E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

তারেক রহমান নিয়ে আমার হতাশাকথা

২০২৬ জানুয়ারি ২৯ ১৭:৪২:০৯
তারেক রহমান নিয়ে আমার হতাশাকথা

আবদুল হামিদ মাহবুব


বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান নির্বাচনী প্রথম জনসভা করেছেন সিলেটে। তার  সিলেটের জনসভার বক্তব্যে ব্রিটেনের দুই প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীর বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে বলেছিলেন, 'তারা দুজন রোগীদের সেবার বিষয় নিয়ে বিতর্ক করছিলেন। কোন অসুস্থ রোগী হাসপাতালে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স কল করলে সেটা কত সময়ের ভেতরে এসে পৌঁছবে? ওটা নিয়ে। একজন বললেন এখন ১৯ মিনিট লাগে, আগামীতে আমি নির্বাচিত হলে আরো এক মিনিট কমিয়ে সেটা ১৮ মিনিট করবো। অন্য প্রার্থী বললেন, আমি এটা পাঁচ মিনিটে নিয়ে আসবো। কেউ কল করলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে তার পাশে গিয়ে অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাবে।'

উন্নত দেশে মানুষের চিকিৎসা সেবা কোন পর্যায়ে আছে তার কথা থেকে আমরা সেটা ঐদিন বুঝতে পেরেছিলাম। আশা রেখেছিলাম তিনিও ক্ষমতায় গেলে আমাদের দেশে এমন ব্যবস্থাগুলো প্রবর্তন করবেন। বিনা চিকিৎসায় কেউ ধুঁকে ধুঁকে মরতে হবে না।

তার মুখে এমন বক্তব্য শুনে আশান্বিত হয়েছিলাম। মনে আশা জেগেছিল এই ভেবে যে, তিনি ১৭ বছর ব্রিটেনে থেকে তাদের রাজনীতি ধারণ করে দেশে ফিরেছেন। আমাদের দেশেও জনগণকে শান্তি স্বস্তি দেওয়ার রাজনীতি ফিরবে এই আশায় বুক বেঁধেছিলাম। কিন্তু সেই 'আশার গুড়ে বালি' পড়তে বেশি দিন লাগলো না।

আরেকটা বিষয়; এই দুইহাজার চব্বিশের জুলাইয়ের ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা বিরোধী গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপি'র অতিলোভী যেসব নেতাকর্মী সিএনজি স্ট্যান্ড, বালুরঘাট, হাটবাজার, হাসপাতাল-জেলের খাবার দেওয়ার টেন্ডার দখল করে নিয়েছিল; যারা মানুষের উপর জুলুম করছিল, অফিস আদালতে মাস্তানি শুরু করেছিল, দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করছিল, তাদের বিরুদ্ধে তিনি সেই বৃটেনে নির্বসনে থাকা অবস্থায়ই কড়া অবস্থান নিয়েছিলেন। কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে তার নির্দেশে দল থেকে বহিস্কার করা হলো।

কিন্তু নির্বাচনী সিডিউল ঘোষণার পর সেই বহিষ্কৃত প্রায় সকলকেই দেখলাম একে একে আবার দলে ফিরিয়ে নিলেন! আর এটা ঘটলো তিনি দেশে ফেরার পর। তার নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানেই। তিনি দলকে শুদ্ধপথে রাখতে পারলেন না! তারপরও তার বিএনপি দলীয় লোকজনের কথাবার্তা শুনে আমিও একটা ধারণা সৃষ্টি করেছিলাম যে তার মেধা-প্রজ্ঞা বেড়েছে। আমি তার দলের সমর্থক নই, তারপরও আশা রেখেছিলাম; হয়তো তিনি ডায়নামিক লিডার হয় উঠেছেন। অন্য অনেকের মত আমার মধ্যেও এমন একটা ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল।

আমি ভেবেছিলাম তিনি দেশ সাজানোর জন্য নতুন নতুন পরিকল্পনা হাজির করবেন। কিন্তু এখন দেখি তার মুখে সেই পুরনো ধারার রাজনৈতিক কথাবার্তা। একপক্ষ আরেক পক্ষকে কিভাবে নিন্দাবাদ করে ঘায়েল করা যায়, সেই প্রচেষ্টা। যে আগামীর রাষ্ট্রনায়ক হবে, তার মুখে কি এমন কথাবার্তা মানায়?

এলাকার উন্নয়নের জন্য কি এমপি মন্ত্রী হন? আমিতো জানি দেশকে সুশাসনের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়ার জন্য, দেশের মানুষকে ভালো রাখার জন্য, এমপি মন্ত্রীরা সংসদে পরিকল্পনা দেন। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আইনও প্রণয়ন করেন।

কোথায় খাল হবে, কোথায় ব্রিজ হবে, কোথায় মেডিকেল কলেজ হবে, কোথায় রাস্তাঘাট হবে, সেসবের জন্য তো রাষ্ট্রের কর্মে নিয়োজিত আমলা কামলারা আছেন। তারা সেসব ঠিক করবেন। মাস্টার প্ল্যান করবেন, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সামনে তুলে ধরবেন। এবং তার আলোকে সংসদে আইন হবে, অর্থসংস্থানের পথ হবে, সেগুলো বাস্তবায়ন হবে।

আমলা কামলাদের কাজের দায়িত্ব কেন আমাদের রাজনীতিবিদরা কাঁদে তুলে নেন?এতে করে কি তাদের অবস্থান নিচে নামে না?

আমি এমন নেতা পাওয়ার আশা করি, যে নেতার নখদর্পনে থাকবে পুরো দেশ। নেতা কোন নির্দিষ্ট এলাকা নয়, পুরো দেশ কিভাবে গড়বেন, সেটা নিয়ে জনতার সামনে বলবেন কথা। নেতার মধ্যে থাকবে না কোন অঞ্চল প্রীতি। ওই অঞ্চলে এগিয়েছে, এই অঞ্চল পিছিয়েছে, নেতা সেটা বলতে পারেন না। পক্ষের বিপক্ষের সকল মানুষই নেতা মনে করবেন আমার।

যে নেতা মানুষে মানুষে বিভাজনের কথা বলবে, সেই নেতা সত্যিকারের মানুষের নেতা নন। হয়তো তিনি সীমাবদ্ধ কোন গোষ্ঠীর নেতা হয়ে উঠতে পারেন। কিন্তু আমার আকাঙ্ক্ষা, কেবল আমার আকাঙ্ক্ষা বলি কেন; দেশের সকল মানুষের আকাঙ্ক্ষা বলা যায়, এমন একজনকে মানুষ খুঁজছে যিনি দেশের সকল মানুষের নেতা হয়ে উঠবেন।

তারেক রহমানকে তার কোন জনসভায় বলতে শুনিনি, আমলা-কামলারা কেউ ঘুস খেতে পারবে না, কেউ দুর্নীতি করতে পারবে না, কোন দলের কোন নেতাকর্মী চাঁদাবাজি টেন্ডারবাজি করবে না, এমন অবস্থান তার গঠিত সরকারের থাকবে। যার যেখানে যে দায়িত্ব,সে সেখানে একশতভাগ নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে। সেই ব্যবস্থা তিনি করবেন,এমন কথা তো এখনো বলতে শুনলাম না!

তিনি বলেছেন ঘুস দূর্নীতি কমিয়ে আনবেন। কমিয়ে আনা আর সমূলে উৎপাটন করা দুইটার মধ্যে অনেক ফারাক। কোন বিষয়ে কমানোর মানে সেটা আবার ডাল পালা গজিয়ে মহীরুহ রূপ ধারণ করতে পারে। আর শেখড়সহ উৎপাটন করা হলে সেটার বেঁচে থাকারই সম্ভাবনা থাকে না। আমি তার কথার মধ্যে পাই, তিনি ঘুষ দুর্নীতিকে মারতে চান না! ওটাকে কমিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে চান।

তার বক্তব্য শুনে দলীয় মানুষের বাইরের আমাদের মত যারা, তারা কোনো আশার আলো পাচ্ছে না। এই কারণেই বলাবলি হচ্ছে 'যে লাউ সেই কদু হবে'। অর্থাৎ হাসিনা তোষামোদ পরিবেষ্টিত হয়ে, যেভাবে দেশ চালিয়েছিল, আগামীতেও সেভাবেই চলবে। তারেক রহমান 'পলিসি মেইকার' নেতা না হয়ে গতানুগতিক ধারার নেতা হওয়ার চেষ্টা করায় আমি পুরোই হতাশ।

আমি জানি আমার এই হতাশা প্রকাশে তারেক রহমানের কিচ্ছুটি আটকে থাকবে না। তবে দেশের একজন নাগরিক হিসেবে ডিজিটালের এই যুগে সুযোগ থাকার কারণে আমার কথাগুলো আমি বলে রাখলাম।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যক।

পাঠকের মতামত:

২৯ জানুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test