E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

১৯ দিনে ৭ হিন্দু খুন 

২০২৬ জানুয়ারি ০৯ ১৭:৩৫:৪৩
১৯ দিনে ৭ হিন্দু খুন 

শিতাংশু গুহ


১৯ দিনে ৭ খুন। শুরু ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ভালুকার দিপু চন্দ্র দাস-র ঘটনা দিয়ে। শেষ ৬ জানুয়ারি ২০২৬ যশোরের মনিরামপুরে ব্যবসায়ী-সাংবাদিক রানা প্রতাপ বৈরাগীকে গুলি করে হত্যার মাধ্যমে। একই দিন নওগাঁয় মিঠুন সরকার গণপিটুনি থেকে বাঁচতে পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে মারা যায়। একদিন আগে, ৫ জানুয়ারি নরসিংদীর ব্যবসায়ী মনি চক্রবর্তীকে দুর্বৃত্ত কুপিয়ে হত্যা করে।

মৃত্যু’র এ কাফেলা শেষ হয়ে গেছে ভাবার কোন কারণ নেই, যেকোন সময় তৌহিদী জনতা ধর্ম রক্ষায় বা হাতে লালসুতা বাধা দেখলে হিন্দুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, কারণ বাংলাদেশে হিন্দু মারতে যেকোন একটা অজুহাত হলেই চলে। কিন্তু কতকাল এভাবে চলবে? দেশে সরকার, প্রশাসন, মিডিয়া, আদালত, জনতা কিছুই হিন্দুর পক্ষে নয়!

বাংলাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত ভয়ের মধ্যে বসবাস করছে। ভয়ের মধ্যে থেকে একটি জাতি টিকে থাকতে পারেনা। বাঁচতে হলে হিন্দুদের প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া রাস্তা নেই। বঙ্গবন্ধু’র ভাষায়, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল, যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রু’র মোকাবেলা করতে হবে। ২০২৫-র শেষটা দিপু’র অমানবিক হত্যাকাণ্ডে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করেই কেটেছে।

বছরের প্রথম দিনেও ঘুম থেকে উঠে দেখি, খোকন দাস, ৫০ আক্রান্ত, তার দেহে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। আর একজন হিন্দুকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা। খোকনকে ওঁরা পিটিয়েছে, আগুন দিয়েছে। জীবন বাঁচাতে খোকন জলে ঝাঁপ দেয়। হাসপাতালে ৩ জানুয়ারী সব শেষ, খোকন মারা যায়। স্ত্রী সীমা রানী দাস বলেছেন, ওঁরা আমার স্বামীকে পুড়িয়ে মেরেছে, হাসপাতালে ৩দিন ওর কষ্ট আমি দেখেছি, এদৃশ্য আমি ভুলবো কিভাবে?

জীবন বাঁচাতে মিঠুন সরকারও ২৫ পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছিলো, বাঁচতে পারেনি, ও তলিয়ে যায়। পরে দমকল এসে ওর মৃতদেহ উদ্ধার করে। ঘটনা ৬ই জানুয়ারীর। নওগাঁর মহাদেবপুরে একদল লোক ওকে ‘চোর চোর’ বলে ধাওয়া করে। আদৌ মিঠুন চুরি করেছিলো কিনা কেউ জানেনা। উন্মত্ত জনতার হাত থেকে বাঁচতে মিঠুন পুকুরে ঝাঁপ দেয়, শেষ। ওর বাবা বধির, একমাত্র ছেলে হারিয়ে দিশেহারা।

রানা প্রতাপ বৈরাগীকে গুলি করে হত্যা করা হয় যশোরের মনিরামপুরে ৬ই জানুয়ারি ২০২৬। বৈরাগী একাধারে ব্যবসায়ী এবং ‘দৈনিক বিডি খবরের’ এক্টিং এডিটর। ঠিক একদিন আগে ৫ই জানুয়ারি হত্যা করা হয় ব্যবসায়ী মনি চক্রবর্তীকে। নিহত মণি নরসিংদির বাসিন্দা। তার একটি মুদি দোকান ছিল। দোকানেই আচমকা ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পরে কিছু সন্ত্রাসী। হাসপাতাল নেয়ার পথে তার মৃত্যু ঘটে।

ব্রজেন্দ্র বিশ্বাস ৪২ নিহত হন তার সহকর্মীর হাতে। তিনি একটি গার্মেন্টে নিরাপত্তা কর্মী ছিলেন। ঘটনা ময়মনসিংহের ভালুকার লাবিব গ্রূপ ফ্যাক্টরীতে, ২৮শে ডিসেম্বর ২০২৫। ঘাতক সহকর্মীর নাম নোমান মিয়া, ২৯। নোমান মিয়া সহকর্মী ব্রজেন বিশ্বাসকে বলে, ‘তোকে গুলি করে দেই’? পরক্ষনে নোমানের গুলিতে ব্রজেন দাস নিহত হ’ন। উভয়ে আনসার বাহিনীর সদস্য।

অমৃত মন্ডল সম্রাট ৩০ নিহত হ’ন বুধবার ২৪শে ডিসেম্বর ২০২৫। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ছিলো। ঘটনা রাজবাড়ীর। একদল উন্মত্ত জনতা তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। এরআগে ১৮ই ডিসেম্বর তোহিদি জনতা ইসলাম ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অজুহাতে ভালুকার গার্মেন্ট শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে প্রথমে গণপিটুনি, তারপর টেনে-হেঁচড়ে তাকে একটি গাছে ঝুলিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারে।

তবে গোবিন্দ বিশ্বাসের কপাল ভাল, বেদম গণপিটুনি খেয়েও তিনি বেঁচে যান। ঘটনা ১৯শে ডিসেম্বর ২০২৫, ঝিনাইদহে। গোবিন্দ রিক্সা চালায়, তার হাতে একটি লালসুতা বাঁধা ছিলো, যা হিন্দুরা অনেক সময় পূজা-পার্বনে পরে থাকে, অমিতাভ বচ্চনের হাতে এটি দেখা যায়। গোবিন্দের হাতে লালসুতা দেখে তৌহিদী জনতা ভাবলো, ‘র’-এর এজেন্ট, ভারতীয় গুপ্তচর। ব্যস, গণধোলাই শুরু, পুলিশ এসে তাকে বাঁচায়।

কালীগঞ্জের হিন্দু বিধবার ওপর পৈশাচিক নির্যাতনের কাহিনী দিয়ে লেখাটা শেষ করবো। মহিলা ছোট পুত্র নিয়ে থাকেন। দুই মুসলিম লোক তাকে ধর্ষণ করে। এরপর তারা মহিলার বিরুদ্ধে অপবাদ দিয়ে তাকে গাছে বেঁধে চুল কেটে দেয়। এ ভিডিও তারা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। মহিলার নাম প্রকাশ করা হয়নি, বয়স ৪০, অভিযুক্ত একজনের নাম শাহীন, অন্যজন তার সঙ্গী। মহিলার বাড়িতেই পুত্রকে অন্য ঘরে আটকে রেখে ধর্ষণের ঘটনা ঘটানো হয়। এই হচ্ছে আজকের বাংলাদেশ।

লেখক : আমেরিকা প্রবাসী।

পাঠকের মতামত:

১১ জানুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test