E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

শেষ বিদায়ে দীর্ঘশ্বাস

ড. ইউনুসের শাসনকাল ও ধ্বংসস্তূপের খতিয়ান

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯ ১৬:৫৮:৪২
ড. ইউনুসের শাসনকাল ও ধ্বংসস্তূপের খতিয়ান

মানিক লাল ঘোষ


শোষণ আর নির্যাতনের ইউনুস জমানার অবসান হলো। অবশেষে মুক্তিকামী ও দেশপ্রেমিক মানুষের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরেছে। কোনো উৎসবমুখর পরিবেশে নয়, বরং একরাশ হাহাকার, বিশৃঙ্খলা আর অনিশ্চয়তার চাদরে দেশকে ঢেকে দিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনুস পর্দার আড়ালে চলে গেলেন। কারো কারো মতে, যে আশার বেলুন উড়িয়ে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষাসনে বসেছিলেন, গত কয়েক মাসে তা সজোরে ফেটে গিয়ে জনজীবনকে বিষিয়ে তুলেছে। আজ তাঁর বিদায়ের কয়েক ঘণ্টা পর যখন আমরা পেছনে ফিরে তাকাই, তখন প্রাপ্তির চেয়ে হারানোর ক্ষতগুলোই বেশি যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ধরা দেয়। আইন, বিচার, সংস্কৃতি—সর্বক্ষেত্রে প্রহসন এবং দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পদদলিত করেছে তাঁর সরকার।
সাগর-রুনী হত্যার বিচার করার নামে তিনি যে নাটকীয়তার অবতারণা করেছেন, তা জাতির সাথে এক চরম পরিহাস। অথচ এর আড়ালে আমরা কী দেখলাম? আবরার ফাহাদ হত্যার চিহ্নিত খুনিদের মুক্তি, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তোফাজ্জলের মতো নিরপরাধ মানুষকে 'খাইয়ে-দাইয়ে' পিটিয়ে হত্যার নৃশংসতা। এমনকি দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দিয়ে সংসদ সদস্য বানানোর মতো দুঃসাহসও দেখিয়েছে তাঁর প্রশাসন। শীর্ষ সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের মুক্ত করে দিয়ে তিনি দেশকে এক ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতার মুখে ঠেলে দিয়েছেন। গুমের শিকার হাজারো মানুষের কথা বলে মাত্র ২৮৭ জনের দায়সারা তালিকা দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, সত্যের চেয়ে রাজনৈতিক এজেন্ডাই তাঁর কাছে মুখ্য ছিল।

একদার 'এশিয়ার রাইজিং টাইগার' বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, ১২ লাখ মানুষ নতুন করে বেকার হয়েছে। অথচ গ্রামীণ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর অব্যাহতি দিয়ে এবং বিনা টেন্ডারে স্পেকট্রাম বরাদ্দ দিয়ে তিনি নিজের স্বার্থ রক্ষা করেছেন। গাজী টায়ার ধ্বংস করে বিদেশের হাতে বাজার তুলে দেওয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি বজায় রাখা—এসবই কি ছিল তাঁর 'অর্থনৈতিক মডেল'? বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পাচারের গল্প শুনিয়েও আদতে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে তিনি চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। উল্টো ইতিহাসে রেকর্ড পরিমাণ টাকা ছাপিয়ে দেশের মুদ্রাবাজারকে ধ্বংস করেছেন।

ড. ইউনুসের শাসনামলে ২৫০০-এর বেশি সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। মাজার ও মন্দির গুঁড়িয়ে দেওয়া, এমনকি কবর থেকে লাশ তুলে পোড়ানোর মতো মধ্যযুগীয় বর্বরতা আমরা দেখেছি। দিপু দাসের মতো মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা যখন প্রাত্যহিক ঘটনায় পরিণত হয়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না শাসনযন্ত্র কতটা অকেজো ছিল। সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে আমাদের জাতীয় চেতনায়—ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের স্মৃতিচিহ্ন এবং মুক্তিযুদ্ধের অজস্র ভাস্কর্য ধ্বংসের মাধ্যমে তিনি জাতির শেকড় উপড়ে ফেলার চেষ্টা করেছেন।

স্বাধীনতা বিরোধীদের ওপর ভর করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে ভারত-বিরোধিতাকে উস্কে দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সবচেয়ে বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র ভারতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক নষ্ট করেছেন। অন্যদিকে, পাকিস্তানের সাথে সখ্যতা বৃদ্ধি করে দেশকে আবার পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দেশ বিক্রির যে গোপন চুক্তির অভিযোগ উঠেছে, তা দেশের সার্বভৌমত্বের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে। রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট দেওয়া এবং দেশে ঈদ করার সুযোগ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি দীর্ঘমেয়াদী জনমিতিক সংকট তৈরি করে গেছেন।
ড. ইউনুস চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন এক ঋণে জর্জরিত দেশ এবং গড়ে দৈনিক ৪৮টি খুনের পরিসংখ্যান। তাঁর শাসনকালে ৩০০-এর বেশি সাংবাদিকের বিরুদ্ধে প্রায় ৬০০ মামলা হয়েছে, যার অধিকাংশ ছিল হত্যা মামলা। এই মিথ্যা মামলার মাধ্যমে তিনি যে কণ্ঠরোধের সংস্কৃতি চালু করেছেন, তা গণতন্ত্রের জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় বা গ্রামীণ ওয়ালেটের মতো ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য বিস্তারের ধান্দায় তিনি রাষ্ট্রকে ব্যবহার করেছেন। আজ জাতি বুঝতে পারছে, সংস্কারের নামে আসলে তিনি দেশকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করে গেছেন। ইতিহাস তাঁকে ক্ষমা করবে না।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি।

পাঠকের মতামত:

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test