E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ঢাকার কৌশলগত স্বকীয়তার পরীক্ষা

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ১০ ১৮:৩১:১৬
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ঢাকার কৌশলগত স্বকীয়তার পরীক্ষা

মো. ইমদাদুল হক সোহাগ


আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শুধু একটি নির্বাচন নয়—এটি বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের একটি পরীক্ষামূলক মাইলফলক। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৌশলগত উত্তেজনা বাড়ার সাথে সাথে বঙ্গোপসাগরের ভূ-অর্থনৈতিক ও সামরিক গুরুত্ব ক্রমাগত বাড়ছে। এমন প্রেক্ষাপটে জাতীয় নির্বাচন এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ সংক্রান্ত গণভোট একসাথে অনুষ্ঠিত হওয়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি বার্তা: ঢাকা এখন আর কোনো বলয়ের অন্ধ অনুসারী নয়—বরং সে নিজস্ব কৌশলে, নিজস্ব শর্তে খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

২০২৪ সালের ভূরাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যে ক্ষমতাশূন্যতা তৈরি হয়েছিল, ১২ই ফেব্রুয়ারি সেটি পূরণের প্রথম সংগঠিত প্রয়াস। এবারের নির্বাচনে প্রচলিত রাজনৈতিক শক্তির পাশাপাশি জেনারেশন জেড ও ছাত্রসমাজের রাজনৈতিক উত্থান, এবং একটি বড় দলের অনুপস্থিতি—মিলিয়ে রাজনৈতিক মাঠে একটি reset পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন হলো: নতুন সরকার কি একমুখী পররাষ্ট্রনীতির উত্তরাধিকার থেকে বেরিয়ে এসে কৌশলগত স্বকীয়তা অর্জন করতে পারবে?

দিল্লি ও বেইজিং—উভয়ের জন্যই এই নির্বাচন একটি ‘লিটমাস টেস্ট’। ভারতের জন্য এটি শুধু কূটনৈতিক নয়; বরং সরাসরি সেভেন সিস্টার্স অঞ্চলের নিরাপত্তা ও সংযোগনীতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। বিগত দেড় দশকের কৌশলগত ‘কমফোর্ট জোন’ এখন আর নিশ্চিত নয়। ঢাকা যদি ‘সহজ-অনুগামী’ থাকে—এই ধারণা ভেঙে দেয়, তবে নয়াদিল্লিকে তার আঞ্চলিক অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে সমমর্যাদা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে পুনর্গঠন না করলে, ভারত কৌশলগত প্রভাব হারানোর ঝুঁকি মোকাবিলা করতে পারে।

অন্যদিকে, চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতার মাঝে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন স্মার্ট ব্যালান্সিং কৌশল গ্রহণ করেছে। কিন্তু সামনে পরিস্থিতি জটিল। বাংলাদেশকে বেছে নিতে হতে পারে—পশ্চিমা শর্তযুক্ত সংস্কারমূলক সহায়তা, না কি বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর সহজতর ঋণ-কৌশল। উভয় পথই সুবিধা ও চ্যালেঞ্জে পরিপূর্ণ।

বিশেষ করে মাতারবাড়ী ও পায়রা বন্দর কেন্দ্র করে যে ভূ-প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, তা শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং সামরিক ও কৌশলগত অবস্থান নির্ধারণেও প্রভাব ফেলবে। জ্বালানি নিরাপত্তা, বন্দরনিয়ন্ত্রণ, এবং বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে স্নায়ুযুদ্ধের আবহ—এই প্রেক্ষাপটে আবেগ নয়, দরকার পরিমিত সিদ্ধান্ত এবং ঝুঁকানুযায়ী বাস্তববাদ।

এই নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো প্রবাসী ভোটাধিকার। পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রবাসীদের কণ্ঠস্বর এবার ফলাফলে দৃশ্যমান হতে পারে—বিশেষ করে যেসব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র। এটি বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের একটি নতুন স্তর যুক্ত করতে পারে।

অবশ্য, ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু সরকার বদলের বিষয় নয়। এর সঙ্গে সম্পর্কিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনার একটি প্রস্তাবও রাখছে—যা আগামীর বাংলাদেশে একটি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক আদল তৈরি করতে পারে।

আমি এর আগে ২২ আগস্ট ২০২৫-এ The Daily Observer-এ প্রকাশিত “The Indo-Pacific doctrine: Bangladesh’s strategic choices” প্রবন্ধে লিখেছিলাম— “Strategic autonomy is not just a diplomatic buzzword; it is a survival necessity for nations like Bangladesh situated at the crossroads of great power rivalry.” (কৌশলগত স্বকীয়তা কেবল শব্দের অলংকার নয়; এটি বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রের টিকে থাকার শর্ত—যা পরাশক্তির দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে।)

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ছে, কিন্তু সেই গুরুত্ব বাস্তব সফলতায় রূপান্তর করতে হলে প্রয়োজন দূরদর্শী, বাস্তববাদী এবং দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব। লক্ষ্য একটাই: বাংলাদেশকে ‘বাফার স্টেট’ হিসেবে ধরে রাখার বাইরে এনে একটি আত্মবিশ্বাসী, স্বাধীন এবং কৌশলগতভাবে সক্রিয় রাষ্ট্রীয় খেলোয়াড় (independent player) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।

লেখক : ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।

পাঠকের মতামত:

১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test