E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

নারী ও কন্যার অধিকারে পুরুষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ 

২০২৬ মার্চ ০৭ ১৭:২৯:৫০
নারী ও কন্যার অধিকারে পুরুষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ 

নীলকন্ঠ আইচ মজুমদার


৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। “আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার” এ প্রতিপাদ্যের বিষয়টি নিয়েই আলোচনা আজ। প্রতিপাদ্যের বিষয় গুলো ছোট হলেও তার আয়োজন ও প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক যদি তা আমরা বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হই। প্রতিবছর সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাঝে এ নিয়ে বেশ আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। প্রতিবারের মতোই এবারও বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো সারা দেশে পালিত হবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নতুন একটি বিষয় চিন্তা করা হয়েছে প্রতিবারের মতো এবারও। কিন্তু বিষয় যতই নতুন হোক নারী দিবসের আলোচনা কেবল নারীদের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যাওয়ার ছোট্ট গন্ডির মধ্যেই থেকে যায়। পুরুষের সমপরিমাণ পিছিয়ে থাকা জনগোষ্টীকে কিভাবে সামনে এগিয়ে আনা যায় সে বিষয়ে আমরা দীর্ঘমেয়াদি কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করছি না আজও। আজ থেকে অর্ধ শতাব্দী পুর্বে জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন শুরু করে। যাকে আন্তর্জাতিক নারী বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। 

১৯৭৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সদস্য রাষ্ট্রগুলিকে "তাদের ঐতিহাসিক এবং জাতীয় ঐতিহ্য এবং রীতিনীতি অনুসারে, বছরের যে কোনো দিনকে নারী অধিকার এবং আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য জাতিসংঘ দিবস হিসেবে ঘোষণা করার" আমন্ত্রণ জানায়। বেশিরভাগ দেশের সাথে মিল রেখে ৮ মার্চকে জাতিসংঘ কর্তৃক নারী অধিকার এবং বিশ্ব শান্তির জন্য আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে ঐতিহ্যগতভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তখন থেকে জাতিসংঘ এবং বিশ্বের বেশিরভাগ অংশ এটি প্রতি বছর উদ্যাপন করে আসছে। প্রতি বছর নারী দিবস পালনের জন্য একটি নির্দিষ্ট থিম বা বিষয়কে সামনে আনা হয়। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ভাবে অনেক দিবস পালন করা হয়। যদিও একেকটি দিবসের তাৎপর্য আলাদা তাই এর আয়োজনও ভিন্ন হওয়ার কথা কিন্তু বাস্তবে মাঠ পর্যায়ে প্রায় প্রত্যেকটি দিবসের উদ্যাপনের ধরণ প্রায় একই রকম হয়ে থাকে তাই এসব দিবসের খুব একটা প্রভাব বাস্তবিক অর্থে সাধারণ মানুষের মাঝে থাকে না। দিবস পালনের ব্যাপারটি কেবল রাষ্ট্রীয়ভাবেই সীমাবন্ধ থাকে। তবে প্রতিবার যখনই দিবসের কথা আলোচনা হয় তখন আমরা মনে করি এ উপলক্ষে হয়তো একটু বাতাস লাগবে বাস্তবিক জীবনে তবে সেটা আর হয় না বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই। এবারের প্রতিপাদ্যে আগামীর ন্যায়বিচারের কথা গুরুত্বারোপ করা হয়েছে তার মানে দাঁড়ায় নারী ও কন্যাদের জন্য এখনও রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে আমরা ন্যায় বিচারের জায়গাটা প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। বাস্তবেই তাই। যদিও পুরুষের ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার সঠিকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে এটাও বলা যায় না।

সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে যে অবহেলার জায়গা তৈরি হয়েছে সেখানে ন্যায়বিচার শব্দটি বড়ই বেমানান। নারী ও কন্যাদের উপর সমাজব্যবস্থার যে আধিপত্য তা ন্যায়বিচারের পথে সবচেয়ে বড় বাঁধা। অন্যদিকে নারী সমাজ এগিয়ে না আসায় তাদের যে অধিকার তা এই পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থায় অর্জন করা অনেক জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা মুখে যতই নারীর অধিকারের কথা বলে বক্তব্য দেই না কেন বাস্তবে তারই উল্টোপথে হাটি সর্বদাই। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচারের সঠিক প্রয়োগ না ঘটলে অধিকার অর্জন কেবল কাগজেপত্রেই থেকে যাবে। নারীকে সমাজ ব্যবস্থায় আলাদা করে দেখার কারনেই মূলত নারীর ন্যায়বিচার ও নারীর অধিকারের প্রশ্ন বারবার উত্থাপিত হয়ে থাকে। নারী দিবসের আলোচনা করতে গেলেই বুঝা যায় নারী শব্দটি মনে হয়ে মানুষের চেয়ে ভিন্ন। আসলেই তাই, কারন আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষরা যেভাবে বেড়ে উঠে নারীরা একটু ভিন্নতায় তাদের জীবন সাজায়। প্রকৃত পক্ষে একটা সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষকে যে চোখে দেখা হয় নারীদের সে চোখেই আলাদা মূল্যায়ণ করা হয়।

একসময় নারীরাও এ দিবসের প্রতি খুব একটা সোচ্চার ছিল না। ধীরে ধীরে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং তাদের অধিকার সচেতন হওয়ার ফলে জেগে উঠছে নারীরাও। তবে এতসব আয়োজনের পরও নারীরা তাদের প্রাপ্যতা কতটুকু অর্জন করতে পেরেছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। তবে এটা ঠিক বিভিন্ন রকম কর্মসূচী চলার ফলে কিছুটা হলেও নারীদের সামাজিক অবস্থান আস্তে আস্তে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। যার ফলে নারীরা এখন অনেক জায়গায় অবস্থান করতে সক্ষম হচ্ছে। তবে এসব পলিসি অনেকাংশেই নির্ভর করে রাষ্ট্রের নীতির উপর। রাষ্ট্র নারীকে কিভাবে দেখতে চায়। অনেক পুরষদের মতে নারীদের জন্য আলাদা কেন দিবসের প্রয়োজন আছে। তাদের মতের সাথে দ্বিমত করার সুযোগ নেই তবে একটা কথা থেকেই যায় যে, নারীদের জন্য আমরা সমান ব্যবস্থা তৈরি করতে পেরেছি কিন না ? যদি সমান জনগোষ্টীর জন্য সমান ব্যবস্থা তৈরি করা যেত তাহলে আলাদা করে এ দিবসের দরকার ছিল না। পুরুষ শাসিত সমাজ নারীদেরকে আলাদা দেখার কারনেই কিন্তু আজ এ দিবসের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তবে ইদানিং একটা বিষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে নারীদের একটা অংশ আবার নিজেদের আলাদা ভাবা এবং ঘরবন্দি থাকতে পছন্দ করছে এবং অন্যদেরকেও তারা উৎসাহিত করছে। নারীদের মধ্যে এ ক্ষেত্রে দ্বিমত তৈরি হচ্ছে। কিন্তু নারীদের মনে রাখতে হবে নিজেদের অধিকার অন্যের উপর ভর করে অর্জন করা যায় না।

নারীদের এগিয়ে যাওয়ার ধরণটা একেক সমাজ ব্যবস্থায় একেক রকম। এক্ষেত্রে ধর্মীয় ভাবনাটাও ভিন্ন রকম। সমাজ ব্যবস্থায় এটা লক্ষণীয় যে বেশির ভাগ পুরুষই চায় প্রত্যেক নারীই অধিকার অর্জন করুক তবে নিজের পরিবার বাদে এবং পারিবারিক চর্চ্চাটা এভাবেই তৈরি করছে। সবসময় আইন দিয়ে সকল অধিকার অর্জন করা যায় না। অধিকার অর্জন করতে হলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সচেতনতা অর্জন। যতক্ষণ পর্যন্ত নারীদের জাগানো সম্ভব না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত কোন অধিকার অর্জনের চিন্তা করা দুরুহ ব্যাপার। তাই কন্যা শিশু জন্মের পর থেকে তাকে মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠার মুল মন্ত্র শিখাতে হবে মানুষ হিসেবে। পরিবার যদি কন্যার অধিকার না দিতে পারে তাহলে তাহলে নারী হয়ে উঠার পর সে অধিকার অর্জন করা সম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো অধিকার তৈরির জায়গাটা প্রথমেই তার পরিবার থেকে তৈরি হবে।

পরবর্তীতে তা আসবে সমাজের কাছে। সমাজ সেটাকে লালন করবে বিভিন্নভাবে সেই ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ একটি সুষ্ঠ পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রেই আমরা নারীদেরকে পণ্য হিসেবেই ব্যবহার করতে চাই। এই ভাবনাগুলোর পরিবর্তন আনতে হলে রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার ভাবনাগুলোতে পরিবর্তন আনতে হবে। সেক্ষেত্রে নারীদেরকে শিক্ষা অর্জন করে এই ভাবনার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। কারন আমরা সবাই শাসকের ভূমিকায় থাকতে চাই সবসময় তাই নারীদের সে জাযগায় বাঁধা প্রদান করা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে এবং এটা পুরুষ শাসিত সামাজের অনেকটা আচারে রুপ নিয়েছে। পুরুষ শাসিত সমাজের কর্ণধারদের মনে রাখতে হবে নারী ও কন্যাদের অধিকার দিলে পুরুষদের কোন ক্ষতি হবে না বরং তা সমাজ ব্যবস্থার উন্য়নের জন্য হবে অত্যন্ত সহায়ক। যতক্ষণ পর্য়ন্ত নারী পুরুষদের চিন্তা ভাবনা এবং অধিকার এক কাতারে না আসবে ততক্ষণ পর্যন্ত একটি সুন্দর সমাজ ব্যবস্থা তৈরি হবে না।

লেখক :শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক।

পাঠকের মতামত:

০৭ মার্চ ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test