E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

শিক্ষা বিনিয়োগ, মানব উন্নয়ন ও সামাজিক রূপান্তরের আন্তঃসম্পর্ক

২০২৬ জানুয়ারি ২৪ ১৭:৫৫:৪৭
শিক্ষা বিনিয়োগ, মানব উন্নয়ন ও সামাজিক রূপান্তরের আন্তঃসম্পর্ক

ওয়াজেদুর রহমান কনক


আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস জাতিসংঘ ঘোষিত একটি বৈশ্বিক উপলক্ষ, যা শিক্ষা–কে কেবল একটি সামাজিক সেবা নয়, বরং একটি মৌলিক মানবাধিকার ও সভ্যতার ধারাবাহিক অগ্রগতির কেন্দ্রীয় শর্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। ২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে ২৪ জানুয়ারিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে এবং ২০১৯ সাল থেকে এটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। এই ঘোষণার পেছনে মূল দর্শন ছিল—শিক্ষা ছাড়া দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক ন্যায়বিচার, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ, টেকসই উন্নয়ন এবং শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা কল্পনাও করা যায় না।

মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষা একটি প্রাথমিক ও অবিচ্ছেদ্য অধিকার। ১৯৪৮ সালের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদে শিক্ষা লাভকে প্রত্যেক মানুষের অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সনদ, শিশু অধিকার সনদ এবং ইউনেস্কোর বিভিন্ন ঘোষণায় এই অধিকারকে আরও সুসংহত করা হয়। শিক্ষা মানুষকে কেবল সাক্ষর করে না; এটি ব্যক্তিকে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে, ক্ষমতায়নের পথ তৈরি করে এবং রাষ্ট্র ও সমাজের সঙ্গে দায়িত্বশীল সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করে। ফলে শিক্ষা মানবাধিকারের রক্ষাকবচ এবং মানবিক মর্যাদার ভিত্তিভূমি হিসেবে কাজ করে।

টেকসই উন্নয়নের আলোচনায় শিক্ষা একটি কেন্দ্রীয় ও সমন্বয়কারী শক্তি। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির মধ্যে চতুর্থ লক্ষ্যটি সরাসরি শিক্ষা বিষয়ক হলেও বাস্তবে শিক্ষা বাকি সব লক্ষ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দারিদ্র্য দূরীকরণ, ক্ষুধামুক্ত সমাজ, স্বাস্থ্যসেবা, লিঙ্গসমতা, শোভন কর্মসংস্থান, জলবায়ু সচেতনতা, শান্তি ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান—সব ক্ষেত্রেই শিক্ষিত মানবসম্পদ অপরিহার্য। শিক্ষা মানুষের চিন্তাশক্তিকে বৈজ্ঞানিক ও সমালোচনামূলক করে তোলে, যা টেকসই নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য মৌলিক শর্ত।

আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবসের তাৎপর্য আরও গভীর হয় যখন আমরা বৈশ্বিক বৈষম্যের বাস্তবতায় তাকাই। আজও বিশ্বের লক্ষ লক্ষ শিশু স্কুলের বাইরে, বিশেষত সংঘাতপীড়িত অঞ্চল, শরণার্থী জনগোষ্ঠী, দরিদ্র ও প্রান্তিক সমাজে। কোভিড-১৯ মহামারি শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং ডিজিটাল বৈষম্যকে নগ্নভাবে প্রকাশ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস কেবল উদযাপনের দিন নয়, বরং বৈশ্বিক বিবেককে নাড়া দেওয়ার একটি উপলক্ষ—যেখানে রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সংস্থা, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের কাছে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়া হয়: শিক্ষা কি সত্যিই সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায্য হয়েছে?

সবশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস সভ্যতার আত্মসমালোচনার একটি দিন। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং মানব অস্তিত্বের মৌলিক শর্ত। একটি রাষ্ট্র বা বিশ্বব্যবস্থা তখনই টেকসই হয়, যখন তার নাগরিকরা শিক্ষিত, সচেতন ও নৈতিকভাবে দায়িত্বশীল হয়। শিক্ষা তাই কেবল উন্নয়নের উপকরণ নয়; শিক্ষা নিজেই একটি নৈতিক অঙ্গীকার—মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নই আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবসের গভীরতম আহ্বান।

আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান নির্দেশ করে যে শিক্ষা বিনিয়োগ ও মানব উন্নয়নের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক বিদ্যমান। বিশ্বব্যাংক ও ইউনেস্কোর যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, একটি দেশের শিক্ষার গুণগত মান এক ইউনিট বৃদ্ধি পেলে দীর্ঘমেয়াদে মাথাপিছু আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায় এবং সামাজিক বৈষম্য কমে আসে। তবে এই উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক নয়; শিক্ষা সামাজিক আস্থা, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ভিতও মজবুত করে। ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস শিক্ষা–কে বহুমাত্রিক উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করে।

এই দিবসের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে—জ্ঞানগত ন্যায়বিচার বা epistemic justice। দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত ইউরোকেন্দ্রিক জ্ঞান কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, যেখানে স্থানীয় ইতিহাস, আদিবাসী জ্ঞান, দক্ষিণ বিশ্বের অভিজ্ঞতা ও বিকল্প জ্ঞানচর্চা প্রান্তিক অবস্থানে ছিল। আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবসের সাম্প্রতিক থিমগুলোতে এই বৈষম্য চিহ্নিত করে বহুস্বরিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জ্ঞানব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হচ্ছে। এটি শিক্ষাকে উপনিবেশোত্তর চিন্তার সঙ্গে যুক্ত করে নতুন এক নৈতিক দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

ডিজিটাল বিপ্লব আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবসের তাৎপর্যকে আরও জটিল ও গভীর করেছে। একদিকে অনলাইন শিক্ষা, ওপেন অ্যাকসেস রিসোর্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষাকে সহজলভ্য করেছে; অন্যদিকে ডিজিটাল বৈষম্য নতুন এক সামাজিক বিভাজন সৃষ্টি করেছে। উন্নত ও অনুন্নত অঞ্চলের মধ্যে ইন্টারনেট সুবিধা, ডিভাইস প্রাপ্যতা এবং ডিজিটাল দক্ষতার পার্থক্য শিক্ষা অধিকারকে অসম করে তুলছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিজিটাল শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত না হলে শিক্ষা নিজেই বৈষম্যের উৎসে পরিণত হতে পারে। আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস এই সতর্কবার্তাকে বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

শিক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্কও এই দিবসের আলোচনায় নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, পরিবেশগত শিক্ষা ও জলবায়ু সাক্ষরতা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। শিক্ষিত জনগোষ্ঠী পরিবেশবান্ধব সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ায় এবং জলবায়ু অভিযোজন কৌশলে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস তাই শিক্ষাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ‘গ্রহ–রক্ষাকারী বিনিয়োগ’ হিসেবে বিবেচনা করে।

সবশেষে, আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস আমাদের সামনে একটি দার্শনিক প্রশ্ন উত্থাপন করে—আমরা কেমন মানুষ ও কেমন সমাজ গড়ে তুলতে চাই। যদি শিক্ষা কেবল শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণের যন্ত্রে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে মানবিক মূল্যবোধ সংকুচিত হবে। আর যদি শিক্ষা মানবিক বোধ, নৈতিকতা, ইতিহাসচেতনা ও গবেষণার স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে তা একটি ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই সভ্যতার জন্ম দিতে পারে। আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস এই দ্বিতীয় পথটির পক্ষেই দাঁড়ায়।

এই অর্থে, আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস কোনো আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি একটি চলমান বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি—যেখানে শিক্ষা মানবাধিকারের ভিত্তি, জ্ঞান ন্যায়বিচারের হাতিয়ার এবং টেকসই উন্নয়নের প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে সভ্যতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

২৪ জানুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test