E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

আধুনিক দাসত্বের শিকল ভাঙার বৈশ্বিক প্রয়াস

২০২৫ নভেম্বর ৩০ ১৮:৩২:২৯
আধুনিক দাসত্বের শিকল ভাঙার বৈশ্বিক প্রয়াস

ওয়াজেদুর রহমান কনক


মানুষের ইতিহাসে স্বাধীনতা ছিল জন্মগত অধিকার, কিন্তু যুগে যুগে শক্তি, অর্থ ও ক্ষমতার নামে সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। দাসত্ব, জবরদস্তি শ্রম, মানব পাচার, যৌনশোষণ, ঋণবন্ধক শ্রম, বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম—এগুলো কেবল অপরাধ নয়; এগুলো মানবজাতির বিবেকের উপর এক গভীর অগ্নিদাহ, যেখানে মানুষকে পণ্য, সম্পদ বা শ্রমশক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সভ্যতার অবিরাম অগ্রগতি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ঘোষণার পরও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ আজও আধুনিক দাসত্বের শিকার। এই বাস্তবতায় প্রয়োজন শুধু আইনি নিষেধাজ্ঞা নয়; প্রয়োজন মানবমর্যাদাকে অখণ্ডভাবে প্রতিষ্ঠা করার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক প্রতিশ্রুতি। দাসত্ব বিলোপের আন্দোলন তাই ইতিহাস স্মরণের পাশাপাশি বর্তমান সময়ের মানবিক সংকট উন্মোচন করে, আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে একটি ন্যায্য সমাজ তখনই সম্ভব, যখন প্রতিটি মানুষ জবরদস্তি, ভয়, শোষণ বা নির্যাতনের বাইরে মুক্ত ইচ্ছা ও স্বাধীনতার নিরাপত্তা ভোগ করবে। মানবতার মূল্য যা একদিন কয়েদখানার অন্ধকারে নীরব ছিল, সেই মূল্যবোধকে পুনরুজ্জীবিত করাই হচ্ছে এই সংগ্রামের মূল উদ্দেশ্য—এক এমন পৃথিবী গড়া, যেখানে শোষণ মানুষের বাস্তব নয়, বরং অতীতের লজ্জাজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে। 

আন্তর্জাতিকভাবে ২ ডিসেম্বরকে দাসপ্রথা বিলোপ দিবস হিসেবে পালনের কারণ হলো — ১৯৪৯ সালের ২ ডিসেম্বর United Nations General Assembly (সংযুক্ত জাতিসংঘ সাধারণ সভা) একটি আন্তর্জাতিক কনভেনশন (Convention for the Suppression of the Traffic in Persons and of the Exploitation of the Prostitution of Others) গ্রহণ করে, যা দাসপ্রথা ও মানুষের পাচার, জবরদস্তি শ্রম, যৌনশোষণ ইত্যাদির বিরুদ্ধে আইনগত প্রতিশ্রুতি নেয়। তারপর ১৯৯৫ সালে এই দিনকে বার্ষিকভাবে “আন্তর্জাতিক দাসপ্রথা বিলোপ দিবস” হিসেবে ঘোষণার মাধ্যমে, বিশ্বজুড়ে দাসপ্রথা এবং আধুনিক দাসত্বের বিরুদ্ধে সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়।

দ্বীতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ঔপনিবেশিক যুগের ইতিহাসে দাসপ্রথা — মানব মৌলিক অধিকারের ইতিহাসের এক কালিমালিপ্ত অধ্যায়। ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক দাসবাণিজ্য, ঔপনিবেশিক শোষণ, শ্রম শুদ্ধিকরণের নাম করে মানুষকে ক্রীতদাস হিসেবে ব্যবহারের ইতিহাস আজও বিশ্বের অনেক সমাজে তার ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রতিফলন রাখে। এমনকি ঐতিহাসিক দাসপ্রথা বিলোপ হলেও, মূল কারণ — ক্ষমতার অসম বণ্টন, গরিবত্ব, বৈষম্য, আর আইনগত/সামাজিক শূন্যস্থান — এখনো থেকে গেছে।

এই দিন সেই ইতিহাসকে স্মরণে রাখে, দাসপ্রথার কুফল ও অন্যায় চিত্র পুনরায় সামনে আনে, এবং আধুনিক দাসত্ব ও মানবপাচার প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক ঐক্য ও সামাজিক দায়বোধ পুনরুজ্জীবিত করে — এটি এক প্রকার নৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক পুনর্জাগরণ।

১৯শ শতাব্দীর দাসবাণিজ্য ও ক্রীতদাসপ্রথা হয়তো আইনগতভাবে বিলোপ হয়েছে; কিন্তু আজ “দাসত্ব” বা “বাধ্যতামূলক শ্রম, পাচার, মানুষ বিক্রি, জবরদস্তি শ্রম, বাল্যবিবাহ, শিশু শ্রম, যৌনশোষণ” — এমন নানা রূপে বিদ্যমান রয়েছে। এইসবকে একত্রে “আধুনিক দাসত্ব” বা “নতুন দাসত্ব” বলা হয়।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা International Labour Organization (ILO)–র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৫০ মিলিয়ন মানুষ আজও আধুনিক দাসত্বের শিকার; যার মধ্যে প্রায় ২৮ মিলিয়ন বাধ্যতামূলক শ্রমে (forced labour) এবং ২২ মিলিয়ন বাধ্যতামূলক বিবাহ বা যৌন-শোষণের শিকার। অন্যান্য তথ্য-উল্লেখযোগ্য: প্রায় ৮৬% বাধ্যতামূলক শ্রমের ঘটনা ভিন্ন খাতের; অর্থাৎ শিল্প, গার্মেন্ট, কৃষি, গৃহপরিচর্যা, নির্মাণ কাজ ইত্যাদি ক্ষেত্রে।

এবং যারা যৌনশোষণ বা বাণিজ্যিক যৌন শ্রমের শিকার — তাদের মধ্যে প্রায় ৮০% নারী বা মেয়ে। শিশু শ্রম, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রমিকদের যৌন বা গৃহকর্মে নিযুক্তি, শিশুপাচার — সবই আধুনিক দাসত্বের অংশ। শিশু শ্রম এবং শিশুশোষণকে বন্ধ করা তো পুরোপুরি আজও সম্ভব হয়নি।
প্রথমত — অর্থনৈতিক গ্লোবালাইজেশন, গার্মেন্ট ও ফ্যাক্টরি বৃদ্ধি, মাইগ্রেশন, জলবায়ু পরিবর্তন, উদ্বাস্তু আন্দোলন — এই সব কারণে ভুক্তভোগীর সংখ্যা বাড়ছে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, অভিবাসনপ্রবণ মানুষ, গরিব ও অস্বচ্ছল পরিবার — যাদের জীবিকায় কখনো নিরাপত্তা বা চলমান আয় নেই, তারা সহজেই মানুষের পাচার, ঋণ বন্ধি, জবরদস্তি শ্রম বা বাল্যবিবাহের ফাঁদে পড়ে।
দ্বিতীয়ত — দাসত্ব আজ শুধু “শারীরিক শেকল” বা “ক্রীতদাস পাটির” মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি গোপন, সংবেদনশূন্য, দীর্ঘমেয়াদী এবং প্রায়ই আইনগতভাবে “আধুনিক ব্যবসা” বা “শ্রম কেন্দ্র” হিসেবে ঢেকে থাকে। পন্থা বদলেছে— কিন্তু উদ্দেশ্য একই: সুবিধা অর্জন অর্থ ও ক্ষমতায়, মূল্যবোধের বা মানবাধিকারের মূল্য নয়।

তৃতীয়ত — আইনগত নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তবায়ন প্রায়ই ব্যর্থ হয়। অনেক দেশে, অনেক সময় এমন আইন থাকলেও দুর্নীতি, প্রশাসনিক ঘোড়া, অপর্যাপ্ত কর্মসংস্থান, বৈষম্য—এসব কারণে মানুষ দাসত্বের ফাঁদে আটকে যায়। আইন শুধু মোরাল ডিক্লারেশন নয়; বাস্তবায়ন, সামাজিক সচেতনতা, অর্থনৈতিক সুরক্ষা এবং ন্যায্য বিকল্প কর্মসংস্থানই বিকল্প হতে হবে।

চতুর্থত — দাসত্ব শুধু ব্যক্তির ক্ষতি নয়; এটি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বড় ক্ষতি করে। যারা বাধ্যতামূলক শ্রমে নিযুক্ত, তারা প্রায়শই স্বল্প মজুরি, অস্বাস্থ্যকর কাজের পরিবেশ, শিক্ষার অভাব, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার। এর ফলে সামাজিক বৈষম্য, দারিদ্র্য, পরিবারের ভাঙন, শিশু শিক্ষা-অযোগ্যতা এবং লিঙ্গগত বৈষম্য গভীর হয়।

এই দিনে বিশ্বজুড়ে মিডিয়া, একাডেমিয়া, সুশীল সমাজ, ন্যায্যধারী প্রতিষ্ঠানে আলোচনার সময় হয়: ইতিহাস, মানবাধিকার, অর্থনীতি, শ্রমনীতি, বৈষম্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে। অনেক সময় নতুন নীতি, আইন বা স্থানীয় উদ্যোগও গঠন হয়। এদিন আমাদের স্মরণ করতে হয় যে: দাসত্ব শুধু “পুরনো কালে” ছিল — এমন ভুল ধারণা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করা জরুরি। ৫০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ আজ দাসত্বে জীবন কাটিয়ে যাচ্ছে। যারা গরিব, শ্রমজীবী, অভিবাসী, প্রান্তিক — তারা এখনো শোষণের শিকার।

২ ডিসেম্বর শুধুই একটি স্মরণদিবস নয়; এটি একটি সামাজিক অ্যালার্ট, একটি ন্যায্য অধিকারের দাবি এবং আমাদের সাধারণ ন্যায়, মানবতা ও সম্মান বজায় রাখতে চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতি। দাসত্ব দমন না হলে — উন্নয়ন, শান্তি ও ন্যায্যতার স্বপ্ন কখনো পূরণ হবে না।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

৩০ নভেম্বর ২০২৫

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test