E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

সমাজ ও অর্থনীতিতে যুবশক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা 

২০২৬ জানুয়ারি ১২ ১৮:০০:১৯
সমাজ ও অর্থনীতিতে যুবশক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা 

ওয়াজেদুর রহমান কনক


যুবসমাজ একটি জাতির সবচেয়ে গতিশীল ও প্রগতিশীল শক্তি। দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর উন্নয়নে যুবদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। যুবশক্তি শুধুমাত্র শ্রমশক্তি হিসেবে নয়, বরং নেতৃত্ব, উদ্ভাবন ও নৈতিক দিক থেকে দেশের ভবিষ্যৎকে নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাদের শিক্ষাগত ও পেশাগত দক্ষতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং সামাজিক সচেতনতা মিলিতভাবে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ ও উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে সমৃদ্ধ করে।

বর্তমান বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী যুবশক্তি জনসংখ্যার একটি বড় অংশ, এবং শ্রমবাজারে তাদের উপস্থিতি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নে সরাসরি প্রভাব ফেলে। তবে যুবদের মধ্যে বেকারত্ব একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। উচ্চশিক্ষিত যুবদের মধ্যেও কর্মসংস্থানের অভাব তাদের প্রতিভা এবং সৃজনশীলতা ব্যবহারের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। এর ফলে শিক্ষিত বেকার যুবেরা সমাজে অপ্রয়োজনীয় চাপ ও মানসিক চাপের মুখোমুখি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করতে পারে।

কর্মসংস্থানের পাশাপাশি নেতৃত্ব বিকাশও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুবরা যখন সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে সক্রিয় ভূমিকা নেয়, তখন তারা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, উদ্ভাবনী সমাধান এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ধারণা নিয়ে আসে। এটি দেশের নীতি প্রণয়ন এবং সামাজিক কাঠামোকে আরও সমন্বিত ও প্রগতিশীল করে তোলে। উদ্যোক্তা কার্যক্রম, প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা দক্ষতার বিকাশের মাধ্যমে যুবরা শুধু নিজেদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করে না, বরং জাতীয় অর্থনীতি ও শিল্পায়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে।

তবে এই ক্ষমতাকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করার জন্য সমন্বিত নীতি, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক সহায়তার প্রয়োজন। শিক্ষাগত ও পেশাগত প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ এবং নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগের মাধ্যমে যুবরা তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারে। যখন যুবশক্তি সঠিকভাবে পরিচালিত হয়, তখন তারা জাতির উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, সামাজিক ন্যায় ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে অবিচ্ছেদ্য অবদান রাখে। যুবসমাজের এই শক্তি দেশের ভবিষ্যৎকে নির্ধারণে এক ধরনের অনন্য প্রভাব বিস্তার করে, যা একটি স্থায়ী, সমৃদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের ভিত্তি গড়ে তোলে।

১২ জানুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় যুব দিবস যুবসমাজের রাষ্ট্র ও সমাজের গঠনমূলক ভূমিকা প্রতিফলিত করার একটি প্রতীকী দিন। এই দিনটি কেবল উৎসব নয়, বরং দেশের নৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের প্রেক্ষাপটে যুবশক্তির গুরুত্ব ও দায়িত্বের প্রতি মনোযোগী হওয়ার আহ্বান। যুবসমাজ দেশের সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক উদ্ভাবনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হয়, যা সামাজিক প্রথা, নীতি এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে সংযুক্ত। যুবদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রাষ্ট্রীয় নীতি, নেতৃত্ব বিকাশ এবং কর্মসংস্থানের কাঠামোকে শক্তিশালী করতে সহায়ক। নেতৃত্বের প্রক্রিয়ায় যুবসমাজের সমন্বিত ভূমিকা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্ভাবনী সমাধান জন্ম দেয়, যা বৈষম্য হ্রাস এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে যুবরা নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করে, যা সমগ্র জাতির প্রগতিশীলতা এবং স্থায়ী উন্নয়নে অনন্য প্রভাব বিস্তার করে। জাতীয় যুব দিবসের গুরুত্ব তাই কেবল পার্বণগত নয়, এটি একটি বিশ্লেষণাত্মক এবং নীতি নির্ধারক দৃষ্টিকোণ থেকে যুবশক্তিকে সমর্থন ও প্রেরণা প্রদানের দিক নির্দেশনা হিসেবে কাজ করে।

বাংলাদেশের শ্রমবাজারে যুবশক্তির উপস্থিতি বিস্তৃত ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী যুব শ্রমবাজারে প্রায় ২৬.৭৬ মিলিয়ন কর্মক্ষম যুব থাকলেও এর মধ্যে ১.৯৪ মিলিয়ন বা প্রায় ৭.২% যুবই বর্তমানে বেকার, যা সমগ্র বেকারত্বের প্রায় ৭৮.৯% অংশকে প্রতিনিধিত্ব করে – এই হার গ্রামীণ ও শহুরে উভয় এলাকায় উচ্চ পর্যায়ে দেখা যায়। এর অর্থ হলো দেশের শ্রমবাজারে যুবরা বিশেষভাবে বেকারত্বের শিকার, এবং এই পরিস্থিতি তেজস্ক্রিয় কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের ত্বরান্বিত নীতিমালার অনিবার্য প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। এ বেকার যুবদের মধ্যে শিক্ষার স্তর ভিত্তিক বেকারত্বের হারও উদ্বেগজনক মাত্রায়; বেকার যুবদের মধ্যে ৩১.৫% উচ্চশিক্ষিত, অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা সম্পন্ন, যখন ২১.৩% মাধ্যমিক ও ১৪.৯% উচ্চ মাধ্যমিক পাস, যা নির্দেশ করে শুধু উচ্চশিক্ষা অর্জন করলেই কর্মসংস্থান নিশ্চিত হচ্ছে না।

এছাড়া, জনসংখ্যা পরিসংখ্যানও যুবসমাজের বৃহৎ অংশকে তুলে ধরে। প্রায় ১৮.৯% যুব (১৫ ২৯ বছর) শিক্ষায় নেই, কর্মে নেই বা প্রশিক্ষণে নেই, অর্থাৎ NEET (Not in Education, Employment or Training) শ্রেণিতে রয়েছে। এর মধ্যে মেয়েদের অংশ ২২.১%, ছেলে যুবের তুলনায় বেশি এবং এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হওয়ার বাস্তবতা প্রতিফলিত করে।

এই পরিসংখ্যানগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে বাংলাদেশের যুবসমাজকে শুধু শিক্ষা অর্জনে উৎসাহিত করলেই হয়নি; তাদের দক্ষতায় লিপ্ত করা, চাকরি সৃষ্টির জন্য উদ্যোগ, উদ্যোক্তা বিকাশ, প্রযুক্তিগত ও পেশাগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সক্ষম করে তোলা, এবং কর্মসংস্থানের সুযোগের অভ্যুত্সাহ সৃষ্টি করাটা একটি ব্যাপক নীতি ও সামাজিক কাঠামোর অংশ হতে হবে। যুবেরা যখন শিক্ষা ও পেশাগত দক্ষতার সঙ্গেই যুক্ত হবে, তখনই তারা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি আধুনিকায়ন বা সেবামুখী খাতে তাদের রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে প্রগাঢ় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

যুবশক্তি যখন একটি কার্যকর পলিসি কাঠামো ও সমর্থন পায়, তখন তা বাংলাদেশকে দ্রুত উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত করার শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই জাতীয় যুব দিবসের পালন কেবল একটি স্মৃতিদিবস নয়; এটি একটি নৈতিক এবং নীতি নির্ধারক উপলক্ষ, যা তরুণদের সক্ষমতা ও দায়বদ্ধতা গড়ে তুলতে এবং তাদের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে সমগ্র জাতির প্রগতির জন্য কর্মসংস্থান এবং নেতৃত্ব বিকাশকে স্বচ্ছভাবে সমর্থন করে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

১৩ জানুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test