানোর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। শ্রমিক নেতাদের মাধ্যমে অথবা মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে দাবি জানাতে হবে। কোনো ধরনের আবেদন বা আলোচনা ছাড়াই রাস্তাঘাট অবরোধ করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

বন্ধ কারখানা খুলে উৎপাদন স্বাভাবিক করতে মালিকদের প্রতিও আহ্বান জানান তিনি। আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, যেসব মালিক কারখানা বন্ধ রেখেছেন, তারা যেন সেগুলো খুলে দেন। শ্রমিক নেতাদেরও নিজ নিজ কারখানায় গিয়ে শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তাসহ সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

বৈঠকে মালিকপক্ষের প্রতিনিধিরাও নতুন মজুরি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের বিষয়ে আশ্বাস দেন। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। প্রথম সভায় নতুন মজুরি ঘোষণার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার, মালিক ও শ্রমিকপক্ষ সম্মিলিতভাবে এ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে।

তিনি বলেন, মজুরি বোর্ডের ওপর আস্থা রেখে তাদের সুস্থভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। এতে শিল্প, শ্রমিক ও দেশের অর্থনীতি লাভবান হবে। শ্রমিকদের আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে নিজ নিজ কারখানায় কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শ্রমিকদের যৌক্তিক মজুরি বৃদ্ধির দাবির বিষয়ে সরকার, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ কিংবা শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। সবাই এ দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল। মজুরি বোর্ড দ্রুততম সময়ের মধ্যে নতুন মজুরি নির্ধারণ করবে। বোর্ড যে সময়সীমা নির্ধারণ করবে, মালিকপক্ষ সেই সময়ের মধ্যেই তা বাস্তবায়ন করবে।

তবে শুধু মজুরি বাড়ালেই শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় কমবে না বলে মনে করেন তিনি। মজুরি বাড়ানোর পর বাড়িওয়ালারা অনেক সময় বাড়িভাড়া বাড়িয়ে দেন। এতে শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধির প্রকৃত সুফল পান না। এ জন্য শ্রমঘন এলাকাগুলোতে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিকদের জন্য রেশন সুবিধা, বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং আবাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানান তিনি।

শ্রমিক নেতারাও মজুরি বোর্ডের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। শ্রমিক নেতা নাজমা আক্তার বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে মজুরি বোর্ড গঠনের মাত্র তিন দিনের মাথায় প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই সভায় ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি ঘোষণা এবং জানুয়ারিতে তা কার্যকরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২০২৩ সালে গঠিত মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হতে তিন মাস সময় লেগেছিল।

তিনি বলেন, শ্রমিকদের এখন ফসল ঘরে তোলার সময়। তাই কারখানায় ফিরে কাজে যোগ দিতে হবে। কোনোভাবেই পোশাকশিল্প ধ্বংস করা যাবে না। এ শিল্পের উৎপাদন বিদেশি ক্রয়াদেশের ওপর নির্ভরশীল। সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণ করতে না পারলে শিল্পের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। শ্রমিকরা ন্যায়সংগত আন্দোলন করবেন, তবে কোনো ধরনের উসকানি বা বিশৃঙ্খলায় জড়াবেন না।

আরেক শ্রমিক নেতা মন্টু ঘোষ বলেন, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানানোর নির্ধারিত পদ্ধতি রয়েছে। আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে শ্রমিকদের লিখিত দাবি মজুরি বোর্ডের কাছে জমা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন চলবে, তবে তা কারখানা ও শিল্প ধ্বংস করে নয়। কারখানা চালু রেখে আলোচনার মাধ্যমে দাবি আদায় করতে হবে।

বৈঠকে সাম্প্রতিক শ্রমিক আন্দোলনে নিহত শ্রমিকের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়েও কথা বলেন শ্রমমন্ত্রী। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে নিহত শ্রমিকের পরিবারকে তাৎক্ষণিকভাবে এক লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে আইনের আওতায় আনা হবে।

এ ছাড়া শ্রমিকদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে গাজীপুরের টঙ্গীতে ১০০ শয্যার একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে হাসপাতাল নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলেও জানান মন্ত্রী।
(ওএস/এএস/নভেম্বর ০৫, ২০২৬)












পাঠকের মতামত:

০৫ নভেম্বর ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test