E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

জলাভূমি সংরক্ষণে বৈশ্বিক সংকট ও মানব দায়িত্ব 

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ০২ ১৭:৫৪:৫১
জলাভূমি সংরক্ষণে বৈশ্বিক সংকট ও মানব দায়িত্ব 

ওয়াজেদুর রহমান কনক


২ ফেব্রুয়ারি পালিত বিশ্ব জলাভূমি দিবস (World Wetlands Day) আধুনিক পরিবেশচিন্তায় কেবল একটি প্রতীকী দিবস নয়; এটি মানবসভ্যতা ও প্রকৃতির পারস্পরিক সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার একটি গভীর বৌদ্ধিক ও নীতিগত উপলক্ষ। এই দিবসের ঐতিহাসিক ভিত্তি ১৯৭১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ইরানের রামসার শহরে স্বাক্ষরিত Ramsar Convention on Wetlands—যা ছিল বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক পরিবেশ চুক্তিগুলোর একটি। এই চুক্তির মাধ্যমে জলাভূমিকে প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক গুরুত্বসম্পন্ন বাস্তুতন্ত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যা শুধু পাখি বা জলজ প্রাণীর আবাসস্থল নয়, বরং জলবায়ু, খাদ্য নিরাপত্তা, মানব জীবিকা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে জলাভূমির গুরুত্ব আরও গভীরভাবে প্রতিভাত হয়। ম্যানগ্রোভ ও পিটল্যান্ডের মতো জলাভূমি পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী কার্বন সিঙ্ক হিসেবে কাজ করে, যা বায়ুমণ্ডল থেকে বিপুল পরিমাণ কার্বন শোষণ করে দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণ করে। জলাভূমি ধ্বংসের অর্থ শুধু জীববৈচিত্র্য হ্রাস নয়; এটি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের গতি ত্বরান্বিত করারও একটি বড় কারণ। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী জলাভূমির দ্রুত ক্ষয় জলবায়ু ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

পরিবেশ ধ্বংসের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মাত্রাও বিশ্ব জলাভূমি দিবসের আলোচনায় কেন্দ্রীয়। বিশ্বের লক্ষ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জলাভূমি নির্ভর জীবিকা—মৎস্য, কৃষি, নৌপরিবহন, পর্যটন ও লোকজ শিল্প—এর সঙ্গে যুক্ত। জলাভূমি নষ্ট হলে শুধু প্রাকৃতিক ভারসাম্য নয়, গ্রামীণ অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতাও ভেঙে পড়ে। বিশেষত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জলাভূমি ধ্বংস দারিদ্র্য, অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি এবং পরিবেশগত উদ্বাস্তু সৃষ্টির অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে।
টেকসই উন্নয়নের তাত্ত্বিক কাঠামোতে জলাভূমি একটি সংযোগকারী ধারণা হিসেবে কাজ করে। এটি একযোগে SDG 6 (পানি ও স্যানিটেশন), SDG 13 (জলবায়ু কর্ম), SDG 14 (জলজ জীবন) ও SDG 15 (স্থলজ জীবন)–এর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশ্ব জলাভূমি দিবস এই আন্তঃসম্পর্কগুলো দৃশ্যমান করে এবং উন্নয়নকে কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সূচকে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তুতান্ত্রিক ন্যায্যতার প্রশ্নে নিয়ে আসে।

বিশ্ব জলাভূমি দিবস তাই কেবল সচেতনতা বৃদ্ধির অনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক নৈতিক আহ্বান। জলবায়ু সংকট, পরিবেশ ধ্বংস ও উন্নয়নের সীমাবদ্ধতার যুগে এই দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃতিকে অবহেলা করে টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব নয়। জলাভূমি রক্ষা মানে কেবল জলাভূমি রক্ষা নয়—এটি মানব সভ্যতার পরিবেশগত বুদ্ধিমত্তা ও ভবিষ্যৎ টিকে থাকার সক্ষমতাকে রক্ষা করার সংগ্রাম।

বিশ্বব্যাপী পরিসংখ্যান জলাভূমির সংকটের গভীরতা স্পষ্ট করে। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি ও রামসার কনভেনশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯০০ সাল থেকে পৃথিবীর প্রায় ৬৪ শতাংশ প্রাকৃতিক জলাভূমি ধ্বংস বা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই হার অন্য যেকোনো বাস্তুতন্ত্রের তুলনায় দ্রুত। বন উজাড়ের হার যেখানে তুলনামূলকভাবে ধীর, সেখানে জলাভূমি ধ্বংসের গতি প্রায় তিনগুণ বেশি। ১৯৭০ সালের পর থেকে বিশ্বে জলাভূমি নির্ভর প্রাণীর জনসংখ্যা গড়ে ৮৩ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে, যা জীববৈচিত্র্য সংকটের ভয়াবহতা নির্দেশ করে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে জলাভূমির পরিসংখ্যান আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। পিটল্যান্ড ও ম্যানগ্রোভের মতো জলাভূমি পৃথিবীর মোট ভূমির মাত্র ৩ শতাংশ দখল করলেও, এগুলোতে সঞ্চিত রয়েছে বৈশ্বিক মাটির মোট কার্বনের প্রায় ৩০ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে বলা যায়, এই পরিমাণ কার্বন পৃথিবীর সব বনভূমির চেয়েও বেশি। অথচ পিটল্যান্ড ধ্বংসের ফলে প্রতিবছর বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের প্রায় ৫ শতাংশ নির্গত হয়, যা বহু দেশের মোট শিল্প নিঃসরণের সমান।

বন্যা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় জলাভূমির অবদান পরিসংখ্যানগতভাবে সুস্পষ্ট। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাকৃতিক জলাভূমি একটি অঞ্চলে বন্যার উচ্চতা গড়ে ২০–৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সক্ষম। উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বন ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের শক্তি প্রায় ৬৬ শতাংশ পর্যন্ত শোষণ করতে পারে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ২০০৪ সালের সুনামি পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা যায়, যেসব এলাকায় ম্যানগ্রোভ অক্ষত ছিল সেখানে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কম হয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবিকার ক্ষেত্রেও জলাভূমির ভূমিকা বিশাল। বৈশ্বিক মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জলাভূমি নির্ভর। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রায় এক বিলিয়ন মানুষ জলাভূমি সংশ্লিষ্ট জীবিকার ওপর নির্ভরশীল—যার মধ্যে মৎস্যজীবী, কৃষক, নৌপরিবহন শ্রমিক ও হস্তশিল্পী অন্তর্ভুক্ত। আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বহু অঞ্চলে জলাভূমি ধ্বংসের ফলে প্রোটিন ঘাটতি ও অপুষ্টির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে জলাভূমির অবদান প্রায়ই অবমূল্যায়িত হয়। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংস্থার গবেষণা অনুযায়ী, প্রাকৃতিক জলাভূমির বাস্তুতান্ত্রিক সেবা—যেমন পানি বিশুদ্ধকরণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, কার্বন সংরক্ষণ ও জীবিকা সহায়তা—প্রতি বছর বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আনুমানিক ৪৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের সুবিধা প্রদান করে। অথচ উন্নয়ন প্রকল্পের নামে জলাভূমি ভরাট বা দখল করে যে ক্ষতি হয়, তার অর্থনৈতিক মূল্য দীর্ঘমেয়াদে বহুগুণ বেশি।

বাংলাদেশের মতো বদ্বীপপ্রধান দেশে জলাভূমির গুরুত্ব আরও গভীর। দেশে প্রায় ৪০ শতাংশ ভূমি কোনো না কোনোভাবে জলাভূমি ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত, যার মধ্যে হাওর, বিল, বাওড়, নদী ও উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ রয়েছে। হাওর অঞ্চলে দেশের মোট অভ্যন্তরীণ মৎস্য উৎপাদনের একটি বড় অংশ নির্ভরশীল। তবুও গবেষণায় দেখা যায়, গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক জলাভূমির প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি সংকুচিত বা রূপান্তরিত হয়েছে, যার ফলে বন্যা, নদীভাঙন ও জীববৈচিত্র্য হ্রাস তীব্রতর হয়েছে।

এই কারণে বিশ্ব জলাভূমি দিবস আজ একটি বৈশ্বিক সতর্কবার্তা—যেখানে পরিসংখ্যান, বিজ্ঞান ও মানব অভিজ্ঞতা একত্র হয়ে আমাদের সামনে একটিই সত্য তুলে ধরে: জলাভূমি ধ্বংসের মূল্য আমরা শুধু প্রকৃতিকে দিয়ে পরিশোধ করছি না, নিজের ভবিষ্যৎ দিয়েই পরিশোধ করছি।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test