E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

শিক্ষাপ্রশাসন ও মাঠপর্যায়ের নেতৃত্ব: শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে বিবেচ্য

২০২৬ মার্চ ১১ ১৭:৪২:৩৯
শিক্ষাপ্রশাসন ও মাঠপর্যায়ের নেতৃত্ব: শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে বিবেচ্য

ড. মাহরুফ চৌধুরী


সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের একটি প্রজ্ঞাপনের খবর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন পদে কর্মরত ৮২ জন কর্মকর্তা যাদের মধ্যে সাঁট-লিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর, হিসাবরক্ষণ কাম ক্লার্ক, উচ্চমান সহকারী ও প্রধান সহকারী রয়েছেন তাদের পদোন্নতি দিয়ে সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে কারও পদোন্নতিতে আপত্তি থাকার কথা নয়; বরং যে কোনো পেশাজীবনের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও মর্যাদাপূর্ণ ক্যারিয়ার অগ্রগতির পথ থাকা অত্যন্ত জরুরি। একটি আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামো তখনই কার্যকর হয়, যখন সেখানে কর্মরত মানুষ জানেন যে তাঁদের শ্রম, দক্ষতা ও সততার যথাযথ মূল্যায়ন একদিন পদোন্নতির মাধ্যমে স্বীকৃতি পাবে। কিন্তু প্রশ্নটি আপত্তির নয়, বরং নীতিগত ও কাঠামোগত। সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের পদটি কি কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক পদ, যেখানে নথি যাচাই, অফিস ব্যবস্থাপনা বা দাপ্তরিক তদারকিই প্রধান কাজ? নাকি এটি মূলত এমন একটি একাডেমিক নেতৃত্বের অবস্থান, যার মাধ্যমে একটি উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদান, শিক্ষার মান, শিক্ষকতার পেশাগত চর্চা এবং শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশ সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়? আধুনিক শিক্ষা-ব্যবস্থাপনা তত্ত্বে শিক্ষা কর্মকর্তাদেরকে কেবল প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দেখা হয় না; বরং তাদেরকে শিক্ষা-ব্যবস্থার শিখন-নেতৃত্বের ধারক (ইন্সিট্রাকশানাল লিডার) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সুতরাং এই পদে নিয়োগ বা পদোন্নতির প্রশ্নটি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এটি সরাসরি শিক্ষার গুণগত মান, শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন এবং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্ব কেবল দাপ্তরিক কাগজপত্র যাচাই বা প্রশাসনিক তদারকির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি উপজেলার সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার মান ও দিকনির্দেশনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাদের প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে উপজেলার সব মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকি ও পর্যবেক্ষণ; শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা; স্থানীয় বাস্তবতা ও চাহিদা বিবেচনায় শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা করা; এবং শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করা। অন্য কথায়, এই পদে কর্মরত ব্যক্তিকে একই সঙ্গে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, শিক্ষায় নেতৃত্ব এবং শিক্ষাবিষয়ক নীতিমালা বাস্তবায়নের সমন্বিত দায়িত্ব পালন করতে হয়। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্ব তত্ত্বে এ ধরনের পদকে কেবল প্রশাসনিক কর্তৃত্বের জায়গা হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটিকে শিখন নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে বিদ্যালয়ের পাঠদান পদ্ধতি, মূল্যায়ন ব্যবস্থা, পাঠ্যক্রম বাস্তবায়ন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং শিক্ষার পরিবেশ সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা রাখতে হয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে যে কেউ কি কেবল প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার জোরে এই একাডেমিক তদারকির দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করতে পারবেন?

শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়ন, শিক্ষকদের পেশাগত সহায়তা প্রদান কিংবা বিদ্যালয়ের শিখন শেখার প্রক্রিয়া মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন শিক্ষা মনোবিজ্ঞান, শিক্ষাক্রম তত্ত্ব, পাঠদান পদ্ধতি এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনার মৌলিক জ্ঞান। এই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক নেতৃত্ব দেওয়া কার্যত একটি জটিল দায়িত্ব, যা শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা দিয়ে পূরণ করা সবসময় সম্ভব নয়।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে একটি ‘ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও মানসিকতা’ নিয়ে কাজ করে এসেছে। ফলে শিক্ষাপ্রশাসন হয়ে উঠেছে সর্বত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের অংশ। ঔপনিবেশিক আমলে যে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল শাসন ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা; সৃজনশীল জ্ঞানচর্চা বা মানবিক বিকাশ তখন প্রশাসনিক চিন্তার কেন্দ্রে ছিল না। স্বাধীনতার দীর্ঘদিন পরেও সেই মানসিকতার ছাপ আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রয়ে গেছে। বস্তুত, শিক্ষা প্রশাসনকেও অনেক সময় সাধারণ প্রশাসনের একটি সম্প্রসারিত শাখা হিসেবে দেখা হয়। তাই শিক্ষাপ্রশাসনের মূল কাজ মনে করা হয় দাপ্তরিক তদারকি, নিয়মনীতির প্রয়োগ এবং আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা। কিন্তু শিক্ষা এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে কেবল প্রশাসনিক কর্তৃত্ব দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করা যায় না।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, শিক্ষা একটি বিশেষায়িত ও জ্ঞাননির্ভর ক্ষেত্র। এখানে শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব বোঝা, শিক্ষাক্রমের দর্শন ও কাঠামো অনুধাবন করা, কার্যকর পাঠদান পদ্ধতি ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার ধারণা থাকা, এবং শিক্ষানীতির অন্তর্নিহিত লক্ষ্য বিশ্লেষণ করার মতো পেশাদার দক্ষতা প্রয়োজন। শিক্ষা মনোবিজ্ঞান আমাদের শেখায় শিক্ষার্থীরা কীভাবে শেখে; শিক্ষাক্রম তত্ত্ব নির্দেশ করে জ্ঞানের সংগঠন ও উপস্থাপনের পদ্ধতি; আর শিক্ষাদর্শন আমাদের বলে দেয় শিক্ষা কেন এবং কোন সামাজিক ও নৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হবে। এসব জ্ঞান ছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক তদারকি করা অনেকটা এমন, যেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের মৌলিক ধারণা ছাড়াই একটি হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম মূল্যায়নের দায়িত্ব নেওয়া। এ কারণেই সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে কেবল দাপ্তরিক অভিজ্ঞতাকে যথেষ্ট মনে করলে শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন প্রত্যাশা করা কঠিন। শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব সমস্যা বোঝা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর শিখন-শেখার প্রক্রিয়া মূল্যায়ন করা এবং বিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক উন্নয়নে কার্যকর দিকনির্দেশনা দিতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার মধ্যে শিক্ষাবিজ্ঞানের জ্ঞান ও পেশাগত নীতিনৈতিকতার উপলব্ধি থাকা অপরিহার্য। অন্যথায় শিক্ষাপ্রশাসন ধীরে ধীরে এমন একটি কাঠামোয় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে, যেখানে নীতিমালা ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য জ্ঞান, দক্ষতা ও মানবিকতার বিকাশ পিছিয়ে পড়ে।

বর্তমানে দেশে বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বিষয়ে চার বছর মেয়াদি অনার্স কোর্স থেকে প্রতিবছর শতশত গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছেন। দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজগুলোতে শিক্ষা বিষয়ে স্নাতক (সন্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দীর্ঘদিন ধরেই চালু রয়েছে। এসব প্রোগ্রামে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা সাধারণত ৩৫–৪০টি কোর্সের মাধ্যমে শিক্ষাক্রম তত্ত্ব ও উন্নয়ন, মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষা পরিকল্পনা, শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, শিক্ষায় নেতৃত্ব, শিক্ষা গবেষণা পদ্ধতি, শিক্ষা মনোবিজ্ঞান এবং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে পদ্ধতিগত ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জন করেন। শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞানই নয়, অনেক ক্ষেত্রে তারা গবেষণা, মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ এবং প্র্যাকটিকামভিত্তিক প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো বোঝার সুযোগ পান। ফলে তারা শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে নয়, বরং একটি জ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক বিকাশের প্রক্রিয়া হিসেবে অনুধাবন করার সক্ষমতা অর্জন করেন। এছাড়াও দেশে এক বছর মেয়াদি অথবা পার্ট-টাইম দুই বছর মেয়াদি বিএড কোর্স থেকে পাশ করা বিপুলসংখ্যক শিক্ষক রয়েছেন, যারা পেশাগত প্রশিক্ষণ ও দীর্ঘদিনের শ্রেণিকক্ষের অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজেদের কর্মজীবনে অগ্রসর হতে আগ্রহী। এই শিক্ষকরা বিদ্যালয়ের বাস্তব পাঠদান প্রক্রিয়া, শিক্ষার্থীদের শেখার ধরণ, মূল্যায়নের সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো খুব কাছ থেকে দেখেছেন। শিক্ষাতত্ত্ব ও বাস্তব অভিজ্ঞতার এই সমন্বয় তাদেরকে শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, মাঠপর্যায়ে নেতৃত্ব ও একাডেমিক তদারকির ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করতে পারে। তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে যেখানে শিক্ষাবিজ্ঞানে প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ মানবসম্পদের এমন একটি সম্ভাবনাময় ভাণ্ডার দেশে তৈরি হয়েছে, সেখানে শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে তাদের দক্ষতা ও পেশাগত জ্ঞানকে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যুগের চাহিদা মেটাতে শিক্ষা প্রশাসনকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করা এবং এতে পেশাদারিত্বের ভিত্তি শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের মতো গুরুত্বপূর্ণ মাঠপর্যায়ের পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাবিষয়ক পেশাগত যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। এ ধরনের পদে সরাসরি শিক্ষা বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের নিয়োগ দেওয়া হলে শিক্ষা প্রশাসনে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও পেশাদার নেতৃত্বের ভিত্তি গড়ে উঠতে পারে। কারণ শিক্ষাবিজ্ঞানে প্রশিক্ষিত ব্যক্তিরা শিক্ষাক্রম, মূল্যায়ন, পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষা মনোবিজ্ঞান ও শিক্ষাব্যবস্থাপনার মতো মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে পদ্ধতিগত ধারণা রাখেন, যা বিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক তদারকি ও উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

একই সঙ্গে পেশাগত উন্নয়ন ও পদোন্নতির সুযোগ দিতে বাস্তব অভিজ্ঞতার গুরুত্ব বিবেচনায় রেখে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের অভিজ্ঞ প্রধান শিক্ষকদের মধ্য থেকেও যারা সরকারি প্রশাসনে যেতে আগ্রহী তাদের নিয়োগের সুযোগ রাখা যেতে পারে। দীর্ঘদিনের শ্রেণিকক্ষ অভিজ্ঞতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার বাস্তব দক্ষতা এবং স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান তাদেরকে শিক্ষা প্রশাসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত করতে পারে। এতে একদিকে যেমন পেশাগত অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাগত দক্ষতা সম্পন্ন নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরি হবে, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার সঙ্গে শিক্ষাবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক জ্ঞানের একটি কার্যকর সমন্বয় ঘটবে। পরবর্তীতে এই সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেই ধাপে ধাপে পদোন্নতির মাধ্যমে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে শিক্ষাপ্রশাসনের উচ্চতর পদগুলো পূরণ করা যেতে পারে। এমন একটি ধারাবাহিক পেশাগত সোপান গড়ে উঠলে শিক্ষা প্রশাসনে দক্ষতা, জবাবদিহিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা সমাধানের প্রয়াস বৃদ্ধির মধ্যে দিয়ে দ্রুত শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে এটি একটি সুসংগঠিত পেশাগত ক্যারিয়ার কাঠামো তৈরি করবে, যেখানে শিক্ষা প্রশাসন আর কেবল দাপ্তরিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং জ্ঞাননির্ভর, দক্ষতাভিত্তিক ও পেশাদার নেতৃত্বের একটি স্বতন্ত্র ক্ষেত্র হিসেবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শিক্ষা কর্মকর্তার এই পদটি মূলত মাঠপর্যায়ের দায়িত্বনির্ভর। একজন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে নিয়মিত বিদ্যালয় পরিদর্শন করতে হয়, শিক্ষকদের সঙ্গে পেশাগত আলোচনা করতে হয়, শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করতে হয় এবং বিভিন্ন বাস্তব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধানের উদ্যোগ নিতে হয়। অর্থাৎ এই দায়িত্ব পালনে প্রয়োজন উদ্যম, গতিশীলতা, পর্যবেক্ষণক্ষমতা এবং শিক্ষাবিষয়ক একটি সুস্পষ্ট পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গি। শিক্ষা প্রশাসনের আধুনিক ধারণায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদেরকে অনেক সময় ‘শিখন সহায়তার নেতা’ (ইন্সট্রাকশানাল সার্পোট লিডার) হিসেবে বিবেচনা করা হয় যারা বিদ্যালয়ের পাঠদান প্রক্রিয়া উন্নত করতে শিক্ষককে সহায়তা করেন, উদ্ভুত সমস্যার উৎস চিহ্নিত করেন এবং কার্যকর সমাধানের পথ নির্দেশ করেন। এই বাস্তবতায় কর্মজীবনের শেষপ্রান্তে এসে কেবল প্রশাসনিক ধারার পদোন্নতির মাধ্যমে এই ধরনের মাঠমুখী পদে দায়িত্ব পাওয়া অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনে না। কারণ দীর্ঘদিন দাপ্তরিক পরিবেশে কাজ করা কোনো কর্মকর্তার জন্য নিয়মিত বিদ্যালয়ভিত্তিক তদারকি, শিক্ষকদের সঙ্গে পেশাগত আলাপ-আলোচনা কিংবা শিখন-শেখার বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়নের মতো কাজগুলো নতুন করে গ্রহণ করা স্বাভাবিকভাবেই কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এর সঙ্গে শারীরিক পরিশ্রম, নিয়মিত ভ্রমণ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাও যুক্ত থাকে, যা একটি গতিশীল কর্মপরিবেশ দাবি করে। অপরদিকে, কর্মজীবনের একেবারে শেষদিকে এসে এই পদে নিয়োগ পেলে তাঁদের পক্ষে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে ধাপে ধাপে উচ্চতর পর্যায়ে নেতৃত্বের ভূমিকা নেওয়ার সুযোগও প্রায় থাকে না বললেই চলে।

একটি কার্যকর ও টেকসই শিক্ষাপ্রশাসনের জন্য প্রয়োজন এমন একটি পেশাগত কাঠামো, যেখানে মাঠপর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে কর্মকর্তারা ধীরে ধীরে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে উন্নীত হয়ে একটি সুসংহত নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারেন। এতে প্রশাসনের অভ্যন্তরে প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণের কালচার বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত শিক্ষাক্রম সংস্কার, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, কিংবা শিক্ষা ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তরের মতো বিষয়গুলো সামনে চলে আসে। নিঃসন্দেহে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু শিক্ষাপ্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত সংস্কারের প্রশ্নটি তুলনামূলকভাবে আড়ালেই থেকে যায়। অথচ শিক্ষার সমাজবিজ্ঞান ও প্রশাসন তত্ত্বের আলোকে বলা যায় কোনো শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা কেবল শিক্ষাক্রম বা নীতিমালার ওপর নির্ভর করে না; বরং সেই নীতিমালা মাঠপর্যায়ে কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তার ওপরই শেষ পর্যন্ত শিক্ষার গুণগত মান নির্ধারিত হয়।

যত উন্নত শিক্ষাক্রমই প্রণয়ন করা হোক না কেন, মাঠপর্যায়ে তা সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য যেমন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক প্রয়োজন, তেমনি তাঁদের পেশাগত দিকনির্দেশনা ও তদারকির জন্য দক্ষ শিক্ষাপ্রশাসকও অপরিহার্য। শিক্ষা ব্যবস্থাপনার আধুনিক ধারণায় প্রশাসনকে কেবল নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি একটি সহায়ক ও সক্ষমতাবর্ধক ব্যবস্থা যা শিক্ষকদের পেশাগত বিকাশে সহায়তা করে, সমস্যার সমাধানে দিকনির্দেশনা দেয় এবং বিদ্যালয়গুলোকে একটি ইতিবাচক শিখন কালচারের দিকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখে। এই বাস্তবতায় উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে তিনিই শিক্ষকদের জন্য প্রশাসনিক ও পেশাগত সহায়তার প্রথম আশ্রয়স্থল। কোনো বিদ্যালয়ে পাঠদান পদ্ধতি, মূল্যায়ন ব্যবস্থা, শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত সমস্যা বা প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দিলে শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানেরা সবার আগে এই দপ্তরের দ্বারস্থ হন। ফলে এই পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাছে কেবল দাপ্তরিক নিয়ম জানাই যথেষ্ট নয়; তাঁর মধ্যে থাকতে হয় শিক্ষাবিষয়ক পেশাগত উপলব্ধি, সমস্যার বিশ্লেষণক্ষমতা এবং বাস্তবসম্মত সমাধান দেওয়ার সক্ষমতা। এমন দক্ষ নেতৃত্বই মাঠপর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থাকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে।

যদি এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটিতে পেশাগতভাবে প্রশিক্ষিত শিক্ষা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের যথাযথ সুযোগ না দেওয়া হয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই দক্ষ ও মেধাবী তরুণদের একটি বড় অংশ শিক্ষকতা এবং শিক্ষাপ্রশাসন উভয় ক্ষেত্রেই আগ্রহ হারাতে পারেন। যেকোনো পেশার প্রতি আগ্রহ ও প্রতিশ্রুতি অনেকাংশেই নির্ভর করে সেখানে একটি সুস্পষ্ট পেশাগত স্বীকৃতি ও অগ্রগতির সম্ভাবনা থাকার ওপর। যদি শিক্ষাবিজ্ঞানে দীর্ঘ সময় ধরে অধ্যয়ন করা ও প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরও সেই জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগানোর উপযুক্ত ক্ষেত্র না তৈরি হয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই অনেক তরুণ অন্য পেশার দিকে ঝুঁকবেন। এতে শিক্ষাখাত ধীরে ধীরে তার সম্ভাবনাময় মানবসম্পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। এর ফলাফল কেবল জনবল সংকটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়বে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর।

শিক্ষাক্রম যত আধুনিকই হোক, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন উৎসাহী শিক্ষক, সহায়ক প্রশাসন এবং একটি পেশাদার পরিবেশ। কিন্তু যখন সেই কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নও হয়ে ওঠে খণ্ডিত, অনুপ্রেরণাহীন এবং অনেক সময় বিশৃঙ্খল। নীতিমালা ও বাস্তবতার মধ্যে তখন একটি বড় ব্যবধান তৈরি হয় কাগজে-কলমে সংস্কার থাকলেও শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতায় তার প্রতিফলন দেখা যায় না। ফলে আমরা যে আধুনিক, মানবিক ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্ন দেখি যেখানে শিক্ষার্থীরা সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে তা বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়াতে পারে না। যথাযথ পেশাদার নেতৃত্ব ও সহায়ক প্রশাসনিক কাঠামো ছাড়া সেই স্বপ্ন অনেক সময় নীতিনির্ধারণের দলিল বা নীতিমালার পৃষ্ঠাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। তাই শিক্ষাব্যবস্থার টেকসই উন্নয়নের জন্য পেশাগতভাবে প্রশিক্ষিত মানবসম্পদকে শিক্ষা প্রশাসনের কেন্দ্রীয় স্থানে নিয়ে আসা এখন অত্যন্ত জরুরি।

শিক্ষার জন্য নিবেদিত দুটো মন্ত্রণালয় কেবল সরকারের কার্যক্রম পরিচালনার দপ্তর নয়; এদুটো মূলত একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক প্রকল্প। উল্লেখ্য যে, উদ্ভুত আমলাতান্ত্রিক জটিলতার হাত থেকে রেহায় পেতে পূর্বে শিক্ষাপ্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণের উপর একটি লেখায় দুটো মন্ত্রণালয়কে একীভূত করার সুপারিশ করা হয়েছে। সে যাই হোক, একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়, সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং গণতান্ত্রিক চেতনার ভিত্তি গড়ে ওঠে তার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন অর্জন করেছে, তারা শিক্ষাকে কেবল প্রশাসনিক রুটিনের বিষয় হিসেবে দেখেনি; বরং জ্ঞান ও দক্ষতা উন্নয়নে মাধ্যমে মানবসম্পদ এবং নৈতিক নাগরিক তৈরির একটি সুপরিকল্পিত জাতীয় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করেছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষা প্রশাসনের কাঠামোও হতে হয় সময়োপযোগী, পেশাদার এবং জ্ঞানভিত্তিক। কিন্তু যদি এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটিকে এখনও সেকেলে প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিচালিত করা হয়, তবে দেশের শিক্ষার গুণগত মান পরিবর্তন প্রত্যাশা করা বাতুলতা মাত্র।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শিক্ষা প্রশাসনকে নিয়ে নতুন করে ভাবার এবং তাকে পেশাদার ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর সুযোগ এসেছে। বিশেষ করে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার (এবং সহকারি কর্মকর্তাসহ) মতো গুরুত্বপূর্ণ মাঠপর্যায়ের পদগুলোতে শিক্ষা বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের অগ্রাধিকারমূলক নিয়োগ নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষাপ্রশাসনে এমন একটি পেশাদার নেতৃত্ব গড়ে উঠতে পারে, যারা শিক্ষাবিজ্ঞানের জ্ঞান, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং শিক্ষানীতির লক্ষ্য এই তিনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ঘটাতে সক্ষম হবে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত শিক্ষাপ্রশাসনের এই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিয়োগ নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করে শিক্ষাবিষয়ক পেশাগত যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কারণ শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষাক্রম এবং শিক্ষানীতির মধ্যবর্তী যে প্রাতিষ্ঠানিক সেতুটি মাঠপর্যায়ে কাজ করে, সেটি মূলত শিক্ষাপ্রশাসনই। সেই সেতুটি যদি দুর্বল হয়, তবে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে। আর যদি সেই সেতুটি জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে মজবুত করা যায়, তবে শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক রূপান্তরের পথও অনেকটাই সুগম হয়ে উঠবে। নতুন সরকারের এখনই সেই সেতুকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর উপযুক্ত সময়।

লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।

পাঠকের মতামত:

১১ মার্চ ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test