E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

বাসন্তী পূজা: ইতিহাসের দর্পণে বাঙালির আদি দুর্গোৎসব

২০২৬ মার্চ ২৭ ১৮:৫৮:৩৯
বাসন্তী পূজা: ইতিহাসের দর্পণে বাঙালির আদি দুর্গোৎসব

মানিক লাল ঘোষ


শরৎকালের কাশফুল আর নীল আকাশের আবহে আমরা যে শারদীয় দুর্গোৎসবে মেতে উঠি, তারও আগে দেবী আরাধনার আদি লগ্ন ছিল বসন্তকাল। চৈত্র মাসের এই পুণ্য তিথিতে দেবী দুর্গা পূজিত হন ‘বাসন্তী’ রূপে। সময়ের বিবর্তনে শারদীয় দুর্গোৎসবের জাঁকজমকের কাছে তা কিছুটা ম্লান মনে হলেও, শাস্ত্রীয় বিচারে বাসন্তী পূজাই হলো বাঙালির আদি দুর্গা আরাধনা। ত্রেতা যুগে শ্রীরামচন্দ্র রাবণ বধের নিমিত্তে অকালে দেবীর বোধন করার আগে পর্যন্ত বসন্তকালেই হতো মহামায়ার মূল বন্দনা।

ঢাকের সেই পরিচিত বাদ্যি, শিউলিহীন বসন্তের বাতাস আর ষষ্ঠী থেকে দশমীর পাঁচ দিনের শাস্ত্রীয় বিধান—সবই এক। মূলত ঋতুরাজ বসন্তের দেবী বলেই তাঁর নামকরণ হয়েছে ‘বাসন্তী’। পঞ্জিকা মতে, চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৬ সালের নির্ঘণ্ট অনুযায়ী আগামী ২৪ মার্চ ষষ্ঠী পূজার মাধ্যমে দেবীর প্রতিমা স্থাপন ও বোধন অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ২৫ মার্চ সপ্তমী, ২৬ মার্চ মহাষ্টমী ও সন্ধিপূজা, ২৭ মার্চ মহানবমী এবং ২৮ মার্চ বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে এই উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে। শারদীয় দুর্গোৎসবের মতোই দশমীর দিন পালিত হবে সিঁদুর খেলা ও বিসর্জনের করুণ সুর।

বাসন্তী পূজার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর মহানবমী তিথি, যা ভারতজুড়ে ‘রাম নবমী’ হিসেবেও অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে পালিত হয়। পুরাণ মতে, চৈত্র মাসের এই শুক্লপক্ষের নবমী তিথিতেই অযোধ্যায় রাজা দশরথের ঘরে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর সপ্তম অবতার হিসেবে শ্রীরামচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাই বাঙালির কাছে যা বাসন্তী নবমী, বৃহত্তর সনাতন সমাজের কাছে তা রাম নবমী। একদিকে শক্তিরূপিণী দেবী দুর্গার আরাধনা, অন্যদিকে মর্যাদাপুরুষোত্তম রামচন্দ্রের জন্মোৎসব—এই দুইয়ের মহামিলন বাসন্তী পূজাকে এক অনন্য আধ্যাত্মিক উচ্চতা দান করে। অনেক ভক্ত এদিন উপবাস থেকে শ্রীরামচন্দ্রের পূজা করেন এবং অধর্ম বিনাশের সংকল্প নেন।

পুরাণ মতে, দেবী দুর্গার মর্ত্যে আসা-যাওয়া নির্ধারিত হয় নির্দিষ্ট বাহনে। এ বছর শাস্ত্রীয় গণনা অনুযায়ী দেবীর আগমন ও গমন নিয়ে ভক্তমনে রয়েছে বিশেষ কৌতূহল। শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবীর বাহন মর্ত্যবাসীর জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধির বার্তা বয়ে আনে। অশুভ শক্তি বিনাশ করে জগতে কল্যাণ প্রতিষ্ঠার প্রার্থনায় ভক্তরা এই পাঁচ দিন দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করবেন।

বাঙালির আবেগে অকাল বোধন অর্থাৎ শারদীয় পূজাই এখন প্রধান। ত্রেতা যুগে লঙ্কা জয়ের আগে শ্রীরামচন্দ্র অশুভ শক্তি বিনাশে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন আশ্বিন মাসে, যা ছিল শাস্ত্রীয় সময়ের বাইরে। সেই থেকে ‘অকাল বোধন’ ক্রমশ বাঙালির ঘরে ঘরে শ্রেষ্ঠ উৎসবের রূপ নেয় এবং আদি বাসন্তী পূজার ইতিহাস কিছুটা আড়ালে চলে যায়। যদিও বছরে চারটি নবরাত্রি পালিত হয়, তবে এর মধ্যে শারদীয় ও বাসন্তী নবরাত্রিই প্রধান। এক সময় অবিভক্ত বাংলায় বাসন্তী পূজায় রাষ্ট্রীয় জৌলুস থাকলেও বর্তমানে তা পারিবারিক ও কিছু নির্দিষ্ট মন্দিরের ঐতিহ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

বাসন্তী পূজার সূচনার সাথে জড়িয়ে আছে রাজা সুরথের নাম। চন্দ্রবংশীয় প্রতাপশালী রাজা সুরথ প্রতিবেশী রাজার আক্রমণে পরাজিত হয়ে এবং নিজ সভাসদদের বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে সর্বস্ব হারান। রাজত্ব হারিয়ে তিনি বনে বনে ঘুরতে ঘুরতে ঋষি মেধা আশ্রমে উপস্থিত হন। সেখানে তাঁর দেখা হয় একই রকম প্রতারণার শিকার হওয়া বণিক সমাধি বৈশ্যের সাথে। ঋষি মেধা তাঁদের এই মোহভঙ্গ করে শোনান মহামায়ার মাহাত্ম্য। ঋষির পরামর্শে রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য চৈত্র মাসের এই শুক্লপক্ষেই প্রথম মাটির প্রতিমা গড়ে দেবীর আরাধনা করেন। দেবীর বরে রাজা সুরথ তাঁর হারানো রাজ্য ফিরে পান। এই কাহিনী থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে পরবর্তীতে রামচন্দ্র শরৎকালে দেবীর বোধন করেছিলেন।

এক সময় জমিদার বাড়ি বা বনেদি পরিবারগুলোর আভিজাত্যের প্রতীক ছিল এই পূজা। বিংশ শতাব্দীতে এসে সাধারণ মানুষের মধ্যে আবার বাসন্তী পূজার আগ্রহ বাড়ছে। ব্যক্তিগত মনোবাঞ্ছা পূরণ বা পারিবারিক সমৃদ্ধির চেয়েও বড় কথা—অশুভ শক্তির বিনাশ এবং জগতের কল্যাণের প্রার্থনা। ঋতুরাজ বসন্তের বিদায়বেলায় দেবী বাসন্তীর এই আরাধনা আমাদের ঐতিহ্যের শেকড়কেই মনে করিয়ে দেয়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট, সাবেক সহ-সভাপতি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন।

পাঠকের মতামত:

২৭ মার্চ ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test