E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

এক সোনালি বিকেল: বাংলা একাডেমির বারান্দায় চার দশকের পদধ্বনি

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ০৫ ১৫:৫৯:৫৬
এক সোনালি বিকেল: বাংলা একাডেমির বারান্দায় চার দশকের পদধ্বনি

অধ্যাপক ড. বাদল ঘোষ


মহাকালের সিংহদুয়ারে

মহাকালের স্রোতে ভেসে চলা জীবনতরি কি কখনও পুরোনো ঘাটে ভিড়তে চায় না? নাকি সম্মুখপানে যাত্রার ছলে মানুষ আসলে প্রতিনিয়ত ফিরে ফিরে চায় তার ফেলে আসা অতীতে?

২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি—শীতের দুপুরের ম্লান রোদ যখন বিকেলের কোলে পরম নিশ্চিন্তে ঢলে পড়ছে—ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম বাঙালির মেধা ও মননের বাতিঘর, বাংলা একাডেমির প্রাচীন চত্বরে।

দীর্ঘ এক দশক পর এই চত্বরে পা রাখা। চারপাশের ইট-পাথর হয়তো বদলেছে; দালানকোঠায় লেগেছে আধুনিকতার প্রলেপ, কিন্তু বাতাসের ঘ্রাণটা বদলায়নি। সেই ঘ্রাণে মিশে আছে পুরোনো বইয়ের জীর্ণ পৃষ্ঠা, বকুলফুলের ঝরে-পড়া বিষাদ আর হাজারো কবির দীর্ঘশ্বাস। একাডেমির পরিচালকের দপ্তরের দিকে যখন পা বাড়ালাম, মনে হলো আমি কোনো সরকারি দপ্তরের নিরেট করিডোর দিয়ে হাঁটছি না; বরং আমি প্রবেশ করছি স্মৃতির এক বিশাল জাদুঘরে—যেখানে আমার যৌবনের সোনালি দিনগুলো কাচের ফ্রেমে বাঁধানো ছবির মতো অপেক্ষায় আছে।

আমার গন্তব্য—আমার দীর্ঘদিনের সুহৃদ, অনুজপ্রতিম এবং বাংলা একাডেমির পরিচালক ড. তপন বাগচীর দপ্তর। কিন্তু এই যাত্রাপথটুকু কেবল কয়েক গজের হাঁটাপথ ছিল না; এটি ছিল আমার জন্য চল্লিশ বছরের পুরোনো স্মৃতির সরণি বেয়ে এক উল্টো রথযাত্রা।

তপন বাগচী: এক ধ্রুপদী শব্দশ্রমিকের উপাখ্যান

প্রিয়ভাজন ড. তপন বাগচীর সঙ্গে আমার সম্পর্কের শিকড় মাটির অনেক গভীরে প্রোথিত—যার বয়স আজ চার দশক। ভাবতেই বিস্ময়ে বিমূঢ় হতে হয়—চোখের পলকে কীভাবে গড়িয়ে গেল এতগুলো বছর! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের সেই উত্তাল দিনগুলোতে তপন ছিল আমার অনুজ। কিন্তু পরিচয়ের একেবারে শুরুর দিন থেকেই এই সপ্রতিভ তরুণটি আমার, এবং আমাদের অনেকেরই, বিশেষ নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছিল। তার চোখের তারায় ছিল এক অদম্য কৌতূহল, আর কথায় ছিল মেধার বিচ্ছুরণ।

মেধাবী এই তরুণ সেই সময় থেকেই দুই হাতে লিখে গেছে। লেখালেখি তার কাছে নিছক শৌখিনতা ছিল না; ছিল শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো অপরিহার্য। বাংলাদেশে লেখালেখির জগতটা বড়ই নির্দয়। এখানে সাহিত্যচর্চা আর জীবন-জীবিকা—এই দুটি যেন সমান্তরাল রেখা; খুব কমই তারা এক বিন্দুতে মিলিত হয়। রুটিরুজির কঠোর সংগ্রামে, সংসারের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে কত প্রতিশ্রুতিশীল লেখক যে মাঝপথে কলম থামিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন—তার ইয়ত্তা নেই। আমার নিজের জীবনেও এমন ছেদ পড়েছে বহুবার। জীবিকার প্রয়োজনে, পরিস্থিতির চাপে, কখনো বা মানসিক ক্লান্তিতে সাহিত্য থেকে দূরে সরে যেতে হয়েছে সাময়িকভাবে—এটাই এখানকার নির্মম বাস্তবতা।

কিন্তু তপন? তিনি এক ভিন্ন ধাতুতে গড়া মানুষ। জীবনের শত চড়াই-উতরাই, ঝড়-ঝঞ্ঝা আর পেশাগত ব্যস্ততা—কোনো কিছুই তাকে লেখালেখি থেকে এক চুল বিচ্যুত করতে পারেনি। তিনি হাল ছাড়েননি। একজন নিবিষ্ট কৃষকের মতো তিনি শব্দের চাষ করে গেছেন বিরামহীন। আজ তিনি একজন সফল লেখক; সাহিত্যে নানা পুরস্কার জয়ের পর অবশেষে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারও যুক্ত হয়েছে তার সাফল্যের মুকুটে।

তপনকে আমি দেখি এক “সিদ্ধিদাতা পুরুষ” হিসেবে—যিনি সাধনায় মগ্ন থেকে অবশেষে বরলাভ করেছেন। তার এই অর্জন আমাকে আনন্দ দেয়; এক গভীর গর্ববোধে আমার বক্ষ প্রসারিত হয়। তপন প্রমাণ করেছেন—নিষ্ঠা থাকলে শব্দ কখনো তার কারিগরকে ফিরিয়ে দেয় না। বন্ধু হিসেবে, অগ্রজ হিসেবে তাকে জানাই হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা ও স্যালুট।

হারিয়ে যাওয়া মুখ ও এক অপূর্ণ ক্যানভাস

স্মৃতি বড়ই অদ্ভুত জাদুকর। মনি হায়দারকে দেখে আরও কতগুলো মুখ ভেসে উঠল—সারওয়ার-উল-ইসলাম, বাকীউল আলম, অমল সাহা, ওবায়দুল গণি চন্দন, মাহবুব রেজা, টিপু কিবরিয়া, বদরুল বোরহান, সৈয়দ ওবায়দুল হক, আইরীন নিয়াজী মান্না এবং খেলাঘরের নজরুল কবীর।

বিশেষভাবে মনে পড়ে সোমা নামের মেয়েটির কথা। খুব শান্ত, স্নিগ্ধ চেহারার মেয়েটি নিয়মিত মনিদের সঙ্গে সাহিত্যসভায় আসত। খুব বেশি কথা বলত না, কিন্তু তার উপস্থিতিই আসরটিকে পূর্ণতা দিত। তার চোখের গভীর দৃষ্টিতে ছিল সাহিত্যের প্রতি এক অদ্ভুত অনুরাগ। আজ জীবনের এই বাঁকে দাঁড়িয়ে ভাবি—কোথায় হারিয়ে গেল সেই দিনগুলো? তারা সবাই এখন কোথায়? জীবন নদীর স্রোতে আমরা কে কোথায় ছিটকে পড়েছি—তার খবর কি আমরা রাখি? তবুও স্মৃতির মণিকোঠায় সেই মুখগুলো আজও অমলিন; আজও তারা হাসে, কথা বলে।

মনির সঙ্গে প্রায় দশ বছর পর দেখা। সময় তার চুলে হয়তো কিছুটা পাক ধরিয়েছে, কিন্তু তার ভেতরের সেই লেখকসত্তা আজও চিরসবুজ। তপনের মতোই মনিও কলম থামাননি। তিনি লিখে গেছেন অবিরাম—নিজেকে ভেঙেছেন, আবার গড়েছেন। আজ তিনি সফল, প্রতিষ্ঠিত। বন্ধুর এই সাফল্যে বুকটা গর্বে ভরে ওঠে। মনি—তোমার এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক।

মতিন রায়হান: নৈঃশব্দ্যের কবি

তপন আর মনির কথা বলতে গেলে অবধারিতভাবেই চলে আসে মতিন রায়হানের নাম। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি জনকণ্ঠ অফিসে তার সঙ্গে আমার পরিচয়। মতিন রায়হান—নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক স্বল্পভাষী, নিপাট ভদ্রলোকের প্রতিচ্ছবি। তিনি সেই জাতের মানুষ, যারা নিজেদের উপস্থিতি জাহির করতে পছন্দ করেন না; বরং তাদের কাজই কথা বলে।

মতিন বরাবরই সিরিয়াস কবিতা লেখেন। তার কবিতার প্রতিটি শব্দে থাকে গভীর ভাবনার ছাপ। আমি যখনই তার কোনো নতুন কবিতা পাই, গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ার চেষ্টা করি। কবিতার পাশাপাশি তিনি চমৎকার ছড়াও লিখেছেন। কতবার এমন হয়েছে—পত্রিকার একই পাতায় আমাদের দুজনের ছড়া পাশাপাশি ছাপা হয়েছে; এমনকি কবিতাও। সেই ছাপার অক্ষরে আমাদের নাম পাশাপাশি দেখে যে আনন্দ হতো, তা আজকের এই ডিজিটাল যুগের “লাইক-কমেন্ট”-এর চেয়ে অনেক বেশি পবিত্র ও স্থায়ী।

ব্যক্তিগতভাবে সামনাসামনি বসে মতিনের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সুযোগ খুব বেশি হয়নি। আমাদের যোগাযোগটা ছিল মূলত অক্ষরের সেতু দিয়ে। তাই সেদিন বাংলা একাডেমিতে যাওয়ার আগে তপনকে যখন ফোন করেছিলাম, তখন বিশেষ আগ্রহ নিয়ে বলেছিলাম—“মনি হায়দার আর মতিন রায়হানের সঙ্গে দেখা করতে চাই।” যদিও শেষ পর্যন্ত সময়ের অভাবে সবার সঙ্গে মন ভরে কথা বলা হয়নি, তবুও মতিন রায়হানের প্রতি আমার ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা রইল। তিনি বাংলা কবিতার ভুবনে এক নিভৃতচারী সাধক হয়েই বেঁচে থাকুন।

নতুন মুখ: ড. মিজান রহমান

বাংলা একাডেমির পরিচালক ড. তপন বাগচীর সুসজ্জিত অফিসকক্ষে প্রবেশ করে আরও একটি সুখকর অভিজ্ঞতা হলো। সেখানে উপস্থিত ছিলেন লেখক ও গবেষক ড. মিজান রহমান। এটি ছিল তার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ। তপনই পরিচয় করিয়ে দিলেন। জানলাম—তিনি অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত।

সাহিত্যের জগৎটা আসলে একটা বিশাল মহাসমুদ্রের মতো; এখানে আমরা সবাই অভিযাত্রী। ড. মিজান রহমানের সঙ্গে পরিচয় হয়ে মনে হলো—এই অভিযাত্রায় আরও একজন সহযোদ্ধাকে খুঁজে পেলাম। তার সঙ্গে সামান্য সময়ের আলাপচারিতায় যে উষ্ণতা পেয়েছি, তা মনে রাখার মতো।

বই বিনিময়: হৃদয়ের আদান-প্রদান

সেদিন বিকেলে তপনের দপ্তরে আমরা চারজন—আমি, তপন, মনি হায়দার এবং ড. মিজান রহমান—যখন একসঙ্গে বসলাম, তখন মনে হলো সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। বাইরের পৃথিবীর কোলাহল এই ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতে পারছে না।

আমাদের মাঝে বই বিনিময় হলো যথারীতি। লেখকদের কাছে বই বিনিময় কেবল কাগজের বস্তু আদান-প্রদান নয়; এটি নিজের চিন্তা—নিজের আত্মার এক টুকরো অংশ অন্যকে উপহার দেওয়া। আমি যখন তাদের হাতে আমার বই তুলে দিলাম এবং তাদের বই হাতে নিলাম, তখন মনে হলো—আমরা আসলে আমাদের সময়কেই বিনিময় করছি। তপনের বইতে হয়তো তার সংগ্রামের গল্প আছে, মনির বইতে আছে তার অভিজ্ঞতার নির্যাস, আর মিজানের বইতে আছে গবেষণার গভীরতা।

নশ্বরতার বিপরীতে অক্ষরের অমরত্ব

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। শীতের সন্ধ্যা বড় দ্রুত নামে। আমার তখন তাড়া—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে একটি পূর্বনির্ধারিত অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হবে। মন চাইছিল না আড্ডা ছেড়ে উঠতে। মনে হচ্ছিল, আরও কিছুক্ষণ থাকি; আরও কিছু না-বলা কথা বলি। কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর—সে কারও জন্য অপেক্ষা করে না।

ঠিক তখনই মন ছুঁয়ে গেল এক ছাত্রের কথা—মো. ইমদাদুল হক সোহাগ। আমার পাঠদানের অভিজ্ঞতায় অনেক মেধাবী ছাত্র দেখেছি, কিন্তু সোহাগ ছিল আলাদা। চিন্তাশীল, সংবেদনশীল, আর লেখার ভেতর ছিল এক আশ্চর্য স্পষ্টতা। এখন সে একজন উদ্যোক্তা এবং কলামিস্ট, যিনি ভূ-রাজনীতি ও সমসাময়িক বিষয়গুলোকে সাধারণ পাঠকের কাছে সহজ, প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেন। তার লেখায় যেমন বিশ্লেষণের গভীরতা আছে, তেমনি আছে ভাষার সংযম এবং চিন্তার ভারসাম্য—যা তাকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে।

জগন্নাথ হলের উদ্দেশে যখন পা বাড়ালাম, তখন মনের ভেতরে এক ধরনের মিশ্র অনুভূতি কাজ করছিল। একদিকে পুরোনো বন্ধুদের দেখার আনন্দ, অন্যদিকে অনেক প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা না হওয়ার অতৃপ্তি। সময়ের স্বল্পতার কারণে এবার আমি আমার অনেক প্রিয় লেখক ও প্রিয়জনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আসতে পারিনি বলে সত্যিই ভীষণ কুণ্ঠিত বোধ করছি।

গাড়ির জানালায় চোখ রেখে ভাবছিলাম—জীবনটা আসলে এইরকমই: কিছু পাওয়া আর কিছু না-পাওয়ার দোলাচলেই আমাদের বেঁচে থাকা। আজ দশ বছর পর দেখা হলো; আবার কবে দেখা হবে—জানি না।

কিন্তু এই যে দেখা হওয়া, এই যে বই বিনিময়, এই যে এক বিকেলের স্মৃতি—এগুলো কি হারিয়ে যাবে? না। মানুষ নশ্বর; আমাদের দেহ একদিন মহাকালের ধুলোয় মিশে যাবে। কিন্তু আমাদের এই লেখাগুলো, এই শব্দগুলো থেকে যাবে। সাহিত্য কেবল বিনোদন নয়; এটি সময়ের বিরুদ্ধে মানুষের দাঁড়ানো এক মহৎ বিরোধ—যেখানে লেখক অমর হতে চায় না, চায় শুধু বহমান সময়ের স্রোত থেকে কিছু মুহূর্তকে অঞ্জলি ভরে ধরে রাখতে।

সোহাগের কথা মনে রেখেই আমি বাংলা একাডেমির চত্বর থেকে বেরিয়ে এলাম।

আমরা হয়তো সবাই একদিন চলে যাব। কিন্তু বাংলা একাডেমির এই চত্বর, এই বইমেলা, এই বিকেলগুলো সাক্ষী হয়ে থাকবে—আমরা ছিলাম, আমরা লিখেছিলাম, আমরা ভালোবেসেছিলাম।

সবার জন্য আমার অন্তহীন শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। সবাই ভালো থাকুন, আনন্দে থাকুন—শব্দের ওম মেখে বেঁচে থাকুন অনন্তকাল।

লেখক : অধ্যাপক ড. বাদল ঘোষ একজন কবি, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষাবিদ, যাঁর লেখায় কাব্যিক সংবেদনশীলতা, আত্মঅনুসন্ধান এবং বাউল দর্শনের মরমি অনুরণন একত্রে ধ্বনিত হয়। তিনি কবিতা, প্রবন্ধ, ও শিশু সাহিত্যসহ দুই ডজনেরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে তিনি কানাডা প্রবাসে থেকেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে গভীর ভালোবাসায় লালন করে চলেছেন। ভাষা, স্মৃতি ও মানবিক চেতনার প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা সাহিত্যে একটি অনন্য ব্যতিক্রমী অবস্থান তৈরি করেছে।

পাঠকের মতামত:

০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test