E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয় স্থাপন মানবাধিকার রক্ষায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

২০২৫ আগস্ট ২৯ ১৭:৪২:৫৭
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয় স্থাপন মানবাধিকার রক্ষায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

নীলকন্ঠ আইচ মজুমদার


সম্প্রতি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার মিশন। চলছে পক্ষে বিপক্ষে অবস্থান নেয়া। তবে নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় এটা আবার একটু ভাটা পড়েছে। আমরাও এসব আলোচনা সমালোচনার  মধ্যেই আছি। কেউ বুঝে আর কেউ না বুঝেই সমালোচনার ঝড় তুলছি তার অন্যতম কারণ দলীয় চিন্তা ভাবনা। জাতিসংঘের এই পদক্ষেপ গুলো কেন নেওয়া হয় বা কোন জায়গায় নেওয়া হয় তার কারন কিন্তু আমরা অনুসন্ধান করি না। পক্ষে বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পায় দলীয় চেতনাবোধ। যদিও বড় দলগুলো এখন বড় আকারে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না এখনও। আবার নির্বাচন যদি ফেব্রুয়ারিতে হয় তাহলে হয়তো একবারেই ধামাচাপা পড়ে যেতে পারে। মানবাধিকার কমিশন শব্দটা শুনলেই আমরা হুমড়ি খেয়ে পড়ি কিন্তু এর কার্যক্রম নিয়ে আমরা চিন্তা করি না। তবে এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে সমস্যা হলো জাতিসংঘের অনেক কার্যক্রমকে আমারা বিশ্বাস করতে পারি না বা চাচ্ছি না এর অন্যতম কারন হলো জাতিসংঘের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সখ্যতা।

জাতিসংঘ তাদের কার্যক্রমে প্রমান করেছে জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র এক ও অভিন্ন। নিজেদের কথাগুলো জাতিসংঘরে মুখ দিয়ে বের করে নেয় কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘকে মনে হয় যুক্তরাষ্ট্রের মুখপাত্র এজন্য এর প্রতি আস্থা এবং বিশ্বাস পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষেরই কমে আসছে। তথাপি পররাষ্ট্র নীতিতে কৌশলী হওয়াই সরকারের কাজ। তাই আবেগে বিবেচনা না করে বাস্তবতার নিরিখেই হয়তো সিদ্ধান্ত নিবে সরকার। কারণ বেশ কয়েকটি ইসলামী দল ইতোমধ্যে এই কমিশনের কার্যালয় স্থাপনের ক্ষেত্রে জোড়ালো বিরোধিতা করে আসছে। এখন জানা দরকার আসলে এই কমিশনের কাজই বা কি ? কোথায় এর কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় এবং কেন করা হয়? বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে থাকে জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশন।

তবে সব দেশে তাদের নিজস্ব কার্যালয় নেই। বর্তমানে বিশ্বের মাত্র ১৬টি দেশে সংস্থাটির কার্যালয় রয়েছে। এসব দেশের বেশিরভাগই গৃহযুদ্ধকবলিত বা সন্ত্রাসবাদে পর্যুদস্ত। এই দেশগুলো হচ্ছে কম্বোডিয়া, সুদান, ইয়েমেন, শাদ, কলম্বিয়া, গুয়াতেমালা, গিনি, হন্ডুরাস, লাইবেরিয়া, মৌরিতানিয়া, মেক্সিকো, নাইজার, তিউনিসিয়া, ফিলিস্তিন, সিরিয়া ও বুরকিনা ফাসো। এছাড়াও দক্ষিণ কোরিয়া ফিল্ড অফিস ও ইউক্রেনে একটি ছোট মিশন অফিস রয়েছে। তবে সংস্থাটির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সাল পর্যন্ত সংস্থাটি বিশ্বের ৪৩টি দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে এর মাঝে বাংলাদেশও রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানের সময় যে হত্যাকান্ড হয়েছিল তা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির জন্য ওই বছরের সেপ্টেম্বরে হাইকমিশনের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে এসেছিলেন। এখন আলোচনার বিষয় হলো এই মানবাধিকার হাই কমিশনের কাজ কি ? এটা কতটুকু স্বাধীনভাবে কাজ করে ? এইসব প্রশ্নের উত্তরগুলো জানা একান্ত আবশ্যক। জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশন এমন একটি সংস্থা যার মুল কাজ হলো বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার রক্ষা, এ সংক্রান্ত প্রচার ও বাস্তবায়নে সহায়তা করা।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির তথ্য সংগ্রহ করে, পর্যালোচনা করে এবং প্রতিবেদন তৈরির মাধ্যমে সবার সামনে নিয়ে আসে এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সম্মেলনে তুলে ধরা হয়। এর ফলে বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে অন্যান্য দেশ জানতে পারে। ফলে বিভিন্ন দেশে অন্যান্য দেশের সাথে কি রকম সম্পর্ক তৈরি করবে তার রুপরেখা প্রণয়ন করে থাকে। এর সাথে নির্ভর করে এক দেশের সাথে অন্যদেশের সম্পর্ক, বিনিয়োগ ও অনুদান। তাই একথা বলার অবকাশ রাখে না যে, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নির্যাতন, বৈষম্য, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ, নারী ও শিশুদের অধিকার লঙ্ঘনের মতো বিষয়গুলোতে তদন্ত ও প্রতিবেদন তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে এ কমিশন। এই কমিশনের কার্যালয় না থাকলেও বিশেষ টিম প্রেরণের মাধ্যমেও তারা প্রতিবেদন তৈরি করে থাকে। প্রতিবেদন তৈরি হলে তা প্রকাশ করে সুপারিশও করা হয়ে থাকে তবে এ সুপারিশ মানা কোন রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক নয়।

এ বিষয়ে প্রধান উদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “মিশনটির লক্ষ্য হচ্ছে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সংগঠনগুলোকে প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি সহায়তা প্রদান। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে সক্ষমতা বৃদ্ধি, আইনি সহায়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে মানবাধিকার সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা পূরণে সহায়তা করা।” অন্যদিকে মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বাংলাদেশে এই দপ্তর চালু হলে এখানকার মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতির জন্য তা সহায়ক হবে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের অফিস এবং বাংলাদেশ সরকার তিন বছর মেয়াদী একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে। তবে এ নিয়ে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি হওয়ার পিছনে অন্যতম কারন হলো এ নিয়ে না জানা এবং সরকারের একটি লুকোচুরি ভাব। আমরা এখনও এর লাভক্ষতি নিয়ে অন্ধকারে রয়ে গেছি। অনেকেই আমরা ভাবছি অন্যের খবরদারি চলে আসবে। দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি যতই খারাপ হোক না কেন কোন সরকারের আমলেই আমরা তা মানতে চাই না।

আমরা মনে করি সরকারের বিরুদ্ধে অতিরঞ্জিত করে প্রকাশ করা হচ্ছে অন্যদিকে এসব নেগেটিভ প্রতিবেদন নিয়ে বিরোধী পক্ষের হইচই সবসময় লেগেই থাকে। আমাদের দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্র সবসময়ই উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। বিশেষ করে বিগত সরকারের আমলে গুম, বিচারবর্হিভূত হত্যা, বেআইনী আটক, প্রেফতার হয়রানীর বহু অভিযোগ ছিল কিন্তু সরকার এবিষয়ে কোন পাত্তাই দেয় নাই। বর্তমান সরকারের কথা হলো এই কার্যক্রম যদি তখনকার সময় চালু থাকতো তাহলে হয়তো অনেক বিচারেরই সঠিক তদন্ত হতো এবং বিচারও হতো। প্রকৃত বিষয় হলো মানবাধিকার কমিশন অনেক ক্ষেত্রেই যে রিপোর্ট প্রণয়ন করে থাকে তা চলে যায় সরকারের বিরুদ্ধে তখন সরকার তা নিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করে থাকে। একদিকের কথা হলো যেহেতু রিপোর্টের সুপারিশ মানতে বাধ্য নয় তাই এটা নিয়ে চরমভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করাও বাঞ্চনীয় নয় কারন আমাদের দেশের মানুষ এগুলো দ্রুত ভুলে যায় এবং সব অপরাধ দেখে রাজনৈতিক বিবেচনায়।

সরকারে যেই থাকেন তারা মানবাধিকারের বিষয়গুলো খুব একটা গুরুত্ব দেন বলে হয় না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লোক দেখানো কাজ সারেন। যদি মানবাধিকারের বিষয়গুলো আমরা শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম তাহলে এই কমিশন নিয়ে এত আলোচনার কোন মানে থাকতো না। এটা স্বভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবেই গন্য করা হতো এবং এই কমিশনের কার্যালয়ও এখানে স্থাপনের প্রয়োজন হতো না। তবে আমরা এমন এক ধরনের জাতি তারা যেকোন বিষয় নিয়ে লঙ্কাকান্ড ঘটাতে জানি এবং দ্রুত এগুলো ভুলেও যেতে জানি। তাই ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে এর কার্যক্রমের দিকে নজর রাখা এবং মানবাধিকার যেন লঙ্ঘিত না সে দিকটা বিবেচনায় নেওয়া। কারন দেশের ভিতরে এবং বাইরে সবদিক দিয়েই দেশকে অস্থিতিশীল করার য়ড়যন্ত্র চলে আসছে। এই কমিশনের রিপোর্টের কারনে অন্যান্য দেশের সাথে সম্পর্ক বিনষ্ট হতে পারে যার ফলে দেশের বিভিন্ন সেক্টর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে পারে।

লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক।

পাঠকের মতামত:

২৯ আগস্ট ২০২৫

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test