E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

বাংলাদেশে নতুন অধ্যায় 

বিএনপির ঐতিহাসিক বিজয় ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ১৪ ১৭:১৭:২০
বিএনপির ঐতিহাসিক বিজয় ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

ডা. মাহতাব হোসাইন মাজেদ


বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের ঘটনা নয়; বরং রাষ্ট্রচিন্তা, গণতান্ত্রিক চেতনা এবং দেশের ভবিষ্যৎ পথনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তেমনই একটি অধ্যায়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্থবিরতা, আস্থার সংকট এবং অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের প্রশ্নের প্রেক্ষাপটে ভোটাররা এবার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—পরিবর্তন চাই। সেই পরিবর্তনের নেতৃত্বে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

এই নির্বাচন দেশের রাজনীতিকে নতুন দিগন্তের দিকে এগিয়ে নেওয়ার সংকেত দিয়েছে। এটি শুধু একটি দলের বিজয় নয়; বরং জনগণের দীর্ঘদিনের অসন্তোষ, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং গণতান্ত্রিক চর্চা পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। ভোটের মাধ্যমে জনগণ জানিয়ে দিয়েছে, তারা জবাবদিহিমূলক সরকার, কার্যকর সংসদ এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি প্রত্যাশা করে। এই ফলাফল দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছে, যেখানে ভোটাররা কেবল দলগত পরিচয় নয়, যোগ্যতা ও নীতির ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ও ফলাফল

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার সারাদেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গড়ে ৫৯.৪৪ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। তবে একটি আসনে প্রার্থীর মৃত্যু এবং চট্টগ্রাম–২ ও চট্টগ্রাম–৪ আসনের ফলাফল আদালতের নির্দেশে স্থগিত থাকায় মোট ২৯৭টি আসনের ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

ফলাফলের সারসংক্ষেপে দেখা যায়, বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠনের সক্ষমতা অর্জন করেছে। জামায়াতে ইসলামি ও সহযোগী দল পেয়েছে ৬৮টি আসন। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬টি আসনে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি আসনে, খেলাফত মজলিস ৩টি আসনে এবং গণ অধিকার পরিষদ ও গণসংহতি আন্দোলন একটি করে আসনে বিজয়ী হয়েছে। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৭টি আসনে জয়লাভ করেছেন। এই ফলাফল জাতীয় সংসদে রাজনৈতিক বৈচিত্র্য ও মতের বহুত্ব নিশ্চিত করেছে, যা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপক্বতার দিক নির্দেশ করে।

নির্বাচনে মোট ৫০টি রাজনৈতিক দল এবং ২,০২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, যার মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন ৮৩ জন। মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫৪ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৫ জন এবং হিজড়া ভোটার ১,২২০ জন। ডাকযোগে ভোট পড়েছে ৮০.১১ শতাংশ এবং বৈধ ভোটের হার ছিল ৭০.২৫ শতাংশ। শহর ও পার্শ্বনগর এলাকায় ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি হলেও গ্রামাঞ্চলেও অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য ছিল। এটি প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক সচেতনতা দেশের প্রান্তিক অঞ্চলেও সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং জনগণ ক্রমেই অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে।

নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দু: তারেক রহমান

বিএনপির এই ঐতিহাসিক বিজয়ের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছর প্রবাসে থাকার পর দেশে প্রত্যাবর্তন, নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয় উপস্থিতি এবং সাংগঠনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে তিনি দলকে নতুনভাবে ঐক্যবদ্ধ ও কার্যকর করেছেন। তার নেতৃত্বে বিএনপি একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক রোডম্যাপ উপস্থাপন করেছে, যার লক্ষ্য গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। বিশেষ করে যুবসমাজ ও নারীদের মধ্যে তার নেতৃত্ব নতুন আস্থা ও প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলীয় ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা, তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্ব বিকাশ এবং রাজনৈতিক প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন আরও সহজ হয়েছে।

এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিএনপি শুধু নির্বাচনে জয়ী হয়নি, বরং দেশের রাজনৈতিক পরিপক্বতায় নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

ভোটের বিশ্লেষণ: ‘না’ ভোট ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর বার্তা

কিছু আসনে উল্লেখযোগ্য ‘না’ ভোট এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সাফল্য ভোটারদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। ৭টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর জয় প্রমাণ করে যে ভোটাররা ক্রমেই দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে যোগ্যতা, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও নীতিগত অবস্থানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপক্বতার একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত গণভোটের ফলাফলও জনগণের মনোভাব স্পষ্ট করেছে। মোট ভোটের মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৬৮.০৬ শতাংশ বা ৪,৮০,৭৪,৪২৯টি এবং ‘না’ ভোট পড়েছে ৩১.৯৪ শতাংশ বা ২,২৫,৬৫,৬২৭টি। এই ফলাফল পরিবর্তনের পক্ষে জনগণের সুস্পষ্ট ও সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

নির্বাচনের ফলাফল আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বিবিসি দীর্ঘ সময় পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছে। রয়টার্স ফলাফলকে ‘ভূমিধস জয়’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগনীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। সিএনএন দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক ধারায় বাংলাদেশের অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি তুলে ধরেছে। চীন নির্বাচন সুষ্ঠু ও সফল হওয়ায় অভিনন্দন জানিয়ে নতুন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীসহ বিভিন্ন বিশ্বনেতা তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রও এই বিজয়কে স্বাগত জানিয়ে সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার অভিন্ন লক্ষ্য বাস্তবায়নে একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে।

অর্থনীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা

নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন। প্রশাসনিক সংস্কার ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, কৃষি ও রপ্তানি খাত পুনরুজ্জীবন, সামাজিক সেবার পরিধি বাড়ানো এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। বিশেষ করে করোনা পরবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প, কৃষি ও রপ্তানি খাত পুনরুজ্জীবন ও নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ অতি জরুরি। পাশাপাশি বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে সংসদকে কার্যকর ও অর্থবহ করা প্রয়োজন।

পরিশেষে বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিজয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে এবং সেই পরিবর্তন বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন নতুন সরকারের কাঁধে। এই ঐতিহাসিক সুযোগ যদি কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়—গণতান্ত্রিক চর্চা, সুশাসন ও জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে—তবে এই নির্বাচন ভবিষ্যতে সত্যিকার অর্থেই একটি নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

লেখক: কলাম লেখক ও গবেষক।

পাঠকের মতামত:

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test