E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পথে বাংলাদেশ: অর্জন, বৈষম্য ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ 

২০২৬ জানুয়ারি ২৮ ১৯:৪৬:২৯
অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পথে বাংলাদেশ: অর্জন, বৈষম্য ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ 

ওয়াজেদুর রহমান কনক


বাংলাদেশ এসডিজি–৪, অর্থাৎ মানসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা অর্জনের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও এই অগ্রগতির চরিত্র মূলত পরিমাণগত, গুণগত নয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষায় প্রবেশাধিকার ও অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে পেরেছে, তবে শিক্ষার ধারাবাহিকতা, মান, সমতা এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। বিদ্যালয়ে ভর্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সম্পন্ন করার হার কমে যাওয়া, শিক্ষার মান নিয়ে চলমান সমালোচনা এবং উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় বৈষম্য স্পষ্ট করে যে এসডিজি–৪ বাস্তবায়ন কেবল অবকাঠামো ও সংখ্যাগত সাফল্যের মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বরং শিক্ষা ব্যবস্থাকে সামাজিক ন্যায়বিচার, দক্ষতা উন্নয়ন ও মানবিক সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি রূপান্তরমূলক প্রক্রিয়া হিসেবে পুনর্বিবেচনা করাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও একই সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করণীয়।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টসমূহের (Sustainable Development Goals—SDGs) মধ্যে শিক্ষা বিষয়ক লক্ষ্য বাংলাদেশ এসডিজি–৪, অর্থাৎ মানসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা অর্জনের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও এই অগ্রগতির চরিত্র মূলত পরিমাণগত, গুণগত নয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষায় প্রবেশাধিকার ও অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে পেরেছে, তবে শিক্ষার ধারাবাহিকতা, মান, সমতা এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে ।

আজীবন শিক্ষার ধারণা SDG 4–কে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা লক্ষ্যমাত্রা থেকে আলাদা করে। শিক্ষা আর শৈশব বা কৈশোরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা কর্মজীবন, নাগরিক অংশগ্রহণ ও ব্যক্তিগত আত্মোন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত। প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতা, পুনঃদক্ষতা অর্জন, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং ডিজিটাল সক্ষমতা—এসবই আজীবন শিক্ষার কাঠামোর অংশ। এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি ও দ্রুত পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে এককালীন শিক্ষা আর যথেষ্ট নয়।

SDG 4–এর ইন্ডিকেটর কাঠামো মূলত বৈশ্বিক তুলনার জন্য তৈরি, যা একদিকে নীতিনির্ধারকদের জন্য সহায়ক হলেও অন্যদিকে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে একটি টানাপোড়েন সৃষ্টি করে। গ্লোবাল নর্থের মানদণ্ড দিয়ে গ্লোবাল সাউথের শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরিমাপ করার প্রবণতা অনেক সময় উপনিবেশিক জ্ঞান কাঠামোর পুনরুৎপাদন ঘটায়। স্থানীয় ভাষা, সংস্কৃতি, অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা কিংবা কমিউনিটি–ভিত্তিক জ্ঞানের ধরন এই সূচক কাঠামোয় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। ফলে SDG 4–এর বৈশ্বিক রিপোর্টিং ব্যবস্থা নিজেই সমালোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

তবু SDG 4–এর তাৎপর্য অস্বীকার করা যায় না। এটি প্রথমবারের মতো শিক্ষা–কে বৈশ্বিক উন্নয়ন এজেন্ডার কেন্দ্রস্থলে নিয়ে এসেছে এবং শিক্ষাকে মানবাধিকারের ভাষায় পুনর্নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে এটি গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে—কীভাবে বৈশ্বিক লক্ষ্য ও স্থানীয় বাস্তবতার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা যায়। এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানই SDG 4–সংক্রান্ত পিএইচডি পর্যায়ের গবেষণার মূল ক্ষেত্র, যেখানে শিক্ষা কেবল একটি লক্ষ্য নয়, বরং সমাজ রূপান্তরের একটি বৌদ্ধিক ও নৈতিক প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়।

বাংলাদেশ এসডিজি–৪, অর্থাৎ মানসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করলেও চ্যালেঞ্জ ও গুণগত উন্নয়নের বড় ধরনের ফাঁক এখনো রয়ে গেছে। দেশের সামগ্রিক অগ্রগতিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে শিক্ষা ব্যবস্থার বিস্তার ও অংশগ্রহণের দিক থেকে বাংলাদেশ ইতিবাচক অবস্থানে পৌঁছালেও শিক্ষার গভীরতা, ধারাবাহিকতা ও সমতার প্রশ্নে কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।

বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী নেট এনরোলমেন্ট রেট ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যা শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নীতি ও সামাজিক সচেতনতার একটি ইতিবাচক প্রতিফলন। তবে এই সাফল্যের আড়ালে একটি বড় কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন শিক্ষা সম্পন্ন করার হার বিশ্লেষণ করা হয়। প্রাথমিক স্তরে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ৮২.৬ শতাংশ শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারে, নিম্ন মাধ্যমিকে এই হার নেমে আসে ৬৪.৭ শতাংশে এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছায় মাত্র ২৯.৪ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয় যে শিক্ষার প্রাথমিক প্রবেশাধিকার বাড়লেও উচ্চতর স্তরে শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার প্রশ্নে বাংলাদেশ প্রাথমিক পর্যায়ে নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে প্রায় সমতা অর্জন করলেও উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় লিঙ্গভিত্তিক ও আর্থ–সামাজিক বৈষম্য স্পষ্টভাবে বিদ্যমান। দারিদ্র্য, ভৌগোলিক অবস্থান, প্রতিবন্ধিতা এবং বিদ্যালয়ের ধরন—সরকারি ও বেসরকারি—এই সবকিছু শিক্ষার সুযোগ ও ফলাফলে বৈষম্য সৃষ্টি করছে। শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুযোগের ফারাক, ইংরেজি মাধ্যম ও বাংলা মাধ্যম শিক্ষার মানগত ব্যবধান এবং শিক্ষার ব্যয়ের চাপ উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকারকে অসম করে তুলছে। ফলে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা এখনও একটি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য হিসেবেই রয়ে গেছে।

জীবনব্যাপী শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে এসডিজি–৪–এর লক্ষ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ কিছু সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্প্রসারণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং নির্দিষ্ট স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প চালু করা হয়েছে।

সার্বিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশ এসডিজি–৪ অর্জনের পথে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে, বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে প্রবেশাধিকার ও অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে। তবে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, উচ্চশিক্ষায় সমতা নিশ্চিতকরণ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তোলা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে শিক্ষার মান উন্নয়ন, বৈষম্য হ্রাস এবং প্রযুক্তি ও দক্ষতা–সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশই হবে এসডিজি–৪ বাস্তবায়নের মূল নির্ধারক।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

২৮ জানুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test