E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

বার কাউন্সিলের রিভিউ ফল বাতিল প্রশাসনিক ন্যায়ের ব্যত্যয়

২০২৬ জানুয়ারি ১১ ১৭:২৬:২২
বার কাউন্সিলের রিভিউ ফল বাতিল প্রশাসনিক ন্যায়ের ব্যত্যয়

অ্যাডভোকেট মু. শরীফুল ইসলাম


বাংলাদেশ বার কাউন্সিল কর্তৃক আইন পেশায় অন্তর্ভুক্তির লিখিত পরীক্ষার রিভিউ ফল বাতিলের সিদ্ধান্তকে প্রশাসনিক ন্যায়ের ব্যত্যয় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, পূর্বঘোষিত নীতিমালা অনুসরণ না করেই রিভিউ পরীক্ষার ফল বাতিল করা হয়েছে, যা পরীক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার ক্ষুণ্ণ করেছে। আমরা জানি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ন্যায্য প্রক্রিয়া, যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা ও স্বচ্ছতা অপরিহার্য। এসব নীতি অনুসরণ না করে ফল বাতিল করা হলে তা খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হতে পারে। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের রিভিউ ফলাফল বাতিলের ক্ষেত্রেও এই ঘটনা ঘটেছে।

এই সংকটের শুরু হয় মূলত বার কাউন্সিল প্রদত্ত একটি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। ২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর বার কাউন্সিল লিখিত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হয়। যে ফলাফলে ৭,৯১৭ জন পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হন। কিন্তু ফল প্রকাশের পর অনেক পরীক্ষার্থীই দাবি করেন যে, তারা পরীক্ষায় পাস করার মতো ভালো পরীক্ষা দিয়েছেন কিন্তু প্রকাশিত ফলাফলে তাদের রোল নম্বর আসেনি। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ অক্টোবর বার কাউন্সিল একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে খাতা রিভিউয়ের আবেদন আহ্বান করে। নির্ধারিত বিধি ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আবেদন গ্রহণ ও পর্যালোচনা শেষে ১৮ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও এনরোলমেন্ট কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে রিভিউ ফলাফল প্রকাশ করে। এই রিভিউ ফলাফলে ১,৯১৪ জন শিক্ষানবিশ আইনজীবীকে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ঘোষণা করা হয়। ফলে তারা পরবর্তী ধাপ ভাইভা পরীক্ষায় অংশগ্রহণের একটি সুস্পষ্ট আইনসম্মত অধিকার এবং বৈধ প্রত্যাশা (Legitimate Expectation) অর্জন করেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, রিভিউ ফলাফল প্রকাশের মাত্র কয়েক দিনের মাথায়, অতি সীমিত সংখ্যক ব্যক্তির আপত্তির প্রেক্ষিতে ২৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে আরেকটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পুরো রিভিউ ফলাফল বাতিল ঘোষণা করে বার কাউন্সিল।

সেখানে তারা উল্লেখ করে যে, ‘রিভিউ আবেদনকারী প্রার্থীগণের মধ্যে যেসব অকৃতকার্য প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় নূন্যতম ৪৭ নম্বর পেয়েছে তাদেরকে ৩ নম্বর গ্রেইস হিসেবে প্রদানপূর্বক বার কাউন্সিল পরীক্ষা-বিধি অনুযায়ী পাস মার্ক নূন্যতম ৫০ বিবেচনা করতঃ সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদেরকে বিগত ১৮-১১-২০২৫ইং তারিখে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে উত্তীর্ণ ঘোষণা করা হয়।’ বিজ্ঞপ্তিতে আরও ঘোষণা করা হয়, ‘ফলে এনরোলমেন্ট কমিটি অদ্য ২৩-১১-২০২৫ইং তারিখের বিশেষ জরুরী সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, বিগত ১৮-১১-২০২৫ইং তারিখে প্রকাশিত রিভিউ ফলাফল বাতিলপূর্বক রিভিউ আবেদনকারী প্রতিটি প্রার্থীর লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র পুনঃমূল্যায়ণ করা হবে।’

এ সিদ্ধান্ত স্পষ্টতই প্রশাসনিক ক্ষমতার অসামঞ্জস্যপূর্ণ (disproportionate) প্রয়োগের শামিল হিসেবে বিবেচিত। কারণ, বার কাউন্সিল পূর্বে বিভিন্ন পরীক্ষায় গ্রেইস দিয়ে অধিক সংখ্যাক পরীক্ষার্থীকে পাস করালেও গ্রেইস দেওয়ার কারণে কখনো ফলাফল বাতিল করেনি। এইক্ষেত্রেও তারা যাদেরকে পাস দেখিয়েছে তাদের ফলাফল অক্ষুণ্ণ রেখে বাকী খাতাগুলো মূল্যায়ন করার সিদ্ধান্ত নিতে পারতো। আমরা জানি, প্রশাসনিক আইনের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো-কোনো কর্তৃপক্ষ যখন আইনানুগভাবে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা প্রকাশ করে, তখন সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে যে প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়, তা যুক্তিসংগত কারণ, স্বচ্ছ তদন্ত ও যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া হঠাৎ করে প্রত্যাহার করা যায় না। এটি প্রাকৃতিক বিচারের একটি মৌলিক অংশ।

এখানেই প্রশ্ন ওঠে- যদি সত্যিই ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রে বিধিগত কোনো ত্রুটি থেকে থাকে, তবে তার সব দায় কেনো কেবল উত্তীর্ণ প্রার্থীদের ওপর চাপানো হবে? রিভিউ উত্তীর্ণ প্রার্থীরা তো গ্রেইস নম্বর প্রদানের মাধ্যমে উত্তীর্ণ ঘোষণার জন্য কোনো প্রকার আবেদন বা প্রার্থনা করেননি। সংশ্লিষ্ট এনরোলমেন্ট কমিটি তাদের স্বতঃপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত, ক্ষমতা ও বিবেচনার ভিত্তিতে প্রার্থীদের প্রত্যেককে ৩ নম্বর গ্রেস প্রদান করে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তীর্ণ ঘোষণা করে। পরীক্ষা গ্রহণ কমিটির উক্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণার মাধ্যমে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের পক্ষে একটি বৈধ অধিকার সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে কোনো প্রকার প্রতারণা, তথ্য গোপন, আইন লঙ্ঘন কিংবা যথাযথ কারণ দর্শানো ও ন্যায্য শুনানির সুযোগ প্রদান ব্যতীত উক্ত উত্তীর্ণ ঘোষণার সিদ্ধান্ত বাতিল করা সংবিধানের ন্যায্যতা ও আইনগত নিশ্চিততার নীতির পরিপন্থী এবং আইনগতভাবে টেকসই নয়।

আরও উদ্বেগজনক হলো- রিভিউ প্রক্রিয়া, মূল্যায়ন ও ফলাফল প্রকাশ সবই বার কাউন্সিলের নিজস্ব সিদ্ধান্ত ও তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়েছে। তারা সেই সিদ্ধান্তের দায় স্বীকার না করে হঠাৎ করে ফলাফল বাতিল করে যা প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর একটি প্রশ্ন তুলে দেয়।

তাছাড়া, সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ এর ১১৫ ধারার এস্টোপেল নীতি অনুযায়ীও বার কাউন্সিল কর্তৃক প্রকাশিত ফলাফল অস্বীকার আইনগত নীতির লঙ্ঘন। কারণ, বার কাউন্সিল যেহেতু আইনসম্মত কর্তৃত্ব ব্যবহার করে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করেছে, সেহেতু তা একটি স্পষ্ট উপস্থাপন হিসেবে গণ্য হয়েছে। তাছাড়া, ফলাফলটি প্রকাশের মাধ্যমে বার কাউন্সিল পরীক্ষার্থীদের এই বিশ্বাসে প্ররোচিত করেছে যে, ফলাফলটি চূড়ান্ত, বৈধ ও কার্যকর; এবং পরীক্ষার্থীরা বার কাউন্সিল কতৃক প্রদত্ত সেই বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে পরবর্তী বাস্তব পদক্ষেপ যেমন- ভাইভা পরীক্ষার জন্য পোশাক-পরিচ্ছদ ক্রয়, কেস ডায়েরী লেখাসহ আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে; ফলে এস্টোপেল নীতির শর্ত অনুযায়ী, বার কাউন্সিল প্রকাশিত ঐ ফলাফলকে অস্বীকার বা বাতিল করতে পারে না।

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল একটি সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান, যার উপর আইন পেশার মান রক্ষা, আইনজীবী তালিকাভুক্তি এবং পেশাগত শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার গুরুদায়িত্ব অর্পিত। এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বার কাউন্সিল কেবল প্রশাসনিক কর্তৃত্বই প্রয়োগ করে না; বরং তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক ন্যায়, স্বচ্ছতা ও আইনের শাসনের মানদ-ে উত্তীর্ণ হওয়াই প্রত্যাশিত। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের আইনজীবী তালিকাভুক্তি লিখিত পরীক্ষার রিভিউ ফলাফল বাতিলের সিদ্ধান্ত আইন ও ন্যায়ের দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের মানবিক প্রভাব আরও গভীর ও উদ্বেগজনক। রিভিউ ফলাফল প্রকাশের পর উত্তীর্ণ শিক্ষানবিশ আইনজীবীরা পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও সহকর্মীদের অবহিত করেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন এবং আদালত প্রাঙ্গণেও তা স্বাভাবিকভাবেই উদযাপন করেছেন। তাই ফলাফল বাতিল হওয়ায় তারা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছেন এবং মানসিকভাবে চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছেন। ব্যাপারটি এমন অবস্থায় চলে গেছে যে, এটি আর নিছক একটি পরীক্ষার ফলাফল সংক্রান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি হাজারো শিক্ষানবিশ আইনজীবীর জীবন, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎকে ঘিরে একটি গভীর মানবিক ও আইনগত সংকটেও রূপান্তরিত হয়েছে।

মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এই রিভিউ উত্তীর্ণ শিক্ষানবিশ আইনজীবীরা বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান এবং এনরোলমেন্ট কমিটির সদস্য, সিনিয়র অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, সুপ্রীম কোর্ট বারের সভাপতি ও বার কাউন্সিলের সদস্য ব্যারিস্টার মাহাবুব উদ্দিন খোকন এবং লিগ্যাল এডুকেশন কমিটির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ বার কাউন্সিলের অ্যাডহক কমিটির সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করলে তারা নিশ্চিত করেছেন যে, রিভিউ উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীদের ফলাফল বহাল রেখে অবশিষ্ট খাতাগুলোর পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। তবে এই প্রতিশ্রুতি যদি বাস্তবায়িত না হয়, তবে পরীক্ষার্থীরা হাইকোর্টে রিট মামলা দায়ের করতে পারে। এইক্ষেত্রে এই এনরোলমেন্ট পরীক্ষার সম্পূর্ণ ফলাফল এবং পরবর্তী পরীক্ষাকে তারা চ্যালেঞ্জ করতে বাধ্য হবেন। এর ফলে বার কাউন্সিলের পরবর্তী পরীক্ষার অপেক্ষায় থাকা প্রায় পঞ্চাশ হাজার আইন পরীক্ষার্থীর পেশাগত জীবন বিপন্ন হতে পারে এবং তাদের পরিবারসহ প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ মানুষ মানসিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর প্রথিতযশা সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্বে গঠিত বার কাউন্সিলের অ্যাডহক কমিটি স্বল্প সময়ের মধ্যেই দায়িত্বশীলতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে। প্রতিকূল বাস্তবতার মধ্যেও তারা বার কাউন্সিলের আইনজীবী নিবন্ধন পরীক্ষার তিনটি ধাপ সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়। এর আগে তারা হাইকোর্ট পারমিশন পরীক্ষাও সফলতার সাথে সম্পন্ন করে। সেই পরীক্ষায় লিখিত পরীক্ষার ফলাফলে অনুত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে বার কাউন্সিলের এই অ্যাডহক কমিটিই খাতা রিভিউয়ের সুযোগ দেয় যেখানে প্রায় ৬ শতাধিক পরীক্ষার্থী রিভিউয়ের মাধ্যমে উত্তীর্ণ হয়। যাদের ভেতরে বেশিরভাগ পরীক্ষার্থীই ভাইভা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বর্তমানে উচ্চ আদালত দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

তাই দেশবরেণ্য সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্বে গঠিত বার কাউন্সিলের অ্যাডহক কমিটির প্রতি অনুরোধ থাকবে, আপনারা এনরোলমেন্ট কমিটির প্রতি আহ্বান রাখবেন তারা যেন পেশাগত শৃঙ্খলা ও মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে- প্রথম ধাপে রিভিউ উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীদের ফলাফল অক্ষুণœ রাখতে পদক্ষেপ নেয়। এর পাশাপাশি বাকী পরীক্ষার্থীদের খাতাগুলোও পুনর্মূল্যায়ন করে রিভিউ ফলাফল দ্রুত প্রকাশ করে ভাইভা নেওয়ার মাধ্যমে চলতি এনরোলমেন্ট প্রসেস শেষ করতে হবে। আর এই পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল শুধু নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং আইন ও প্রশাসনিক ন্যায়ের প্রতিও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

লেখক : আইনজীবী, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ঢাকা এবং পরিচালক আইন শিক্ষা একাডেমী।

পাঠকের মতামত:

১২ জানুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test