E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

সাংবাদিকতার মান-ইজ্জত ফিরিয়ে আনুন

২০২৬ মার্চ ১৪ ১৭:৫৬:০৩
সাংবাদিকতার মান-ইজ্জত ফিরিয়ে আনুন

আবদুল হামিদ মাহবুব


সাংবাদিক আনিস আলমগীর মামলায় জামিন পেয়ে জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন। কিন্তু সত্যি কি তার মুক্তি ঘটলো?এখন তো বিরম্বনার মাত্র শুরু হল। প্রতি মাসেই মামলার তারিখ পড়বে। তাকে মামলায় হাজিরা দেওয়ার জন্য, একবার আইনজীবীর কাছে, আরেকবার কোর্টের বারান্দায় কিংবা হাকিমের আদালতে ছুটোছুটি করতে হবে।

আনিস আলমগীরের অপরাধ কি ছিল? তিনি তো কথাই বলেছিলেন। তার কথা বলার ধরন আমারও যে ভালো লাগতো, তা না। কখনো কখনো তার কথায় গোয়ার্তমির ভাব প্রকাশ পেতো। আমি নিজেকে নিজে প্রশ্ন করতাম, ভদ্রলোক এভাবে কথা বলে কেনো? মার্জিত আচরণেওতো অনেক কঠিন কথা ফেলা যায়। কিন্তু সেটা তিনি যখন পারেননি। তখন আমি এই ধারণায় উপনীত হয়েছি, হয়তো তার স্বভাবই এভাবে কাউকে অপদস্থ করে কথা বলা। তার কথা শুনলে মনে হতো তিনি পক্ষপাত দুষ্টে। কোন একটি পক্ষের প্রতি তার পক্ষপাত প্রকাশ পেয়ে যেত।

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সাংবাদিকের কোন পক্ষপাত থাকবেনা। সাংবাদিকের পক্ষপাত সেটা হবে দেশের প্রতি। কোন দলের প্রতি পক্ষপাত সেটা দলীয় কর্মীদের কাজ হয়ে যায়। আনিস আলমগীরের মাঝেমধ্যে এমন ভাবে বলতেন তাতে আমার মনে হয়ছে তিনি একটি দলের কর্মী হিসেবে অনেক কিছু জোর করে বলে ফেলতে চাচ্ছেন। একজন খ্যাতিমান সাংবাদিক এর কাছে আমার এমন প্রত্যাশা ছিল না।

কিন্তু তাই বলে তাকে মামলায় জড়িয়ে শায়েস্তা করতে হবে! আমি এই পক্ষে নেই। তাহলে তো আমাকেও এই দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হবে। অতীতে যদিও পড়েছি। অনেকবার আদালতের বারান্দায় মাসের পর মাস, বছরের পর বছর আমাকে ঘুরঘুর করতে হয়েছে। হাইকোর্টেও গিয়ে জামিন নিতে হয়েছে। সেগুলো কথা বলার জন্য ছিল না। ছিল আমার রিপোর্টিং এর কারণে। অর্থাৎ আমার লেখালেখি পছন্দ হয়নি, তাই মিথ্যা হয়রানিমূলক মামলা দিয়ে আমাকে হয়রান করা হয়েছে।

অথচ ডক্টর ইউনূস ক্ষমতায় বসে বলেছিলেন আপনারা প্রাণ খুলে সমালোচনা করুন। আনিস আলমগীরসহ আরো কিছু সাংবাদিক যেভাবে হয়রানির মামলার শিকার হলেন, তাতে তার কথার কোনই মূল্য থাকলো না। এটাও ঠিক আমরা সাংবাদিকরা পান্থীতে বিভক্ত। কোন সাংবাদিক আওয়ামী লীগপন্ত্রী, কেউ বিএনপিপন্থী, একগোষ্ঠী জামাতপন্থী, কেউ আবার বামপন্থী, কেউ ডানপন্থী। এইসব পন্থীই আমাদের বিপর্যয় ডেকে আনে। আমরা কি সাংবাদিকরা এই পন্থী হওয়ার সংস্কৃতি থেকে বের হতে পারবো না?

যদি বের হতে পারতাম তাহলে তোষামোদের কারণে কেউ স্বৈরাচার হতো না। কারণ হাসিনাকে তোষামোদি করে সাংবাদিকরাই স্বৈরাচার বানিয়েছিল। হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে গিয়ে আমাদের সাংবাদিকই বলেছেন, 'নেত্রী, প্রশ্ন করতে আসিনি। প্রশংসা করতে এসেছি।'এমন কথা বলা সাংবাদিকতার কোন নীতিতে পড়ে?

এভাবেই দেখেছি তারেক রহমানের সংবাদ সম্মেলনেও এক দুজন সাংবাদিক সেই তোষামোদি ধারায় তাকে প্রশ্ন করার চেষ্টা করেছেন। তারেক রহমান স্বভাব সুলভ ভাবে সেই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। তিনি তোষামোদি গায়ে মাখেননি। এটা অবশ্যই হাসিনা থেকে তাঁর ভিন্নতার প্রমাণ দেয়।কিন্তু কতদিন এই ভিন্নতা তার থাকবে, আমরা কেউই বলতে পারিনা।

আমি আনিস আলমগীরসহ আমাদের সকল সাংবাদিককে; বিশেষত যারা টকশোতে গিয়ে পটরপটর কথা বলেন, তাদের কাছে বিনীত অনুরোধ রাখবো আপনারা দয়া করে সাংবাদিকতাকে নিচে নামাবেন না। নিরপেক্ষ থেকে জাতির বিবেক হিসেবে দেশ সমাজ সরকার পরিচালনার বিভিন্ন বিষয় সমালোচনা করুন। কিন্তু কারো পক্ষ হয়ে জেদ ধরে এটা সেটা বলবেন না। সাংবাদিকতার মান-ইজ্জত ফিরিয়ে আনুন।

আমি তিন বছর আগে 'দেশের সাংবাদিকতা নষ্ট হয়ে গেছে' এই ঘোষণা দিয়ে সক্রিয় সাংবাদিকতা থেকে অবসর নিয়েছি। নষ্ট হয়ে যাওয়া এই সাংবাদিকতাটাকে আবার ভালো করে তুলুন। আমি সাংবাদিক ছিলাম, এই কথাটা বলে যেন আমিও সাংবাদিকদের নিয়ে গর্ববোধ করতে পারি।

পরিশেষে বর্তমান তারেক রহমানের সরকারের কাছে বলি, সাংবাদিকদের কেউ যদি ফৌজদারি অপরাধ করে থাকে, তাকে বিচারের মুখোমুখি করুন। কিন্তু বাক স্বাধীনতার জন্য সাংবাদিকদের উপর নিপীড়ন চালাবেন না, হয়রানি করবেন না।আমাদের লেখার অধিকার হরণের চেষ্টা করলে আপনার সরকার ফ্যাসিবাদে রূপ নেবে।
আলোচনা, সমালোচনা, বিদ্রুপ, খোঁচাখুঁচি সহ্য করার মানসিকতা নিয়েই দেশ পরিচালনা করতে হবে। তবেই দেশ ভালো চলবে। নতুবা অচলায়নে আটকে যাবেন। আমি চাই সকল অচলায়তন ভেঙে এই দেশটা সামনে এগিয়ে যাক।

সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে আদালত জামিনে মুক্তি দিয়েছেন। এই মুক্তিটা একজন সাংবাদিক হিসেবে তার স্থায়ী মুক্তি হোক। তার ওপর দায়ের করা হয়রানিমূলক সকল মামলা দ্রুত তদন্ত শেষ করে সুরাহা করা হোক। আনিস আলমগীরকে যেন বারবার আদালতে আর ধর্ণা দিতে না হয়।

আমি জানি আমি দেশের কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নই। একজন সাধারন নাগরিক হিসেবে, একসময়ের একজন সক্রিয় সংবাদ কর্মী হিসেবে, আমার কথাটুকু আমি বললাম। আমি কিন্তু দীর্ঘ চৌচল্লিশ বছর সক্রিয় সাংবাদিকতা করেছি। এখন কোন বিষয়ে ভেতরে যন্ত্রণা সৃষ্টি হলে এভাবে দু চার লাইন লিখে মনের যন্ত্রণা মিটাই। এই লেখাটা যদিও একান্তই আমার। তারপরও সরকারের দৃষ্টিতে পড়ার জন্য আমি কোন একটা পত্রিকায় ছাপানোর চেষ্টা করব।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।

পাঠকের মতামত:

১৪ মার্চ ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test