E Paper Of Daily Bangla 71
Sikdar Dental Care
Walton New
Mobile Version

আমরা কি যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ অশান্তিতে বাস করছি?

২০২৬ এপ্রিল ০৩ ১৮:৩৭:২০
আমরা কি যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ অশান্তিতে বাস করছি?

মীর আব্দুর আলীম


ইরানে ৩০ দিনে ২,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বিশ্বের অন্যতম অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের আঘাতে। অন্যদিকে বাংলাদেশে ঈদের াাগে পরে মাত্র ১৫ দিনেই প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৫৮৭ জন, আহত ৩ হাজার। সময়ের অনুপাতে বিচার করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের শান্তিকালীন সড়কের মৃত্যুহার যুদ্ধের ময়দানের চেয়ে খুব একটা পিছিয়ে নেই। যুদ্ধের ধ্বংসলীলা যেখানে পুরো বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে, আমাদের সড়কের এই ‘নীরব যুদ্ধ’ সেখানে অনেকটা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।

ইরানের মৃত্যুগুলো সরাসরি বহিঃশত্রুর হামলার ফল, যা ঠেকানোর জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা বাহিনী কাজ করছে। কিন্তু বাংলাদেশের মৃত্যুগুলো ঘটছে ঘরের মানুষের অবহেলায়, অদক্ষ চালকের হাতে এবং ফিটনেসবিহীন যানের কারণে। যুদ্ধের ময়দানে শত্রু চেনা যায়, কিন্তু আমাদের রাজপথে প্রতিটি মোড়ে ও প্রতিটি বাসের চাকায় যে মরণফাঁদ পাতা আছে, তা চেনা দায়। ইরানে যারা প্রাণ হারাচ্ছেন, তাদের বীরের মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে বা জাতীয় সংকটের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের এই ৫৮৭টি পরিবার হারিয়েছে তাদের মেরুদণ্ড যাঁরা কেবল একটু আনন্দের খোঁজে নাড়ির টানে বাড়ি গিয়েছিলেন। উৎসবের রং এখানে ফিকে হয়ে গেছে স্বজনদের কান্নায়। কামানের গোলার চেয়েও বেপরোয়া গতি আজ আমাদের জনপদে বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।

ইরানের মতো দেশগুলোতে যখন যুদ্ধ বা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়, তখন সেখানে প্রাণহানি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত কিন্তু সম্ভাব্য বাস্তবতা হিসেবে ধরা হয়। যুদ্ধের একটি নির্দিষ্ট ফ্রন্টলাইন থাকে, মানুষ জানে শত্রু কোথায়। কিন্তু বাংলাদেশে উৎসবের মৌসুমে যা ঘটে, তা কোনো যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়ে কম নয়। পার্থক্য শুধু এটুকুই যে, এখানে শত্রু অদৃশ্য এবং তা হলো ‘অব্যবস্থাপনা’। যখন জেনেশুনে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন রাস্তায় নামানো হয় এবং নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়, তখন তাকে আর ‘দুর্ঘটনা’ বলা চলে না; বরং এটি একটি ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’। উৎসবের আনন্দ যেখানে পরিবারের মিলনমেলা হওয়ার কথা, অব্যবস্থাপনার কারণে তা পরিণত হয় শোকের মিছিলে। আমাদের দেশের সড়কগুলো আজ এমন এক বধ্যভূমি, যেখানে সাধারণ মানুষ কোনো অপরাধ ছাড়াই প্রাণ দিচ্ছে।

যুদ্ধের সময় ক্ষেপণাস্ত্র বা কামানের গোলার হাত থেকে বাঁচতে মানুষ বাঙ্কারে আশ্রয় নেয় বা সাইরেন শুনে সতর্ক হয়। কিন্তু আমাদের দেশের যাত্রীদের পালানোর কোনো পথ নেই। একটি দূরপাল্লার মিসাইল যতটা না অনিশ্চয়তা তৈরি করে, তার চেয়ে বেশি আতঙ্ক সৃষ্টি করছে মহাসড়কে বেপরোয়া গতিতে চলা বাসের স্টিয়ারিং। অদক্ষ ও ক্লান্ত চালকের হাতে যখন হাজারো মানুষের জীবন সোপর্দ করা হয়, তখন প্রতিটি মুহূর্ত কাটে মৃত্যুর আশঙ্কায়। ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু নির্দিষ্ট থাকে, কিন্তু আমাদের মহাসড়কের বেপরোয়া যান কার প্রাণ কেড়ে নেবে তার কোনো ঠিক নেই। বাসের সামনের সিটে বসা যাত্রী থেকে শুরু করে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা পথচারী—সবাই আজ এই ‘মানুষ-সৃষ্ট মিসাইলের’ লক্ষ্যবস্তু।

একটি আধুনিক যুদ্ধেও হয়তো ১৫ দিনে ৫৮৭ জন মানুষের মৃত্যু বিশ্বজুড়ে শোরগোল ফেলে দিত। কিন্তু আমাদের দেশে মাত্র দুই সপ্তাহে মহাসড়কে এতগুলো প্রাণ ঝরে যাওয়া যেন কেবল একটি পরিসংখ্যান মাত্র। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতা খুললেই লাশের খবর দেখতে দেখতে আমরা এক ধরনের সম্মিলিত অসাড়তার শিকার হয়েছি। যুদ্ধের ময়দানে বীরত্বের সুযোগ থাকে, কিন্তু সড়কের এই মৃত্যুমিছিলে আছে কেবল অসহায়ত্ব। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যু প্রমাণ করে যে, আমাদের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। প্রতিটি মৃত্যু একটি পরিবারের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে, যা কোনোভাবেই একটি সভ্য দেশের নিয়মিত চিত্র হতে পারে না। যুদ্ধের সরঞ্জাম যেমন ট্যাংক বা যুদ্ধবিমান প্রতিটি অপারেশনের আগে নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করা হয়। অথচ আমাদের দেশের মহাসড়ক ও নদীপথে দাপিয়ে বেড়ানো বাস, ট্রাক ও লঞ্চগুলোর বড় একটি অংশেরই ন্যূনতম ফিটনেস নেই। ব্রেক কাজ না করা, জোড়াতালি দেওয়া ইঞ্জিন আর রংচটা বডির এই যানগুলো আসলে একেকটি ‘ভ্রাম্যমাণ যমদূত’। বিআরটিএ-র কাগজপত্রে হয়তো এসব গাড়ির অস্তিত্ব নেই অথবা ভুয়া সনদে চলছে, কিন্তু বাস্তবে এরা বীরদর্পে যাত্রী পরিবহন করছে। যান্ত্রিক ত্রুটি আছে জেনেও অধিক মুনাফার আশায় মালিকপক্ষ যখন এগুলো রাস্তায় নামায়, তখন তারা সরাসরি মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানায়। এই লক্কড়-ঝক্কড় যানগুলো আমাদের পরিবহন খাতের আদিম দশারই বহিঃপ্রকাশ।

একজন প্রশিক্ষিত সৈন্য যেমন জানে কখন ট্রিগার চাপতে হয়, তেমনি একজন চালকের জানা উচিত কখন ব্রেক চাপতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতা হলো, হাজার হাজার চালকের কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই, অথবা তারা ভুয়া লাইসেন্স নিয়ে ভারী যানবাহন চালাচ্ছে। একজন আনাড়ি মানুষের হাতে একে-৪৭ তুলে দেওয়া যতটা ঝুঁকিপূর্ণ, একজন অদক্ষ চালকের হাতে বাসের স্টিয়ারিং তুলে দেওয়া তার চেয়েও বেশি বিপদজনক। এদের না আছে ট্রাফিক আইনের জ্ঞান, না আছে ধৈর্য।

মাদকাসক্তি আর অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার ক্লান্তি নিয়ে যখন তারা রাজপথে নামে, তখন সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। রাজপথ আজ এসব কসাইদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। নিরাপদ যাতায়াতের বিকল্প হিসেবে মানুষ রেল ও নৌপথকে বেছে নিতে চায়, কিন্তু সেখানেও অব্যবস্থাপনার কালো ছায়া। জরাজীর্ণ ইঞ্জিন, সিগন্যাল ব্যবস্থার ত্রুটি এবং ফিটনেসবিহীন লঞ্চের কারণে সেখানেও লাশের পাহাড় জমে। প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, শোক প্রকাশ করা হয়, কিন্তু মূল হোতারা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। কোনো চালক বা মালিকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় এই খাতের বিশৃঙ্খলা আরও জেঁকে বসেছে। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই মূলত অপরাধীদের সাহস বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং পরোক্ষভাবে মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করছে। সংস্কারের চেয়ে আশ্বাসই এখানে বেশি দৃশ্যমান।

সাধারণ মানুষ জানে যে লক্কড়-ঝক্কড় বাসে ওঠা বা অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই লঞ্চে যাওয়া নিরাপদ নয়। কিন্তু নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার ব্যাকুলতা আর বিকল্প ব্যবস্থার অভাব তাদের এই ‘মৃত্যুফাঁদে’ পা দিতে বাধ্য করে। পরিবহন সিন্ডিকেটগুলো মানুষের এই অসহায়ত্বকে পুঁজি করে উৎসবের সময় দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করে এবং গাদাগাদি করে যাত্রী তোলে। নিরাপদ পথের নিশ্চয়তা না থাকায় মানুষ অনেকটা ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়ে পথ চলে। এই নিরুপায় আত্মসমর্পণ আমাদের রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনক। সাধারণ মানুষের জীবনের চেয়ে যখন পরিবহন মালিকদের মুনাফা বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন মানবিকতা পরাজিত হয়। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক প্রশাসন, বিআরটিএ এবং হাইওয়ে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে হাজার হাজার আনফিট গাড়ি রাস্তায় নামছে? মহাসড়কের চেকপোস্টগুলোতে কী তদারকি হয়, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে গভীর সংশয় রয়েছে। এই গাফিলতি কেবল কর্তব্যে অবহেলা নয়, এটি জনসাধারণের আস্থার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। যুদ্ধের ময়দানে কোনো সেনার বিশ্বাসঘাতকতা যেমন পুরো বাহিনীকে ধ্বংস করতে পারে, তেমনি প্রশাসনের নমনীয়তা সড়ক নিরাপত্তাকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। নিয়ম ভাঙার এই উৎসবে যখন রক্ষকই ভক্ষকের ভূমিকা পালন করে বা চোখ বন্ধ করে রাখে, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব।

আমরা বর্তমানে দেশে মেগা প্রজেক্ট, এক্সপ্রেসওয়ে এবং আট লেনের উন্নত মহাসড়কের গল্প শুনি। অবকাঠামোগত এই উন্নয়ন অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই মসৃণ পথে মানুষের জীবনের গ্যারান্টি কতটুকু? যদি উন্নত সড়কের পিচ ঢালাই নিয়মিতভাবে সাধারণ মানুষের রক্তে রঞ্জিত হয়, তবে সেই উন্নয়নের প্রকৃত সার্থকতা কোথায়? শুধু রাস্তা চওড়া করলেই উন্নয়ন হয় না, যদি না সেই রাস্তায় চলাচলকারী মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। উন্নয়ন তখনই পূর্ণতা পায়, যখন একজন মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে নিরাপদে ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা পায়। রক্তভেজা উন্নয়ন কখনোই কোনো জাতির গর্বের বিষয় হতে পারে না। ‘সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য বেশি’ এই কথাটি আমাদের দেশের প্রতিটি মোড়ে সাইনবোর্ডে শোভা পায়। কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই বললেই চলে। চালকদের মধ্যে আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা, ওভারটেকিংয়ের নেশা আর যাত্রীদের মধ্যে দ্রুত পৌঁছানোর তাড়না সব মিলিয়ে জীবনের মূল্য যেন সময়ের কাছে তুচ্ছ হয়ে গেছে। সমাজ ও রাষ্ট্র হিসেবে আমরা প্রতিদিন লাশের গণনা করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি, যা একটি চরম অবক্ষয়ের লক্ষণ। যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষের জীবনের মূল্যকে প্রতিটি নীতিমালার শীর্ষে রাখা না হবে এবং আইন ভঙ্গকারীদের কঠোর সাজা নিশ্চিত করা না হবে, ততক্ষণ এই স্লোগানটি কেবল একটি অর্থহীন বাক্য হিসেবেই রয়ে যাবে।

ইরানের আকাশ যদি যুদ্ধের মেঘে ঢাকা থাকে, তবে বাংলাদেশের আকাশ আজ শোকের চাদরে ঢাকা। পরিসংখ্যানটি কেবল সংখ্যা নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা। মধ্যপ্রাচ্যের রণাঙ্গন আর বাংলার রাজপথ আজ যেন একই বিন্দুতে এসে মিলেছে সেটি হলো ‘অকাল মৃত্যু’। ইরান যুদ্ধের ময়দান থেকে মুক্তির পথ খুঁজছে, আর আমাদের খুঁজতে হবে সড়কের এই বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তির উপায়। যুদ্ধের ময়দানে শত্রুকে চেনা যায়, কিন্তু আমাদের রাজপথের এই অদৃশ্য শত্রুদের চেনা দায়। প্রতিদিনের এই রক্তপাত বন্ধ করতে না পারলে উন্নয়নের সব জোয়ারই ম্লান হয়ে যাবে। সময় এসেছে সড়ক ব্যবস্থাকে যুদ্ধের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়ে ঢেলে সাজানোর। নইলে প্রতি বছর উৎসবের শেষে আমাদের এই ‘স্বাভাবিক’ বাংলাদেশে লাশের সংখ্যা যুদ্ধের পরিসংখ্যানকেও হার মানিয়ে যাবে। আমরা কি তবে যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ এক অশান্তিতে বাস করছি?

লেখক: সাংবাদিক, সমাজ গবেষক, মহাসচিব-কলামিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ।

পাঠকের মতামত:

০৩ এপ্রিল ২০২৬

এ পাতার আরও সংবাদ

উপরে
Website Security Test