E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

একজন ভাল মানুষ 

পবিত্র চৌধুরী চলে গেলেন  

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ২৬ ১৭:৪৫:১৭
পবিত্র চৌধুরী চলে গেলেন  

শিতাংশু গুহ


নিউইয়র্কে পরিচিত মুখ পবিত্র নারায়ণ চৌধুরী মারা গেছেন। রবিবার ২২ শে ফেব্রুয়ারি সকালে তিনি ব্রুকলিনের চার্চ-ম্যাগডোনাল্ডে নিজ বাড়ীতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৮৬ (জন্ম ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৪০-মৃত্যু ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)। তিনি স্ত্রী মনীষা চৌধুরী এবং একমাত্র কন্যা ঈশানীকে রেখে গেছেন। তাঁর ভিউ ও শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হবে শুক্রবার ২৭শে ফেব্রুয়ারি ব্রুকলিনের জোসেফ এ ব্রিজি ফিউনারেল হোমে সকাল ১০টা থেকে-দুপুর ১২:৩০মিনিট পর্যন্ত। সেখান থেকে তাঁর মরদেহ শশ্মানে নিয়ে যাওয়া হবে। তাঁর শ্রাদ্ধ্যাদি হবে শনিবার ২৮শে ফেব্রুয়ারি সকাল ১০:৩০মিনিট থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ব্রুকলিনের গৌরনিতাই মন্দিরে। পরিবারের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে যে, যাঁরা পবিত্র চৌধুরীকে শ্রদ্ধা জানাতে ফুল নিয়ে যাবেন, তারা যেন ফুল না নিয়ে ঐ টাকাটা ‘একাল বিদ্যালয়’ অথবা ‘পারকিনসন্স ফাউন্ডেশনে’ দান করেন। 

পবিত্র চৌধুরী বেশ ক’বছর যাবৎ পারকিনসন রোগে ভুগছিলেন। শেষদিকে তার হাত-পা কাঁপতো। গত গ্রীষ্মে পড়ে গিয়ে তাঁর দু’টো হাড় মচকে যায়, এবং শরীর কাঁপুনির কারণে সেটি আর জোড়া লাগেনি। পড়ে যাওয়ার ফলে তার চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। খাওয়া দাওয়া তিনি প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন, বলতেন কি হবে? তিনি আরথ্রাটিসে ভুগছিলেন। মৃত্যু’র আগে ইউরিনারী ইনফেকশনে তিনি প্রায় ১০দিন হাসপাতালে ছিলেন, এবং ২০শে ফেব্রুয়ারি বাড়ী ফেরেন। পরদিন শনিবার তিনি বলেন, ‘আমাকে কলম দাও, আমি লিখবো। তাঁর শ্যালক দেবী রক্ষিত অতনু বলেন, আপনি তো লিখতে পারবেন না, আপনি বলুন আমি লিখি। পবিত্র চৌধুরী কথামত অতনু লিখেন, ‘আমি আদেশ পেয়েছি, আমাকে যেতে হবে’। বৌদি মনীষা চৌধুরী জানালেন, কাগজটা এমনিতেই পরে ছিলো, আপনার দাদার মৃত্য’র পর খুলে তাই দেখলাম। বৌদি ব্যাপারটা কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দিতে চাইলেন, আমি বললাম, শুনেছি কেউ কেউ আগেভাগে যাওয়ার সংবাদ পেয়ে থাকেন।

আমার সাথে দেবী রক্ষিত অতনু’র রবিবার কথা হয়, তিনি জানিয়েছিলেন যে, এই পরিবারের একমাত্র মেয়ে ঈশানি বাবার মৃত্য সংবাদ পেয়ে ওয়াশিংটন থেকে বাড়ী আসে। পবিত্র চৌধুরী রিটায়ার করেছেন বেশ ক’বছর, ব্রুকলীনে থেকেছেন আগাগোড়া। আমেরিকায় এসে আমি ১৯৯০-এ ব্রুকলীনে উঠি, তখনো তিনি সেখানে ছিলেন। তিনি কলকাতা থেকে ইংরেজীতে এমএ, এবং আমেরিকায় এসে আরো একটি এমএস করেন, অর্থাৎ বাঙ্গালীর ভাষায় তিনি ‘ডবল এমএ’ ছিলেন, আমরা তা জানতামই না। সত্যি বলতে কি দাদার নামের মধ্যখানে যে একটি ‘নারায়ন’ আছে তা আমি অন্তত: জানতাম না। আসলে পবিত্রদা-কে আমরা কতটুকুই বা জানতাম? তিনি কলকাতার মানুষ হয়েও বাংলাদেশের মানুষের সাথে মিশে গিয়েছিলেন, চার্চ-ম্যাকডোনাল্ডে সবাই তাঁকে চেনে, সবাই ভালবাসে। তিনি বাংলা ও ইংরেজী দু’টো ভাষায় লিখতেন। নিউইয়র্কে সাপ্তাহিক জন্মভূমি ও অন্য কাগজে আমি তাঁর লেখা পড়েছি।

পবিত্র চৌধুরী বাংলাদেশের হিন্দুদের আন্দোলনে ব্যাপকভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন, এই আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই তার সাথে আমাদের ঘনিষ্ঠতা। শাহরিয়ার কবির, সাংবাদিক সুমি খান তাঁকে যথেষ্ট সন্মান করতেন। আমার জানামতে দু’জনই আমেরিকা এলে তাঁর বাড়িতে যেতেন। জুলাই-৩৬ ভুয়া বিপ্লবের পর সুমি খান পালিয়ে আমেরিকা এসেছিলেন, পবিত্রদা-বৌদি তারপ্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সুমি আমায় এসব জানিয়েছিল। আর শাহরিয়ার কবির ও আমরা পবিত্রদা’র বাসায় একাধিক মিটিং করেছি। পবিত্রদাকে নিয়ে লিখবো ভাবিনি, জন্মভূমি সম্পাদক রতন তালুকদার, সম্ভবত: কৃতজ্ঞতা বোধ থেকে আমায় লিখতে অনুরোধ করে। আসলে আমরা সবাই পবিত্রদার কাছে কোন না কোনভাবে দায়বদ্ধ, কৃতজ্ঞ। তিনি সর্বদা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। পবিত্র চৌধুরী ছিলেন একজন চমৎকার ভদ্রলোক, ভালোমানুষ।

একটি ছোট্ট ঘটনা বলি: ২০০১-২০০৬-এ আমরা তৎকালীন বিএনপি-জামাত সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন করছি। ঐক্য পরিষদের প্রেসিডেন্ট তখন রূপকুমার ভৌমিক। তিনি ম্যানহাটনে একটি হোটেলে ম্যানেজমেন্ট বিভাগে চাকুরী করতেন। আমরা তাঁর হোটেলে একটি বড় আন্তর্জাতিক সেমিনার করি। সবকিছু নিয়ম মেনে হলেও বাঙ্গালী কেউ তাঁর বিরুদ্ধে নালিশ করে, তার চাকুরিটি চলে যায়। পবিত্র চৌধুরী বেশ ক’মাস পরে এটি জানতে পারে এবং রূপকুমারকে তাঁর অফিসে নিয়ে যান, এবং বসকে বলেন যে, ‘প্রয়োজনে আমি চাকুরী ছেড়ে দিচ্ছি, আমার জায়গায় এঁকে নিন’। শেখ পর্যন্ত ঠিক কি হয়েছিলো জানিনা, তবে রূপকুমার চাকুরী পেয়েছিলো, এবং আজো তিনি সেই চাকুরিটি করছেন। এজন্যে পবিত্রদা’র প্রতি রূপকুমারের শ্রদ্ধার কোন কমতি ছিলোনা, এখনো নেই। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে আমরা অনেকেই পবিত্রদা’র বাড়ী যেতে পারিনি, কিন্তু বৌদি জানালো, রূপকুমার পরদিন সস্ত্রীক গিয়েছিলো, মৃত্যুকালে থাকতে পারেনি বলে দু:খ প্রকাশ করেছে, এবং পবিত্রদা’র আত্মার শান্তি কামনায় গীতা পাঠ করে গেছে।

পবিত্র চৌধুরী নেই, আমরা তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি, তিনি যেখানে থাকুন, ভাল থাকুন। আমি জানি পবিত্রদা আমায় বেশ স্নেহ করতেন। পবিত্রদা’র ভগ্ন স্বাস্থ্যের কথা আমরা মাঝেমধ্যে শুনতাম, যাব যাব ভাবতাম, হয়ে উঠতো না? মাস খানেক আগে আমার পত্নী তাগাদা দিচ্ছিলো যে, চলো পবিত্রদাকে দেখে আসি, সেটাও হয়নি। মৃত্যু সংবাদ শোনার পর আলপনা বললো, গেলে তো দেখা হতো। শুক্রবার ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে দ্বিজেন ভট্টাচার্য্যের সাথে জ্যাকসন হাইটসে আমার দেখা হয়, তারসাথে পবিত্রদা’র কথা আলোচনায় আসে। আমাদের সুশীল সাহা, যিনি নিজেও ভীষণ অসুস্থ, তার সাথেও আমার পবিত্রদাকে নিয়ে কথা হয়েছে। পবিত্রদা’র মৃত্যু সংবাদ আমি সামাজিক মাধ্যমে দেই, ব্যাপক সাড়া দেখে বোঝা যায়, পবিত্রদাকে সবাই ভালবাসে। আসলেই তো পবিত্রদা’র বিরুদ্ধে কাউকে বলতে শুনিনি। পবিত্রদা’র মৃত্যুতে আমরা একজন পরম শুভানুধ্যায়ীকে হারালাম, এ ক্ষতি পূরণ হবার মত নয়। তার পরিবারের প্রতি রইলো আমাদের গভীর সমবেদনা।

লেখক : আমেরিকা প্রবাসী।

পাঠকের মতামত:

২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test