E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

নীরব সংগ্রাম: বিরল রোগের অদৃশ্য জগৎ 

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ২৬ ১৭:৩০:৫৭
নীরব সংগ্রাম: বিরল রোগের অদৃশ্য জগৎ 

ওয়াজেদুর রহমান কনক


বিরল রোগের বিষয়টি তিনটি স্তরে স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করে। প্রথম স্তর, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও ইতিহাস, দেখায় কিভাবে EURORDIS-এর প্রতিষ্ঠা এবং Rare Disease Day-এর উদযাপন রোগ সচেতনতা, নীতি ও গবেষণার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণে সহায়ক। ফেব্রুয়ারির শেষ দিনকে বছরের সবচেয়ে “দুর্লভ” দিন হিসেবে বেছে নেওয়া চিকিৎসা ও সামাজিক প্রতীকী অর্থ উভয়ই তুলে ধরে।

দ্বিতীয় স্তর, বাংলাদেশে বিরল রোগের পরিসংখ্যান, স্থানীয় বাস্তবতার চিত্র ফুটিয়ে তোলে। SMA এবং থ্যালাসেমিয়ার সংখ্যাগত তথ্য দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, স্ক্রিনিং এবং চিকিৎসা প্রাপ্যতার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে। এটি প্রমাণ করে যে, শুধু রোগের প্রকৃতি নয়, চিকিৎসা ও নীতি-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয় স্তর, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ও ওষুধ পরিস্থিতি, রোগের বিস্তার ও চিকিৎসা সীমাবদ্ধতার একটি আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ দেয়। মাত্র ৫% রোগের জন্য কার্যকর ওষুধ থাকা এবং প্রায় ৭,০০০ ধরনের বিরল রোগের উপস্থিতি বিশ্বব্যাপী বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও নীতিনির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে।
১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত European Organisation for Rare Diseases (EURORDIS) বিরল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের পক্ষে সংগঠিত প্রচারণা শুরু করে। তাদের লক্ষ্য ছিল নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ, গবেষণা সহযোগিতা জোরদার করা এবং সীমান্ত-অতিক্রমী স্বাস্থ্যসেবা নীতিতে সমন্বয় আনা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরে ওষুধ অনুমোদন ও ‘অরফান ড্রাগ’ নীতির বিকাশও এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিরল রোগকে বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে নয়, বরং সমন্বিত জনস্বাস্থ্য ইস্যু হিসেবে দেখার ধারণা এখান থেকেই শক্তি পায়।

দিবসটির শেকড় কেবল সচেতনতা-সৃষ্টিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি স্বাস্থ্য-ন্যায়বিচারের দাবির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিরল রোগের প্রায় ৭০ শতাংশই জেনেটিক এবং অধিকাংশের উপসর্গ শৈশবেই প্রকাশ পায়। কিন্তু রোগ নির্ণয়ে দীর্ঘ সময়, বিশেষজ্ঞের স্বল্পতা এবং উচ্চমূল্যের চিকিৎসা—সব মিলিয়ে রোগী ও পরিবারগুলো বহুমাত্রিক সংকটে পড়ে। এই বাস্তবতা থেকে উদ্ভূত হয়েছে ‘ডায়াগনস্টিক ওডিসি’—যেখানে সঠিক রোগ নির্ণয়ে বহু বছর লেগে যায়। দিবসটির মাধ্যমে এই নীরব সংগ্রামকে দৃশ্যমান করা এবং গবেষণা বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি জোরদার করা হয়।

বাংলাদেশে বিরল রোগ—যেমন স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রফি (SMA), অ্যামাইলয়েডোসিস বা অন্যান্য জিনগত দুরারোগ্য অবস্থার—সম্পর্কে নির্দিষ্ট জাতীয় পরিসংখ্যান খুব সীমিতভাবে পাওয়া যায়, কারণ অনেক বিরল রোগের জন্য সরকারি পর্যায়ে নিবন্ধিত ডেটাবেস এখনো রয়েছে না। তথাপি বিভিন্ন গবেষণা, রোগী সংগঠন ও জরিপ থেকে উপলব্ধ তথ্য থেকে একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যায় যে বিরল রোগের বোঝা বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। উদাহরণস্বরূপ, কিউর এসএমএ বাংলাদেশ সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশে প্রায় ১৬৫ জন স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রফি (SMA) রোগী শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, যদিও বাস্তবে অধিক সংখ্যক অগণিত রোগী বর্তমানে চিকিৎসা বা নির্ণয়ের আওতায় আসছে না। এ রোগটি প্রধানত জিনগত কারণে হয় এবং পরিবারগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক জটিলতা সৃষ্টি করে। রোগটির বিরলতার কারণে অভিজ্ঞ চিকিৎসা কেন্দ্র, বিশেষজ্ঞ ডায়াগনস্টিক সুবিধা ও ব্যয়বহুল ওষুধের অভাব এটিকে আরও কঠিন করে তুলেছে, এবং অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারগুলোকে নিজ উদ্যোগে চিকিৎসা ব্যবস্থার খরচ বহন করতে হয়।

আরেকটি উদাহরণ হলো থ্যালাসেমিয়া—যদিও এটি অন্যান্য বিশ্বব্যাপী বিরল রোগগুলোর মতো ব্যতিক্রমী নয়, তবু এটি জিনগত কারণে হওয়া একটি ধারাবাহিক রোগ, যা প্রতিটি শিশুর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক ন্যাশনাল থ্যালাসেমিয়া সার্ভে অনুযায়ী বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া ক্যারিয়ারদের হার প্রায় ১০.৯–১৩.৩%, অর্থাৎ প্রায় ১৭ থেকে ২২ মিলিয়ন মানুষ থ্যালাসেমিয়া বাহক হিসেবে শনাক্ত হতে পারে, যার মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে যেমন রংপুরে ক্যারিয়ারের হার ২৭.৭% পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই ধরনের জিনগত রোগগুলোকে সাধারণ “বিরল” হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে, কারণ এগুলি নির্দিষ্ট জনসংখ্যায় অত্যন্ত কম হলেও দীর্ঘস্থায়ী চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনায় বিশেষ চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আন্তর্জাতিক হিসাবেও লক্ষণীয় যে প্রায় ৭,০০০ এরও বেশি প্রকৃতির বিরল রোগ রয়েছে এবং এদের মধ্যে মাত্র খুব সামান্য অংশের জন্যই কার্যকর চিকিৎসা বা ওষুধ उपलब्ध। যদিও এই সংখ্যা বাংলাদেশ নির্দিষ্টভাবে রাজস্ব সংগ্রহ করে প্রকাশ করেনি, বৈশ্বিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে মাত্র ৫% রোগেরই কার্যকর ওষুধ আছে।

বাংলাদেশের নির্দিষ্ট বিরল রোগের ক্ষেত্রে গবেষণা ও পরিসংখ্যান সংগ্রহের অভাব থাকলেও, উপলব্ধ তথ্য থেকে স্পষ্ট যে এই রোগগুলোতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা অগ্রাহ্য নয় এবং অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে সঠিক ডায়াগনোসিস ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা সেবা সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে নবজাতক পর্যায়ে নির্ণয় ও স্ক্রিনিংয়ের অভাবে রোগটি দেরিতে শনাক্ত হয়, যা চিকিৎসা ও বাঁচার সম্ভাবনাকে কঠিন করে তোলে। পরিসংখ্যানগুলোতে অনুপস্থিত অন্যান্য বিরল জিনগত, ন্যানো রোগ বা স্নায়ুবিক রোগের প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে—এটিই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, গবেষণা ও নীতি নির্ধারণে একটি জরুরি চ্যালেঞ্জ।

বছরের সবচেয়ে “দুর্লভ” দিন হিসেবে ফেব্রুয়ারির শেষ দিন (২৮ বা অধিবর্ষে ২৯ ফেব্রুয়ারি) বেছে নেওয়ার বিষয়টি প্রতীকী অর্থ বহন করে। এটি শুধু ক্যালেন্ডারের একটি বিশেষ দিন নয়, বরং বিরল রোগের ধারণার সঙ্গে সরাসরি সাযুজ্যপূর্ণ—যেমন এই রোগগুলোর প্রকৃতি বিরল ও কম সংখ্যক মানুষের মধ্যে দেখা দেয়। চিকিৎসা ক্ষেত্রে, দিনটি রোগী ও পরিবারদের দীর্ঘসময়ের চ্যালেঞ্জ, সঠিক নির্ণয় এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসার সীমাবদ্ধতাকে সামনে নিয়ে আসে। সামাজিক অর্থে, এটি সচেতনতা বৃদ্ধি, রোগীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বৈশ্বিক সমর্থন ও সংহতির প্রতীক হিসেবে কাজ করে। সংক্ষেপে, বছরটির সবচেয়ে দুর্লভ দিন হিসেবে নির্বাচনের মাধ্যমে বিরল রোগের অদৃশ্য সংগ্রামকে দৃশ্যমান করে তোলা এবং মানবিক ও নীতিগত বার্তা প্রকাশ করা হয়।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

পাঠকের মতামত:

২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test