মুক্তিযোদ্ধা সংজ্ঞা নিয়ে ধুম্রজালের অবসান ঘটাতে হবে
আবীর আহাদ
সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই আজম বীরপ্রতীক এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন যে, মুক্তিযোদ্ধা সংজ্ঞা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। উপদেষ্টা মহোদয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দৃষ্টিপাত করেছেন। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা কোন প্রক্রিয়া তথা কিসের ভিত্তিতে "মুক্তিযোদ্ধা" বলে চিহ্নিত হবেন, সে-বিষয়ে স্বাধীনতার এতোটি বছরেও নির্ধারণ করা গেলো না, এটা বড়োই আফসোসের কথা। সংজ্ঞা থাকতেও সংজ্ঞা নেই। আবার একটি সংজ্ঞা থাকলেও সেটি মান্য করা হলো না। উপরন্তু একটা সংজ্ঞা বহাল থাকা অবস্থায় আরেকটা সংজ্ঞার প্রচলন ঘটানো হয়েছে! এতে করে মুক্তিযোদ্ধা নির্ণয়ে একটা ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নতুন উপদেষ্টা মহোদয় ঠিকই ধরতে পেরেছেন। সেই ধুম্রজালের অবসান ঘটাতে তিনি বদ্ধপরিকর বলে মনে হয়। তাঁর সদয় জ্ঞাতার্থে বিষয়টার ওপর আমি একটু আলোকপাত করছি।
বাঙালি জাতির ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে সবচে' বড়ো গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত সেই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। আর মুক্তিযুদ্ধের বীরসেনানী- যাদের সীমাহীন শৌর্য ত্যাগ রক্ত ও বীরত্বে মুক্তিযুদ্ধে আমরা পাকিস্তান হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে বিজয় লাভ করেছি, ইতিহাসে তারা " বীর মুক্তিযোদ্ধা" নামে পরিচিত। "মুক্তিযোদ্ধা" শব্দটি যুদ্ধের মাঠ থেকে মুখে মুখে প্রচলিত হলেও এর পশ্চাতে একটি আইনী ভিত্তি বা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি একান্তই আবশ্যকীয় ছিলো।
সে-নিরিখেই স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরেই অর্থাত্ ১৯৭২ সালের আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধু সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সংজ্ঞা দিয়ে বলেছিলেন : মুক্তিযোদ্ধা মানে এমন একজন ব্যক্তি যিনি মুক্তিযুদ্ধে নিয়োজিত যেকোনো দলের (ফোর্স) সদস্য হিশেবে অংশগ্রহণ করেছিলেন- যেটির মূল ঘোষণা নিম্নরূপ : (1972) : Freedom Fighters (FF) means any person who had served as member of any force engaged in the War of Liberation.
এ সংজ্ঞাটি সরকারি গেজেট দ্বারা অনুমোদিত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সঠিক সংজ্ঞা বলে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। এ মুক্তিযোদ্ধা সংজ্ঞা দ্বারা কেবলমাত্র 'সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধারা'ই মুক্তিযোদ্ধা বলে বিবেচিত হতেন।
সরকারি গেজেট দ্বারা অনুমোদিত উক্ত মুক্তিযোদ্ধা সংজ্ঞা যা অদ্যাবধি কোনো সরকার স্থগিত বা বাতিল করেছে বলে জানা যায়নি। অপরদিকে উক্ত মুক্তিযোদ্ধা সংজ্ঞা বহাল থাকা অবস্থায়, সেটিকে বাইপাস করে অতীতে বিএনপি-জামায়াত সরকার ২০০১-২০০৫ সাল পর্যন্ত কোনো প্রকার সংজ্ঞা বা নির্দেশিকা প্রণয়ন না করেই, বলা চলে, গায়ের জোরে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্ক নেই এমন প্রায় ৪০ হাজার অমুক্তিযোদ্ধা এমনকি রাজাকার আলবদর ও আলশামসদের মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে ফেলে! এ-বিষয়টি নিয়ে পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ একাধিক মন্ত্রী-এমপি জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে একাধিকবার এ-অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন। তারা ঘোষণাও করেছিলেন যে, তারা ক্ষমতায় এলে এসব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের উচ্ছেদ করবেন। কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারা ঐসব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের উচ্ছেদ দূরের কথা, তারাও বঙ্গবন্ধুর মুক্তিযোদ্ধা সংজ্ঞা পাশ কাটিয়ে বরং ২০১৬ সালে একটি গোঁজামিল সংজ্ঞা প্রণয়ন করে। তারা বিএনপি আমলের জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল তথা জামুকা নামক একটি কর্তৃপক্ষের অনুকরণ করে সেই গোঁজামিল সংজ্ঞায় অর্থের বিনিময়ে, আত্মীয়তা ও রাজনৈতিক বিবেচনায়, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, এমন সব অমুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে দেয়ার সর্বনাশা অপকর্মে লিপ্ত ছিলো!
আওয়ামী লীগ সরকারের ২০১৬ সালে প্রণীত মুক্তিযোদ্ধা সংজ্ঞায় বলা হয়েছে : "যে সমস্ত জনগণ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের সময়ের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন" তারা মুক্তিযোদ্ধা বলে পরিগণিত হবেন- যেটির মূল ঘোষণা নিম্নরূপ:(2016) : The people who were involved in the liberation war in response to the call of the Father of the Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman in between March 26 and December 16, 1971.
এ সংজ্ঞার বদৌলতে "মুক্তিযোদ্ধা"র বাইরে অন্য যেকোনো ব্যক্তিরাও মুক্তিযোদ্ধা বলে বিবেচিত হবেন যা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে চরম অবমূল্যায়ন করার একটি অমার্জনীয় অপরাধ। এ মুক্তিযোদ্ধা সংজ্ঞার নামে যেটা করা হয়েছে, আসলে তা মুক্তিযোদ্ধা সংজ্ঞা নয়, এতে মুক্তিকামী জনগণের কথা বলা হয়েছে। এ সংজ্ঞা দিয়ে আসলে যাকে-তাকে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর একটা ফরমুলা বের করা হয়েছে!
মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র, ফোর্স ও যুদ্ধ জড়িত- যেটি ৭২ সালে বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত মুক্তিযোদ্ধা সংজ্ঞার 'ফোর্স' শব্দিটির মধ্যে মূর্ত হয়ে ফুটে উঠেছে, কিন্তু ২০১৬ সালের প্রণীত মুক্তিযোদ্ধা সংজ্ঞার মধ্যে ঐ প্রশিক্ষণ, অস্ত্র, ফোর্স ও যুদ্ধের কথা নেই। সুতরাং এটা মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নয়, এটা মুক্তিকামী জনগণের সংজ্ঞা বলাই যুক্তিযুক্ত। তাইতো স্বাধীনতার ৫৩ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরেও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কহীন, এমনকি স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার আলবদররাও অর্থ আত্মীয়তা ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে 'বীর মুক্তিযোদ্ধা' বনে যাচ্ছে! অতীতে ভুয়াদেরকে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের একশ্রেণীর চেতনাহীন মুক্তিযোদ্ধা, আর সাম্প্রতিক অতীতে বানিয়েছে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল তথা জামুকার সদস্যরা। তাদের হাত দিয়েই ৮/১০ বছরের শিশুসহ মুক্তিযুদ্ধের সময় পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থান করে আমাদের মিত্রবাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ-করা পাকিসৈনিকও বীর মুক্তিযোদ্ধা বনে গেছে!
পূর্ববর্তী কোনো একটি সরকারের কোনো একটি গেজেটীয় আদেশ পরবর্তীকালীন কোনো একটি সরকার বহাল রেখে, সেটিকে বাইপাস করে একই প্রসঙ্গে নিশ্চয়ই আরেকটি গেজেট জারি করতে পারেন না! এমনটি করা হলে সেখানে সরকার বা শাসকগোষ্ঠীর সংকীর্ণ ব্যক্তি ও রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থের করার সুযোগ থাকে বলে প্রতীয়মান হয় যা রাষ্ট্রীয় লুকোচুরির সামিল! তাছাড়া একই বিষয়ের ওপরে দু'টি রাষ্ট্রীয় গেজেট আইনসম্মত নয় বলেও মনে হয়।
সুতরাং মুক্তিযোদ্ধা সংজ্ঞা নিয়ে যা হয়েছে তাকে রাষ্ট্রীয় জোচ্চুরিও বলা যেতে পারে। এটা রাষ্ট্রীয় বিভ্রান্তিও বটে। কোনো সভ্য সরকার বা রাষ্ট্র তার জন্মদাতাদের সংজ্ঞা ও মর্যাদাকে অবমূল্যায়ন করার এমন ন্যক্কারজনক আত্মঘাতী অপকর্ম করতে পারে, তা ভাবনার অতীত! জাতীয় মর্যাদা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, চেতনা, সভ্যতা ও ভব্যতার স্বার্থে এ লুকোচুরির অবসান হতেই হবে।
লেখক :মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও গবেষক।
পাঠকের মতামত:
- জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে এনসিপির বিক্ষোভ
- ডেঙ্গুতে আরও ছয়জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৬৫৫
- হারানো ঐতিহ্য ফিরল বেতনায়, ২৫ বছর পর নৌকা বাইচ
- ‘মাদ্রাসা ছাত্ররা দেশ রক্ষায় একযোগে এগিয়ে এসেছে’
- ‘নিষিদ্ধ ঘোষিত আ.লীগ পরিকল্পিতভাবে দেশকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা চালাচ্ছে’
- কাপ্তাইয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সামগ্রী উপহার দিল ১১ আর ই ব্যাটালিয়ন
- জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহারের দাবি শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলুর
- লার্নিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সংস্কৃতির উন্নয়নে অবদান রাখা সহকর্মীদের সম্মাননা দিয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক
- বিএনপি নেতা ফারুক হত্যায় তিনজনের মৃত্যুদণ্ড, ৪ জনের যাবজ্জীবন
- আদমদীঘিতে বাবার চেয়ে মেয়ের বয়স বেশি! বিড়ম্বনায় বাবা- মেয়ে
- গ্যালাক্সি এ৩৭ ৫জি ও গ্যালাক্সি এ৫৭ ৫জি-তে স্যামসাংয়ের ক্যাশব্যাক অফার
- বাগেরহাটে প্রতিপক্ষের হামলায় ছেলে নিহত, বাবা আহত
- আন্তর্জাতিক বাজারে ওয়ালটনের মতো দেশীয় ব্র্যান্ডকে আরও তুলে ধরতে হবে: রাষ্ট্রদূত
- কোটালীপাড়ায় বিএনপির বিক্ষোভ সমাবেশ
- ফরিদপুরে ১৪ বছরের সাজাপ্রাপ্ত কুখ্যাত ডাকাত গ্রেফতার, ২টি অস্ত্র উদ্ধার
- ট্রায়াল অব সূর্যসেন’র বিশেষ প্রদর্শনী, সংগীতানুষ্ঠান ও চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন
- খাদ্যের অপচয় রোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ
- নড়াইলে আওয়ামী লীগের আলোচিত ইউপি চেয়ারম্যান লাবু মিয়া গ্রেপ্তার
- প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী ঝালকাঠির ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার
- কাশিয়ানীতে ১২টি জলাশয়ে ২৮৬ কেজি মাছের পোনা অবমুক্ত
- ঈশ্বরগঞ্জে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস পালিত
- রেফ্রিজারেটরের যে যত্নগুলো নেয়া প্রয়োজন
- কলাপাড়ায় পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে ইন্টারনেট লাইনম্যানের মরদেহ উদ্ধার
- গোপালগঞ্জে পূবালী ব্যাংক পিএলসি’র ইলেকট্রনিক বুথ
- জ্বালানির দাম বাড়ানো সংকট সামলায়, কৌশল তৈরি করে না
- ফরিদগঞ্জে বসতঘর থেকে যুবকের মরদেহ উদ্ধার
- সাংবাদিকতায় ৬৮ বছর এবং স্মৃতিকথা
- বাউফলে ইসলামী ব্যাংক এজেন্ট শাখার দু'জন মহিলাকে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে অচেতন করার অভিযোগ
- পটুয়াখালীর উত্তর বাউফলে ঝুঁকিপূর্ণ ব্রীজ, দুর্ভোগে সাধারণ মানুষ
- ইভটিজিংযের প্রতিবাদ করায় শিক্ষকের ওপর বখাটে যুবকদের হামলা, শাস্তির দাবি
- কলাপাড়ায় সৌর শক্তির রান্নার চুলার ব্যবহার বিষয়ক অবহিতকরণ কর্মশালা
- রিমান্ড শেষে কেএনএফের ২ সদস্য কারাগারে
- কলাপাড়ায় আবাসিক হোটেল থেকে সাবেক বন কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধার
- সিলেট নগরীতে জলাবদ্ধ এলাকায় খাবার পানির সংকট
- ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’র শুরুটা আশা জাগানিয়া
- কলাপাড়ায় জীবন রক্ষায় প্রস্তুতি-দূর্যোগ মোকাবেলায় কমিউনিটি শক্তির জাগরণ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত
- তালতলীতে সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার মামলা
- বরগুনা প্রেসক্লাবে তালাবদ্ধ করে সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ
- ভৈরব বাজার মেঘনার পাড়ে নদী ভাঙন
- গলাচিপায় অধিকাংশ আশ্রয়ণকেন্দ্রে এখন গরু-ছাগলের বসবাস
- বাঘের খাঁচায় মুক্তিযোদ্ধা!
- ফাল্গুন
- ধর্ষকদের বিরুদ্ধে কলাপাড়ায় ছাত্র জনতার লাঠি মিছিল
- স্মরণ সভায় সম্মাননা পেলেন সাংবাদিক পরিবারের সদস্যরা
- মোড়লের ক্ষমতা আর নেই, বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
-1.gif)








